নিবন্ধন বাতিল প্রশ্নে সতর্ক ইসি

রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল ইস্যুতে বেশ সতর্কতা অবলম্বন করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। হুট করে নিবন্ধন বাতিলের সিদ্ধান্ত নিতে চান না অধিকাংশ কমিশনার। এই মুহূর্তে আগ বাড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কে জড়াতে চায় না এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। তবে গতকালই জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেয়া রায়ের স্থগিতাদেশের আবেদন খারিজ হওয়ায় দলটির নিবন্ধন যে টিকছে না সেটা মোটামুটি স্পষ্ট। এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ বলেন, হাইকোর্টের রায়ের কপি এখনো আমাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি। রায়ের কপি পাওয়ার পরে সিদ্ধান্ত নেব। তবে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ‘জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা’ সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে দলটির পক্ষে করা আপিল খারিজ হওয়ার পর গতকাল জরুরি বৈঠকে বসেন নির্বাচন কমিশনাররা। হাইকোর্টের রায় না পাওয়া পর্যন্ত জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হবে না বলে একমত হন কমিশনাররা। কারণ হিসাবে জানা গেছে, সম্প্রতি গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের প্রার্থিতা বাতিল সংক্রান্ত ৯১-ই ধারা বাতিল নিয়ে চাপে রয়েছে কমিশন। সুশীল সমাজ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অঙ্গনেও এটি নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে। এর মধ্যে তড়িঘড়ি করে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করতে প্রস্তুত নয় কমিশন। হাইকোর্টের রায় পাওয়ার পর সময় নিয়ে ধীরস্থিরভাবে বিষয়টি বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেবে ইসি। প্রসঙ্গত, সংবিধানের সঙ্গে দলের গঠনতন্ত্র সাংঘর্ষিক হওয়ায় গত বৃহস্পতিবার আদালত জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে। ২০০৮ সালে নিবন্ধনের সকল শর্ত পূরণ না করলেও শর্ত সাপেক্ষে জামায়াতকে নিবন্ধন দিয়েছিল ইসি। তবে জামায়াতকে নিবন্ধন দেওয়ায় কারো কোনো আপত্তি রয়েছে কিনা তা জানতে চেয়ে ইসি ২০০৮ সালের ২৬ ও ২৭ অক্টোবর সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। তখন এতে আপত্তি জানায় সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি, সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনসহ ৯টি সংগঠন। এই আপত্তির বিষয়ে ওই বছরের ১ নভেম্বর শুনানি গ্রহণ করে ৪ নভেম্বর দলটিকে নিবন্ধন দেয়া হয়। নিবন্ধিত হওয়ার আগে দলের নাম নিয়ে আপত্তি ওঠে। বলা হয়, ‘জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ’ এই নামের অর্থ হচ্ছে- বিদেশি কোন দলের বাংলাদেশ শাখা। এ অবস্থায় আগের নাম পাল্টে ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’ রাখা হয়। নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য ২০০৮ সাল থেকে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করে নির্বাচন কমিশন। ওই সময় ১১৭টি দল আবেদন করে এবং পরে খসড়া গঠনতন্ত্র জমা দিয়ে ৩৯টি দল নিবন্ধিত হয়। সংশোধিত গঠনতন্ত্র জমা না দেয়ায় ফ্রীডম পার্টির নিবন্ধন বাতিল করে নির্বাচন কমিশন। আর আদালতের রায় অনুযায়ী নিবন্ধন পায় বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএমএল। জামায়াতের গঠনতন্ত্রের ক্রুটিসমূহ ২০০৮ সালে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনের জন্য জামায়াত যে খসড়া গঠনতন্ত্র জমা দেয় তাতে বেশকিছু ক্রুটি ধরা পড়ে। যা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। জামায়াতের গঠনতন্ত্রের ২(৫) ধারায় বলা হয়-‘আল্লাহ ব্যতীত অপর কাহাকেও বাদশাহ, রাজাধিরাজ ও সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক মানিয়া লইবে না, কাহাকেও নিজস্বভাবে আদেশ ও নিষেধ করিবার অধিকারী মনে করিবে না, কাহাকেও স্বয়ংসম্পূর্ণ বিধানদাতা ও আইন প্রণেতা মানিয়া লইবে না এবং আল্লাহর আনুগত্য ও তাঁহার দেয়া আইন পালনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত নয়, এমন সকল আইন আনুগত্য মানিয়া লইতে অস্বীকার করিবে। কেননা স্বীয় সমগ্র রাজ্যের নিরঙ্কুশ মালিকানা ও সৃষ্টিলোকের সার্বভৌমত্বের অধিকার আল্লাহ ব্যতীত অপর কাহারও নাই।’ এছাড়া গঠনতন্ত্রের ভূমিকার শেষ অংশে বলা হয়- ‘মৌলিক বিশ্বাস ও চেতনার ভিত্তিতে ইসলামী সমাজ গঠনের মহান উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর এই গঠনতন্ত্র প্রণীত ও প্রবর্তিত হইল।’ পরে তিনবার কমিশন থেকে বলা হয়েছিল-এই অংশটুকু সংবিধানের মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এর ফলে গঠনতন্ত্রের ২(৫) ধারা ও ভূমিকার শেষ অংশ বাদ দিয়েই নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত হয় জামায়াত। কিন্তু ২০০৯ সালের নভেম্বরে জামায়াত গঠনতন্ত্র পুনর্মুদ্রণ করে। তাতে উল্লিখিত ভূমিকা ও ২ (৫) ধারা বহাল রাখা হয়।