বিলবোর্ড নিয়ে হৈ চৈ

৯৫ ভাগই অবৈধ ঢাকা সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, রাজধানীর ৯৫ ভাগ বিলবোর্ডই অবৈধ সরকারি প্রচারণা নয় তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, সরকার বা প্রশাসনের উদ্যোগে এ ধরনের কোন বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়নি রাজধানী জুড়ে বিলবোর্ডে সরকারের সাফল্যগাথা প্রচার নিয়ে ব্যাপক হৈ চৈ শুরু হয়েছে। এর পক্ষে-বিপক্ষে চলছে নানা আলোচনা। রাজনৈতিক নেতাদের বক্তৃতায়ও এখন এই বিলবোর্ড। বিরোধী পক্ষ বলছে, অন্যের বিলবোর্ড দখল করে সরকারের পক্ষ থেকে যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে তা অসত্য, অর্ধসত্য ও মিথ্যা। আওয়ামী লীগের নেতারাও বলেছেন, বিলবোর্ডের একটি বক্তব্যও অসত্য প্রমাণ করতে না পারলে তাদের ক্ষমা চাইতে হবে। এভাবেই রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়াচ্ছে বিলবোর্ড। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নাম-পরিচয় প্রকাশ না করে অভিযোগ করা হচ্ছে, তাদের ভাড়া নেয়া বিলবোর্ডে সরকারের সাফল্যগাথা প্রচার করা হয়েছে। এক রাতের মধ্যেই তাদের কিছু না জানিয়ে সরকারের পক্ষে কে বা কারা বিলবোর্ডের লেখা পরিবর্তন করেছে। এমন অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে এসব বিলবোর্ড কি আদৌ অনুমোদিত? কে তাদের অনুমোদন দিয়েছে? ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন (বিএন) বিপন কুমার সাহা ইত্তেফাককে বলেন, রাজধানীতে যে বিলবোর্ড আছে, তার ৯৫ ভাগই অবৈধ। কারো বিলবোর্ড যদি বেদখল হয়ে থাকে, তারা সিটি করপোরেশনে অভিযোগ নিয়ে আসতে পারেন। তাদের অভিযোগ সত্য হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু গতকাল মঙ্গলবার ইত্তেফাককে বলেন, সরকারি বা প্রশাসনের উদ্যোগে কোন বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়নি। বেসরকারি পর্যায়ে বা ব্যক্তি উদ্যোগে অনেকে হয়ত বিলবোর্ডের মাধ্যমে দলীয় প্রচারণা চালাচ্ছেন। গতকাল এক অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার বলেন, বিলবোর্ড দখল করে সরকারের চালানো প্রচারণা অসত্য। তার জবাবে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেছেন, একটা বিলবোর্ডও দখল করা নয়। আর কোন বক্তব্য অসত্য তা প্রমাণ করতে না পারলে তাদের জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। দেশের মানুষ তেমনটাই প্রত্যাশা করেন বলে উল্লেখ করেন হানিফ। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীতে বর্তমানে প্রায় ১৫ হাজার বিলবোর্ড রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৪ হাজারই অবৈধ। বৈধ বিলবোর্ডের সংখ্যা মাত্র ১ হাজার ২০০। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এক হাজার, বাকি ২০০ অন্যান্য সংস্থার অনুমোদন দেয়া। অন্যসব বিলবোর্ডই অবৈধ। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আখতার হোসেন ভুঁইয়া ইত্তেফাককে বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অধীনে প্রায় ৫শ বিল বোর্ড রয়েছে। বৈধ থেকে অবৈধ বিলবোর্ডের সংখ্যা বেশি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঈদের পর অবৈধ বিলবোর্ড উচ্ছেদ অভিযান শুরু হবে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী আনসার আলী খান ইত্তেফাককে বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫ শতাধিক বিলবোর্ড রয়েছে। প্রতিবছর জানুয়ারি মাসে টেন্ডারের মাধ্যমে এসব বিলবোর্ড বিভিন্ন বিজ্ঞাপনী সংস্থাকে ভাড়া দেয়া হয়ে থাকে। এখন বিজ্ঞাপনী সংস্থা কাকে ভাড়া দেয়, সে তথ্য সিটি করপোরেশনের কাছে নেই। আর গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, তাদের অধিদপ্তর থেকে সরকারের সাফল্যগাথা নিয়ে কোন ধরনের প্রচার বা প্রচারণা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। তাই বিষয়টি তারা অবহিত নন। রাজধানীর মানিকমিয়া এভিনিউ, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, মত্স্যভবন মোড়, পল্টন, গুলিস্থানসহ বিভিন্ন জায়গায় এখন বিলবোর্ডে শোভা পাচ্ছে সরকারের সাফল্যগাথা। যদিও কারা এটি প্রচার করছে, তার কোন নাম-পরিচয় ব্যবহার করা হয়নি। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সাবেক একজন সচিব ইত্তেফাককে বলেন, কোন মন্ত্রণালয় বিলবোর্ডে প্রচারণা চালাতে পারে না। এমনকি সরকারও এই প্রচারণায় যেতে পারে না। কারণ জনগণের টাকায় সরকার চলে। তবে ব্যক্তি উদ্যোগে এসব প্রচারণা যে কেউ চালাতে পারেন। বিলবোর্ডের দখল-বেদখল আর বৈধ-অবৈধ নিয়ে যখন বিস্তর আলোচনা তখন সেই বিলবোর্ডের মধ্যে ঢুকে পড়েছে প্রকাশ্য রাজনীতি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিগত জোট সরকারের আমলে বিলবোর্ড বাণিজ্যের প্রধান ব্যক্তি ছিলেন একজনই। পুরো ঢাকা শহরে বিলবোর্ডের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ ছিল তার হাতেই। কিন্তু বর্তমান সরকারের আমলে কোন একক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে নেই এই বিলবোর্ড বাণিজ্য। ক্ষমতাধর কয়েকজনের পরিবারের সদস্যরাই এখন এগুলোর নিয়ন্ত্রক। খোদ সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীল সূত্র থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে, ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে তাদেরও কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশ রয়েছে এই অবৈধ বিলবোর্ড ব্যবসায়। আবার অবৈধ বিলবোর্ডের সঙ্গে যেহেতু ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা থাকেন, সে কারণে সেগুলো অপসারণ করতে গিয়েও নানা ঝক্কির মধ্যে পড়তে হয় বলে স্বীকার করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা। আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর জুনে অবৈধ বিলবোর্ড উচ্ছেদের অভিযানে নামে দুই সিটি করপোরেশন। কিন্তু পরের দুই মাসে পাঁচটি বিলবোর্ডের বেশি উচ্ছেদ করতে পারেনি দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। আর উত্তর সিটি করপোরেশন মাঠেই নামেনি। এভাবেই শেষ হয় অভিযান। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন (বিএন) বিপন কুমার সাহা বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ বিলবোর্ডগুলোকে প্রচলিত আইনি কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো প্রয়োজনীয় ভারি যন্ত্রপাতি না থাকা। বিলবোর্ড উচ্ছেদের জন্য ৫০ টন ক্ষমতাসম্পন্ন ক্রেন প্রয়োজন হয়। কিন্তু উত্তর সিটি করপোরেশনের এ ধরনের কোনো ক্রেন নেই। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে একটি ক্রেন রয়েছে। প্রয়োজন হলে আমরা তাদের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে কাজ করি।