গল্প

পরির পোড়া ডানা

ম্যাঘ যাইতাছে দল বাইন্ধা হাতির পালের মতো। শ্যাষ আর হয় না। আমি কোনোদিন হাতির পাল দেখি নাই। শুনছি, অনেক গভীর জঙ্গলে হাতির পাল এইভাবে দল-বাইন্ধা চাইরদিকের গাছপালা তছনছ করতে করতে যায়। ম্যাঘও সেইরকম যাইতাছে। গত দুইদিন ধইরা সূর্যর মুখ দেখা যায় নাই, খালি বৃষ্টি আর বৃষ্টি। ইস্টিশনের সামনের জায়গাটা পানিতে প্রায় ডুবু-ডুবু। ইস্টিশনের সামনে বড়-বড় গাছগুলা ভিজতে-ভিজতে ভাঙ্গা ছাতির মতোন উল্টাইয়া গেছে। পেলাটফর্মও খালি। সকালে দুইটা লোকাল টেরেন থামছিল। যাত্রী বিশেষ নাই। ভিজা লাইনের ওপর দিয়া সাপের মতোন শরীর ঘষাইতে ঘষাইতে টেরেন চইলা গেছে। ইস্টিশন আবার ফকফকা। হিরুর মিষ্টির দোকানে এই বিকালবেলায় বাত্তি জ্বলতাছে। পাশে ফজলু ডাক্তারের চেম্বার বন্ধ। বই-খাতার দোকানটা সারাদিন খোলে নাই। মতি মিয়া অর্ধেক শাটার নামাইয়া ভিজা বইপত্র তাকের উপরে তুলতাছে মনে হয়। টানা বৃষ্টিতে দোকানে পানি ঢুকছে। হিরুর মিষ্টির দোকানের সামনে বাঘা দুই পায়ের উপরে ভর দিয়া বসা। গায়ে বৃষ্টির পানি পড়তাছে। কিন্তু কুত্তাটা লড়ে না। এইসময় হিরু ভাঙ্গা নিমকি একজায়গায় কইরা খাইতে দেয়। বাঘার বন্ধুরা আইজ আসে নাই। বাঘার বন্ধু মানে, বাবলু, পিন্টা আর হোবি। কাইল থেইকা ওগো দেখি না। মনে হয় ট্রেনে চাইপা কোথাও গেছে। ফিরা আসবো হয়তো সন্ধ্যায়। পিঠের উপরে বস্তা ভর্তি লোহা-লক্কর। ওরা তিনটা পোলা এই ইস্টিশনের চাইরপাশেই থাকে সারাদিন। বয়স বেশি না, এই বারো-চৌদ্দ হইবো। ভাঙ্গা লোহা টোকায়, বগির লাইট চুরি করে, ইস্টিশনের পানির লাইনের পাইপ কাটে। আর আসা যাওয়ার সময় সামনের রাস্তায় পৌরসভার লাগানো লোহার বেড়ার উপরে ধাক্কা মারে। আমি দেখছি ওগো ধাক্কা মারতে। ওরা তিনজন বেড়াটার পাশ দিয়া হাঁইটা যায় আর শরীলের সমস্ত শক্তি নিয়ে বেড়ার উপর গিয়া পড়ে। লোহার পাতলা পাত দিয়া তৈরি করা বেড়া ওদের ধাক্কায় ধাক্কায় অনেক জায়গায় ব্যাঁকা হইয়া গেছে। শুধু তো ওরা না, মঞ্জু, ফকরু-ওরাও ধাক্কায়। বেড়া ভাঙ্গার এই কামটা বাইর করছে মেরাইজ্যা—এই ইস্টিশন এলাকার ছোটখাটো চোর-বাটপার আর পকেটমারগো সর্দার। দুই বছর আগে পৌরসভা এই বেড়া আরেকবার দিছিল। তখন এই মেরাইজ্যার পোলাপান ধাক্কাইয়া সেই বেড়া ভাইঙ্গা ফালাইছে। দিনে ধাক্কায় আর রাইতে ব্যাঁকা জায়গাটা লোহার রড ঢুকাইয়া খোলে। এইভাবে রাইতে-রাইতে বেড়া উধাও। এইবার বেড়া ভাঙ্গনের চুক্তি নিছে ইস্টিশনের পোলাপান আর এলাকার যত হিরোনখোরেরা। বেড়া ভাইঙ্গা লোহা জমা দিতে হইব মেরাইজ্যার কাছে। সেই অনুৃযায়ী ট্যাকা পাইবো সবাই। আমিও যাইতাম ওগো লগে বেড়া ভাঙ্গতে। ভালো ট্যাকা দেয় মেরাইজ্যা। ফাও কয়টা পয়সা পাইলে ক্ষতি কী, মাইনষের কাছে হাত পাইতা আর কত প্যাট চালামু? কিন্তু শরীলে জোর নাই, বয়স হইছে। ওইরকম ধাক্কা মারলে একদিনেই খবর হইয়া যাইবো। বৃষ্টিটা জ্বালাইবো মনে হয়। হেই গত পরশু থেইকা যে শুরু হইছে থামনের কোনো নাম নাই। কখনো চিড়বিড় কইরা পড়ে আবার কখনো ঝমঝম। কাইল রাইতে একগাট্টি প্যাসেঞ্জার আসছিল। হেগো মইধ্যে এক লোক কী মনে কইরা বিশটা ট্যাকা দিছিল। একটা রুটি কিন্না খাইছিলাম। তারপর ট্যাকাও শেষ। এহন প্যাটে কিল মাইরা বইসা থাকন ছাড়া আর কোনো পথ নাই। এই বাদলার মইধ্যে ইস্টিশনে মানুষও আসব না, আমারে ভিক্ষাও দিব না। ভিজা বাতাসে ঠান্ডায় ঠান্ডায় ঘুমাইয়া গেছিলাম। ঘুম থেইকা ঠেইলা তোলে বাবলু। ‘ও কাকা, বৃষ্টিতে বিছনা ভিজে দিশা পাও না? বিছনা সরাও।’ চোখ-মুখ ডইলা উইঠা বইসা দেখি বৃষ্টির তেজ আসলেই বাড়ছে। পেলাটফর্মের পশ্চিম দিক দিয়া বৃষ্টিতে ভাইসা যাইতাছে। শোওনের ছালাটা টাইনা সরাইয়া আাাইনা বড় ঘড়িটার সামনে নতুন কইরা বিছানা পাতি। বাবলুর পুরা শরীর ভিজা। মাথায় ঝাঁকড়া চুল থেইকা বড় বড় পানির ফোঁটা পড়তাছে। একটা ময়লা গামছা দিয়া মাথা মোছে বাবলু। একটু দূরে বাঘা বইসা তার বিরাট জিব্বা দিয়া মুখ চাটে। ‘তুই কই আছিলি বাবলু? সারাদিন দেখলাম না?’ ‘মেরাইজ্যা কামে পাঠাইছিল। ফিরা আইসা আবার বেড়া ভাঙ্গনের কামে লাগছিলাম। আইজ অনেক দূর কইরা ফালাইছি কাকা। সিগনাল বাত্তির কাছের জায়গাটা প্রায় খালাস, কাইল আরেকটু ঠ্যালা দিলে কারবার শ্যাষ। শরীল ব্যথা করতাছে। শরীলটা একটু মালিশ কইরা দিবা? শুইতে গেলে চোট পাই।’ ‘আমার কাছে আসছস শরীল টিপাইতে না?’ হাসে বাবলু। ‘দ্যাও না কাকা, অনেক ব্যথা করতাছে। অহন তো তুৃমি আর ঘুমাইবা না। এই শালার মরা বৃষ্টি আরও বাড়ব।’ ‘সারাদিন খাই নাই আর তুই আসছস শরীল টিপাইতে?’ মেজাজ খারাপ কইরা কই আমি। বাবলু হেসে ঝোলা থেকে একটা প্যাকেট বাইর করে। ‘আরে কাকা, বাবলু খারাপ পোলা না, এই যে, তোমার জন্য খাওন আনছি। মাসুম মিয়ার তেহারি। এহনও গরম আছে, খাও।’ তেহারি দেইখা আমার প্যাটের ভিতরে এক পাল ফড়িং ফাল দিয়া ওঠে। ঠোঙ্গা খুইলা খাইতে শুরু করি। অনেকদিন তেহারি খাই না। বাবলু আরেকটা ঠোঙ্গা ছিঁইড়া বাঘার সামনে মাটিতে বিছাইয়া দেয়। কুত্তাটা খুশিতে নাক-মুখ দিয়ে ঘোঁত্-ঘোঁত্ করে শব্দ করে। লেজ নাড়ে। আসলেই বৃষ্টি কমে না। বাতাসের লগে লগে আরও জোরে জোরে পড়ে। আমাগো, মানে আমার আর বাঘার খাওয়া শেষ হইয়া যায়। বাবলু আমার বিছানার পাশে বইসা একটা আধা পোড়া সিগারেট ধরায়। বৃষ্টির বাতাসে পোড়া সিগারেটের গন্ধ ভাসে। আমি বাবলুর পিঠ, ঘাড় টিপ্যা দেই। বাবলু মাঝে-মইধ্যে আমার কাছে পিঠ টিপাইতে আসে। লোহার বেড়ায় ধাক্কা মারতে মারতে শরীলে অনেক ব্যথা হয়। হওনেরই কথা। একটা লোহার বেড়া ধাক্কাইয়া খোলা সোজা কথা না। ধাক্কা মারতে গিয়া বেমোড়ে লাইগা মঞ্জু পোলাটার পাঁজরার হাড় ভাঙছে। এহন পেলাস্টার বাইন্ধা ঘরে পইড়া আছে। ‘মেরাইজ্যা তরে এই কামের জন্য কত দিব?’ বাবলুর পিঠ মালিশ করতে করতে আমি কথা বলি। ‘আগে তো কইছিল তিন হাজার, এহন মঞ্জু নাই। মনে হয় হাজার পাঁচেক জোগাড় করতে পারুম।’ ‘হে তো অনেক ট্যাকা, মেরাইজ্যা দিব তরে? হালায় তো মানুষ ভালা না।’ ‘দিব কাকা, দিব। মেরাইজ্যা বিপদে আছে। মাল চালানের ট্যাকা আটকা পড়ছে। গাজীপুরে হের ফেন্সিডিলের বস্তা ধরছে পুলিশ। অনেক ট্যাকা লস। এহন এই লোহা বেইচ্যা পার্টিরে ট্যাকা দিতে হইব।’ ‘এত ট্যাকা দিয়া কী করবি?’ আমার কথা শুইনা হাসে বাবলু। ‘কী জানি কী করুম, আগে ট্যাকা হাতে আসুক।’ ‘আমি এতটি ট্যাকা পাইলে সোজা দ্যাশে চইলা যাইতাম। তারপর ভিটায় একটা ঘর উঠাইতাম।’ আমার কথা শুনে বাবলু তাকিয়ে হাসে। ‘আমি দ্যাশে গেলে বাপে ধইরা পিটাইবো। শুনছি আবার বিয়া করছে।’ ‘কস কী, আবার বিয়া!’ ‘হ, এইটা তো আমার বাপের শখ। আমার মায়ের পরে এইটা তিন নম্বর। আমার বাপটা হালায় আজব কিসিমের লোক। মদ খাওয়া আর বিয়া করা ছাড়া দুনিয়াতে কিছু জানে না। বয়স হইছে তারপরেও বুইড়া বলদের লাহান ঢুস মাইরা বেড়াইতাছে।’ হাতের সিগারেটটা টোকা মাইরা ফালায় বাবলু। পেলাটফর্মে জমা হওয়া পানির মইধ্যে পইড়া ছ্যাঁত্ কইরা নিব্বা যায় আগুন। সিগারেটটা পানিতে ভাসতে ভাসতে দূরে চইলা যায়। বৃষ্টি পড়তেই থাকে। ইস্টিশনের সামনে পানি বাড়ে। হিরুর মিষ্টির দোকানের সামনে সিঁড়ির মাথা প্রায় ধইরা ফালায়। বাঘা একটু দূরে শরীলটারে প্যাঁচ মাইরা শোওনের আয়োজন করে। অন্ধকারে বৃষ্টির দিকে তাকাইয়া থাকে বাবলু। আমি বাবলুর শরীল টিপা শ্যাষ করতেই ভিজা জামাটা আবার গায়ে দেয় বাবলু। উইঠা খাড়ায়া হাই তুইলা বলে, ‘কাকা, আপনে জীবনে পরি দেখছেন?’ ‘পরি!’ আমি তাজ্জব হইয়া তাকাই বাবলুর দিকে। বাবলু হেসে বলে, ‘হ পরি। মেরাইজ্যা হেইদিন কইতাছিল আমাগো সামনের মাঠে নাকি রাইত কইরা পরি নামে।’ বাবলুর কথা শুইনা আমি হাসি। ‘মেরাইজ্যা হালায় হিরোন-মিরোন খাইয়া কী কইল আর তুইও বিশ্বাস করলি!’ ‘আরে কাকা, তুমি দেখতে পাও না। আমি একদিন দেখুম। ছোটবেলায় মা-র কাছে গল্প শুনছি, পরির গল্প। পরিরা অনেক সোন্দর হয়, না কাকা?’ আমি মাথা লাইড়া কই, ‘হ সোন্দর হয় শুনছি। বিরাট ডানা থাকে, মুকুট থাকে মাথায়।’ ‘পরিরা জাদু কইরা অনেক খাওন আনতে পারে?’ বাবলুর কথা শুইনা আমি হাসি। ‘পরির দেখা পাইলে তুই কী কী খাওনের কথা কবি?’ বাবলু বাঘার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে বলে, ‘শুনছি পরিরা অনেক কোর্মা-পোলাও খায়। একবার দেখা পাইলে আমারেও খাওয়াইতে কমু। শালা, ডেইলি পোলাও-কোর্মা, মজা হইব না কাকা?’ ‘এই না তুই তেহারি খাইলি?’ আমার কথা শুইনা হাসে বাবলু। ‘ওইটা তো মাসুম মিয়ার তেহারি। পরিগোটা আলেদা। অনেক মজা হইব মনে হয়।’ বাবলু বাঘার মাথায় একটা চাটি মাইরা আউগায় সামনের দিকে। আমি ডাইকা কই, ‘কই যাস?’ বাবলু ঘুইরা খাড়াইয়া কয়, ‘মেরাইজ্যার কাছে যাই। কামের কথা আছে।’ বাবলু লাইনের উপরে খাড়াইয়া থাকা একটা মালগাড়ির খালি বগির দিকে যায়। মেরাইজ্যার দলবল সন্ধ্যা থেইকা আড্ডা মারে। দুই হোবিরে পুলিশে ধরছে। খবর দিল পিন্টা। আমি গেছিলাম জাহানের দোকানে চাইট্টা খাইতে। ফুটপাথের দোকান। দুফুরে রুটি আর ভাজি খাওয়ায়, রাইতে ভাত। দুইদিন পরে বৃষ্টি থামছে কিন্তু রইদ ওঠে নাই। দিন মুখ আন্ধার কইরা রাখছে। মাঝে মাঝে জোর হাওয়া দিতাছে, অনেকগুলা বড়-বড় গাছের ডাইল ভাইঙ্গা পড়ছে রাস্তায়। ফিরনের সময় দেখি, ইস্টিশনের সামনে বড় আমলকি গাছের নিচে পিন্টা একলা বইসা ঝিমায়। পোলাটা অল্প বয়সে গাঞ্জা খাওয়া ধরছে। সব মেরাইজ্যার কাম। কাছে গিয়া বাবলু আর হোবির কথা জিগাইতে রসগোল্লার মতোন টসটসা নেশার চোখে আমার দিকে তাকাইয়া কইল হোবিরে পুৃলিশে নেওয়ার খবর। দিনেরবেলা বেড়া ধাক্কাইতে গেছিল। গাঞ্জা অনেক খাইছে মনে হয়। ভালা কইরা কথা কইতে পারে না পিন্টা। ‘হায়-হায়, তাইলে অহন কী হইব?’ আমার কথা শুইনা হাসে পিন্টা। ‘কী আর হইব, নিয়া দুই একটা ঠুয়া দিয়া ছাইড়া দিব। না করছিলাম, আমার কথা শুনে নাই।’ আমি আর কোনো কথা না বইলা নিজের জায়গায় ফিরা আসি। সকালে পর পর কয়েকটা ট্রেন আছিল। আয়-ইনকাম ভালা হইছে। অনেকদিন পরে জাহানের দোকানে রুটি আর ভাজি খাইলাম। দিনেরবেলা পেলাটফর্মে বিছানা পাতন যায় না। রেল পুলিশের মামুরা ঝামেলা করে। ঘড়িটার নিচে ছোট একটা বইয়ের দোকান আছে। দিনেরবেলা দোকানের পাশে বইসা ঝিমাই। সামনে গামছা একটা পাইতা রাখি। যে-যা দেয়। রাইতে বাবলুরে কইছিলাম ট্যাকা পাইলে দ্যাশে চইলা যামু, ঘর উঠামু খালি ভিটায়। কিন্তু আসলেই কি কথাটা ঠিক? দ্যাশে ফিরা গেলে হামিদ আর হাবিব, আমার দুই পোলা আমারে শান্তিতে থাকতে দিব? ওরা তো আমারে বাড়ি থেইকা খেদাইছে সামান্য যা আছিল তা দখল করার জন্য। বাবলুর মতো আমিও ফিরা গেলে পোলারা পিটাইব। মাঝে মাঝে ভাবি, তাইলে আমি যামু কই? এই ইস্টিশনেই মরতে হইব আমারে? ছোট একটা থাকনের জায়গা আছিল, চাষ করনের একটু জায়গা আছিল, আইজ লাউ, কাইল পটল লাগাইয়া আমার দিন চইলা যাইত। কিন্তু দুই পোলার জাউরামিতে টিকতে পারলাম না। মুরগির খামার দিব, শহরে সবজি সাপ্লাই দিব—কতকিছু বইলা শ্যাষে ফেল মারল। ট্যাকার জন্য এহন পাওনাদারে দৌড়ায়। আমার আর বাড়িতে ফিরা যাওয়া হইব না মনে হয়। ‘ও কাকা, চোখ বন্ধ কইরা কী ভাবতাছ?’ ভাবতে ভাবতে কোন সময় জানি চোখ লাইগা আসছিল। বাবলুর গলা শুইনা তাকাই। বাবলু আর পিন্টা খাড়াইয়া আছে। ‘ঠান্ডা বাতাসে চোখ লাইগা গেছিল, তরা কই থেইকা আসলি?’ ‘কলা আর রুটি নিয়া হোবিরে দেখতে থানায় গেছিলাম, শালার দারোগা দেখা করতে দিল না। হালায় সকাল থেইকা কিছু খায় নাই। ওর মায়ের সাতদিন ধইরা জ্বর। ভাবছিল বেড়ার লোহা বেইচা ওষুধ কিনব।’ ‘মেরাইজ্যা তগো ট্যাকা দিছে?’ বাবলু মাটিতে বইসা পড়ে। পিন্টা ইস্টিশনে ঢুকনের মুখে খাড়াইয়া থাকা রিকশাগুলির দিকে যায়। ‘হ, কিছু দিছে। পুরা কাম হইলে বাকি ট্যাকা দিব। আমি কইছি শরীলে অনেক ব্যথা, একদিন কাম বন্ধ রাখুম। মঞ্জুর মতন হাড্ডি ভাঙলে আমার কাম শ্যাষ।’ পোলাটার লাইগ্যা মায়া লাগে। কয়ডা ট্যাকার লোভ দেখাইয়া মেরাইজ্যা ওরে যে কী কামের মইধ্যে ভিড়াইল। পিন্টা আর ফিরা আসে না। আমি আস্তে আস্তে বাবলুর পিঠ মালিশ করি। বাবলু উ কইরা ওঠে। ‘কী রে ব্যথা করে?’ ‘হ, অনেক ব্যথা। জায়গায় জায়গায় বৃষ্টি ছাড়া মাটির মতো শক্ত হইয়া গেছে। চিত্ হইয়া শুইতে পারি না।’ আমি আস্তে আস্তে বাবলুর পিঠ মালিশ কইরা দেই। পোলাটার জন্য কেমন একটা মায়া পইড়া গেছে। হেইদিন কইতাছিল, ছোটবেলায় হের আসল মা শুইয়া-শুইয়া পিঠের ঘাম-গোটা মাইরা দিত। কেউ পিঠে হাত দিলে বাবলুর মায়ের কথা মনে হয়। অনেক ছোটবেলায় পোলাটার মা মরছে। ‘তর পরি দেখনের কী হইল?’ ঘুইরা তাকায় বাবলু। বাবলুর ধুলা-ময়লা মাখা শরীল, চুলে জটা। পরি দেখনের কথা কইতে গিয়া চোখ চকচক কইরা ওঠে। ‘গেছিলাম কাইল রাইতে। মেরাইজ্যা কইল আসব। কিন্তু কিছুই দেখলাম না। মাঠটা ভর্তি খালি অন্ধকার। মেরাইজ্যা কয় নেশা না করলে পরি দেখন যায় না।’ ‘এইসব জিনিস দুনিয়াতে দেখন যায় না।’ ‘দেখা যায় কাকা। তুমি জান না। মেরাইজ্যা কয়, হে একবার দেখছিল। আমাগো ইস্টিশনের মাঠে অনেক রাইতে একটা পরি নামছিল। মেরাইজ্যা গাঞ্জা খাইয়া বইসা আছিল, হঠাত্ দেহে সাদা জামা পরা একটা মাইয়া কামরাঙ্গা গাছের গোড়ায় খাড়াইয়া। মেরাইজ্যা তো দেইখ্যা ডরে ফুট্টুস। পরে বুঝতে পারছে ওইটা পরি আছিল।’ ‘মেরাইজ্যা মিছা কথা কইছে। আমিও পরির গল্প শুনছি কিন্তু কেউ পরি নিজের চক্ষে দেখছে শুনি নাই।’ ‘তুমি পরির গল্প জান না কাকা? একটা কও, শুনি। অনেক উপরে আকাশ দিয়া ভাইসা-ভাইসা পরি আসে, একটা মাঠের মইধ্যে নামে তারপর জাদু দেখায়। কতরকম জাদু—মানুষ ব্যাঙ হইয়া যায়, ব্যাঙ মানুষ হয়।’ ‘তর পরি এতো ভালা লাগে কেন, পরি বিয়া করবি?’ আমার কথা শুইনা হাসে বাবলু। ‘কী যে কও কাকা, কেউ পরি বিয়া করতে পারে?’ ‘তুই করবি, বিয়া কইরা সারাদিন জাদু দেখবি আর পোলাও-কোর্মা খাবি।’ আমার কথা শুইনা বাবলু কী যেন ভাবে। ইস্টিশনের সামনে বড় আমলকি গাছের পাতা ঝইড়া পড়ে বাতাসে। হিরুর দোকানে গরম জিলাপি ভাজার গন্ধ নাকে আইসা সুড়সুড়ি দেয়। তিন রাইত হইছে অনেক। পোলাগুলা দুমদাম কইরা বেড়ার উপরে পড়ে আবার সইরা গিয়া দেখে কতটা ব্যাঁকা হইল। এই কামটা সারাদিন আসা-যাওয়ার পথে সুযোগ পাইলেই করে। রাইতে একলগে চলে ধাক্কা মারা আর লোহার রড ঢুকাইয়া বেড়া খোলনের কাম। আমি গেছিলাম চৌরাস্তার মোড়ের দিকে। ফিরনের পথে ইস্টিশনের সামনের জায়গাটা আন্ধাইর। মেরাইজ্যার পোলাপান আইজও রাস্তার বাত্তি ফাটাইয়া দিছে। এই এক কাম ওগো, গুলাইল মাইরা বাল্ব ফাটায়। বেড়াটার বড় একটা জায়গা নাই হইয়া গেছে। দুই-এক জায়গায় লোহার ফেরেম ঝুলতাছে। এইগুলাও হিরোনখোররা আইসা নিয়া যাইব। কেজি ধইরা বেইচা হিরোন কিনব মেরাইজ্যার কাছ থেইকা। মেরাইজ্যার ব্যবসা, যেই টাকা ভাঙ্গনের জন্য দেয়, সেইটা আবার হিরোন বেইচা ফিরত লইয়া লয়। পিন্টা আর বাবলুরে দেখলাম না। দুইটা পোলা আন্ধাইরের মইধ্যে ঘুইরা ঘুইরা ধাক্কা মারতাছে বেড়ার উপরে। একজন রাস্তার মাথায় খাড়াইয়া আছে পাহারায়। পুলিশ আইলে আওয়াজ দিব। বাবলু আর পিন্টারে কোনোখানে দেখলাম না। একজনরে জিগাইতে কইল মেরাইজ্যার লগে মাঠের দিকে গেছে। খবরটা শুইনা আমি মনে মনে হাসি। বাবলু মনে হয় পরি দেখতে গেছে। এই শালার পরি পোলাটার মাথা খাইল। মেরাইজ্যা হারামজাদা আবার বুঝাইছে নেশা না করলে পরি দেখন যায় না। সবগুলা পোলারে নেশা ধরাইতাছে। পেলাটফর্মে আইজ ভিড় নাই। রাইতে টেরেন আইব না। রেল পুলিশের দুইজন মামু লাঠি ঠুইকা চইলা যায়। আমি আমার বিছনা পাতি। হঠাত্ পিন্টা কই থেইকা দৌড়াইয়া আসে। ‘কাকা, জলদি আহেন... মাঠে ক্যাচাল হইছে।’ ‘কিয়ের ক্যাচাল?’ আমি উইঠা খাড়াই। একটা মাইয়া... মেরাইজ্যার লগে আসছিল... বাবলু হালায় হিরোন খাইয়া পরি দেখতে বসছিল... আপনে আহেন জলদি।’ আমি আর দেরি করি না। পিন্টার লগে মাঠের দিকে যাই। ভাঙ্গা দেওয়ালটা পার হইয়া মাঠে ঢুকতে আন্ধাইরে বাবলুর গলা শোনা যায়। ‘পরি আসছিল, পরি আসছিল... শালা মেরাইজ্যা মাইরা ফালাইছে।’ আমি আর পিন্টা দিশা ঠিক কইরা দৌড়াই। আমার বুকের ভিতরে ধক ধক করে। বাবলু কার কথা কয়, কে কারে মাইরা ফালাইছে? সামনে কয়েকটা ভাঙ্গা রেলের বগি ফালানো। তার পাশে হঠাত্ দেখি , বাবলু খাড়াইয়া দুই হাত মাথার উপরে তুইলা চিল্লাইতাছে। আমি গিয়া বাবলুরে ধরি। বাবলু আমার হাত ছুটাইয়া কয়, কাকা, পরি আসছিল। মেরাইজ্যা মাইরা ফালাইছে। বগির ভিতরে আছে... দেখেন... আমি পরির ডানা দেখছি। বিরাট-বিরাট সাদা রঙের ডানা। আমি বাবলুরে ছাইড়া ভাঙ্গা বগির ভিতরে উঁকি দেই। পিন্টা ম্যাচ জ্বালায়। আমি ভূত দেখলেও মনে হয় এত ডরাইতাম না। একটা মাইয়া পইড়া আছে। পরনের জামা-কাপড় ছিড়া। পিন্টা আরেকটা কাঠি জ্বালে। মাইয়াটা মইরা গেছে। গলা টিপ্যা মারছে কেউ। জিভ বাইর হইয়া গেছে। আমি এক লাফে বগির ভিতর থেইকা বাইর হই। ‘বাবলু, এইটা কী করছস? মাইয়াটা তো মইরা গেছে।’ বাবলু আউলা পাথালে হাঁটে। ‘হালায় হিরো খাইছে কাকা। হুঁশ নাই।’ পাশ থেইকা পিন্টার গলা শুইনা আমি শক্ত হইয়া যাই। হঠাত্ চাইরদিক দিয়া পুলিশের বাঁশি শোনা যায়। লগে অনেক মানুষের চিল্লাচিল্লি। বাবলু তখনও চিল্লাইতাছে, ‘কাকা, সত্যি পরি আসছিল, মেরাইজ্যা মাইরা ফালাইছে। আমি কিছু জানি না। আমি পরির ডানা দেখছি। অনেক বড় ডানা। অনেক বড়...।’ অন্ধকার মাঠ থেইকা হাওয়া আসে, কেউ কিছু আগুনে দিছে মনে হয়। পোড়া পোড়া ঘেরান আসে। পরির ডানা পুইড়া গেলে এইরকম ঘেরান বাইর হয়?