বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে মাতৃভূমি

বিশ্বাসের বিপরীত শব্দ অবিশ্বাস। কিন্তু আমরা কাকে বিশ্বাস করবো? কীভাবে বিশ্বাস করবো? আর কতদিন ধরে বিশ্বাস করবো? কারণ বিশ্বাস নামক শব্দটি আজ অবিশ্বাসের ধোঁয়াশায় তন্দ্রাচ্ছন্ন। বেচারী বিশ্বাস যেন নাকে তেল দিয়ে ঘুমায়। আজ বিশ্বাসের ভেতরে ‘শ্বাস’ নেই। শব্দটি যেন তালের মতো শুধু শক্ত আঁটি নিয়ে নির্লজ্জভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তাই শব্দটা এখন ফাঁকা বুলির মতো শোনায়। পিতা আজ পুত্রকে, ভাই আজ বোনকে, প্রেমিক তার প্রেমিকাকে সর্বোপরি মানুষ আজ মানুষকে বিশ্বাস করে না। পুত্র সামান্য কারণে পিতাকে খুন করে, এক ভাই অন্য ভাইয়ের বুকে ছুরি চালায়, এক প্যাকেট সিগারেটের জন্য অথবা সামান্য পঞ্চাশ টাকার জন্য এদেশে মানুষ মানুষকে অবলীলায় খুন করে ফেলে। আবার অবিশ্বাস্য আইনের বলে এরা বুক উঁচু করে বেঁচে থাকে। তাই বিশ্বাস শব্দটির বিশ্বাসযোগ্যতা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। কোনো বস্তুদ্রব্যের গুণাগুণ যদি বাহ্যিক আবরণের দ্বারা নির্ণীত হতো তাহলে মাকাল ফল সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বভূমিতে শ্রেষ্ঠস্থান অর্জন করতো। তাই এ দেশের কোনো মানুষের বাহ্যিক আবরণ-আভরণ, আচার-ব্যবহার ও রূপ-সৌন্দর্যের বাহার দেখে তার অন্তরের কলুষতা ও চারিত্রিক দীনতা পরিমাপ করা সহজসাধ্য ব্যাপার নয়। রবীন্দ্রনাথ আশি বছর বয়সে লেখা ‘সভ্যতার সঙ্কটে’ বলেছিলেন, ‘মানুষের উপরে বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব’। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা বিশ্বাস রক্ষা করি কী ছলে ? কেননা এই বিশ্বাস, আন্তরিকতা, পরোপকার প্রবণতা সর্বোপরি মানুষের প্রতি মানুষের ভ্রাতৃত্ববোধ এবং ভালোবাসা ক্রমান্বয়ে সাম্রাজ্যবাদ এবং শক্তিশাসনের দাপটে সমাজ থেকে উঠে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এমনকি সরলতাও একশ্রেণির মানুষের কাছে এখন দুর্বলতার সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই জ্ঞান তাপস মোতাহার হোসেন চৌধুরীর মতো, ‘সত্যকে ভালোবাসা, সৌন্দর্যকে ভালোবাসা, ভালোবাসাকে ভালোবাসা—বিনা লাভের আশায় ভলোবাসা, নিজের ক্ষতি স্বীকার করে ভালোবাসা’—আজ আর কেউ বাসে না। আজ সবাই স্বার্থান্ধ, লোভে মত্ত, লাগামহীন ঘোড়ার মতো জীবন যাপন করে। অথচ এদের রশিটা যে রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতে সেটাও যেন এদেশে পুরনো ট্রেনের ভাঙা বগির মতো ধীরে ধীরে তাদেরকেই বয়ে চলে। মাতৃভূমির মানুষ এমনকি বৃহত্তর সমাজ আজ দুটি প্রতীকে বিভক্ত। আমরা একটি মার্কা দেখে অন্যটিকে দূরে সরিয়ে রাখি, মার্কা দেখে মানুষ বিচার করি, দলের প্রতি তার আনুগত্য পরিমাপ করি, এমনকি মার্কার মারপ্যাঁচে দোষগুণ নির্ণয় করি। মার্কার অদ্ভুত ক্ষমতা থাকে পাঁচ বছরব্যাপী। গায়ে মার্কা থাকলে সাতখুন এমনকি ফাঁসির আদেশও মাফ। তাই আজ বিশ্বাস-অবিশ্বাস ফেলে সবাই গায়ে সিল মারতে উদ্যত। এই মার্কাধারী, প্রতীকধারী, সিল-চিহ্নধারী মানুষ সমাজের সর্বত্র অক্টোপাসের মতো ছেয়ে গেছে অথবা বীজের মতো ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই রক্তবীজ থেকে দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জালের মতো বিস্তৃত হয়ে চলেছে। চ্যাম্পিয়ন মাতৃভূমির আর হারার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এ বিজয়ের ধারা অব্যাহতই থাকবে কি ? এ বিজয়ে আমরা উপহার পেয়েছি সন্ত্রাস, খুন, গুম, লুট, মাদকসহ আরো অনেক অনেক অজানা সামগ্রী। এ দেশের সর্বময় মহাক্ষমতাধর দুই মার্কাধারীরা রমজান মাসেও কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না। ফলে একজনের ইফতার পার্টিতে অন্যজন অংশ নেয় না। নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে তাদের যেমন বিশ্বাসের কোনো ঘাটতি নেই, তেমনি বাকি সব কাজে অবিশ্বাসেরও কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু স্বাধীনতার চার দশক পরে বাংলাদেশে যে তরুণ সম্প্রদায় বেড়ে উঠেছে, তাদের বিশ্বাস অর্জন করাটা কি মার্কাধারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়? যে অসংখ্য তরুণ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে শাহবাগে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতায়’ অংশ নিয়েছিল, তাদের বিশ্বাস কি শেষ পর্যন্ত রক্ষা পেয়েছে? অথচ একই জায়গায় অযোগ্য লোকদের যোগ্য করতে প্রশাসনযন্ত্র নির্বিচারে মেধাবীদের দমন করছে। এর ফলাফল কী? যোগ্য লোক যখন অযোগ্য লোকের ভিড়ে হারিয়ে যায়, তখন সে সমাজের চেহারা আয়নার মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। তরুণরা এদেশে ভোটের হিসাবনিকাশ সবসময়ই পরিবর্তন করে দিতে পারে। হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করে এদেশের তরুণদের মন জয় করা কি খুব সহজ ব্যাপার ছিল ? তাই নিজেদের বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল থেকে বেরিয়ে এসে আমরা কি জনগণের প্রতি বিশেষ করে তরুণদের প্রতি আস্থা রাখতে পারি না ? কিন্তু এ বিশ্বাস অর্জন করতে গিয়ে তরুণদের আফিম খাওয়ানোর প্রয়োজন নেই। কেননা এখন তরুণরা ফাঁকা বুলিতে আর বিশ্বাস করে না। মুক্তিযুদ্ধ-রাজাকার খেলাও এখন শেষ। এখন তরুণদের সামনে সোনার বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন। সেদিকেই তাদেরকে এগিয়ে নিতে আসুন। তারা অপেক্ষা করে আছে পাড়ে। তারা দেখতে চায়, নৌকার মাঝি এসে রাশি রাশি ধান ভরে নিয়ে যাচ্ছে, অজানার উদ্দেশ্যে নয় বরং মাতৃভূমি গড়ার লক্ষ্যে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়