দিক নির্দেশনার অভাবে সংকট কাটছে না পাহাড়ে
রফিকুল বাসার ও তরুণ ভট্টাচার্য
প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০১৩, ২২:৪৫
পার্বত্য তিন জেলায় অব্যাহত সন্ত্রাস, যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, চাঁদাবাজি, বন্দুক-যুদ্ধ, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত বন্ধে সরকারের সুস্পষ্ট নীতিমালা বা দিকনির্দেশনা নেই। আর সে কারণেই সংঘাত নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না বলে মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দা আর বিশ্লেষক মহল। অভিযোগ পাওয়া গেছে, এসব ঘটনার পর প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ থাকলেও তা প্রয়োগ করতে গেলে বিপত্তি দেখা দিচ্ছে।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেছেন, খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, গাড়ি পোড়ানো ও ভ্রাতৃঘাতি যুদ্ধে যোগ দেয়ার মতো অনেক অভিযোগে অভিযুক্ত কাউকে গ্রেফতার করা হলেও পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে প্রতিবাদের ঝড় উঠে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দোষারোপ করে। প্রকৃত অপরাধীদের ধরা হলে আদিবাসী বা জুম্ম জনগণের উপর জুলুম-নির্যাতন করা হচ্ছে, ষড়যন্ত্র হচ্ছে- এমন উল্টো অভিযোগ আনা হয়। সরকারি কর্মকর্তারা বলেছেন, আমরা আছি উভয় সংকটে।
স্থানীয় অনেকে মনে করেন আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরব ভূমিকা, অবহেলা, শৈথিল্যভাব এবং নিজেদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায় না। তাদের সময়োপযোগী পদক্ষেপ থাকলে এ ধরনের সমস্যা হতো না।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা তাদের শৈথিল্যভাব প্রদর্শন ও উদাসীনতার অভিযোগ মানতে নারাজ। তারা বলেছেন, সরকারের সুস্পষ্ট নীতিমালা ও দিক নির্দেশনা থাকলে এবং সমন্বিত আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা সৃষ্টি করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে, এতে কোন সন্দেহ নেই।
সরকারের সঙ্গে পাহাড়ি ও বাঙ্গালিদের অধিকার নির্ধারণের বিষয়ে এখনো বোঝাপড়া বা সমঝোতা না হওয়ায় জটিলতা চরম আকারে রূপ নিচ্ছে। সোজা কথা পাহাড়ি ও বাঙ্গালিদের মধ্যে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তিতে দূরত্ব যতই বাড়ছে ততই পার্বত্য চট্টগ্রাম অশান্ত হয়ে উঠছে। দ্বিধাবিভক্ত পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে পার্বত্য শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন ও এর বিরোধিতা নিয়ে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত এবং পাহাড়ি-বাঙ্গালির মধ্যে ভূমির অধিকার নিয়ে দ্বন্দ্ব সংঘাতে বার বার পার্বত্য চট্টগ্রাম অশান্ত হয়েছে।
কিন্তু এখন জাতিগত সংকট ও সংঘাতের ধরন পাল্টে গেছে। অতি নগণ্য সব ঘটনাকে কেন্দ করেই পাহাড়ি-বাঙ্গালি জনগোষ্ঠীর মাঝে জাতিগত সহিংসতা সৃষ্টি হচ্ছে। পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের ঘাটতি এবং অসহিষ্ণু হয়ে উঠার কারণেই এখন নগণ্য কোন অজুহাতেই পরিস্থিতি সামপ্রদায়িকতায় রূপ নিচ্ছে- এমন মন্তব্য করেছেন সচেতন নাগরিকরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকে সামপ্রতিক জেলার বিভিন্ন রুটে ভাড়ায় চালিত কয়েকটি মোটর সাইকেল ছিনতাই ঘটনা এবং বাঙ্গালি চালককে হয় অপহরণ না হয় মারধরসহ খুনের ঘটনাকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য দায়ী করেন।
ভাড়ায় চালিত মোটর সাইকেলের বাঙ্গালি চালককে অপহরণ ও মারধর, মোটর সাইকেলে অগ্নিসংযোগের সর্বশেষ ঘটনা দুটির একটি ঘটেছে গত ৩ আগস্ট মাটিরাঙ্গার বান্দরশিং এলাকায় এবং অপরটি ঘটেছে ৫ আগস্ট সোমবার রামগড়ের ছোট বেলছড়ি এলাকায়।
নির্বিচার চাঁদাবাজি, অপহরণ,ভাড়ায় চালিত মোটর সাইকেল ছিনতাই, চালক অপহরণ, মোটর সাইকেলে অগ্নিসংযোগ এবং পাহাড়ি সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীকে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ হিসেবে গ্রেফতার করার জের ধরেও সৃষ্টি হচ্ছে জাতিগত সংঘাতের। কি পাহাড়ি বা অপাহাড়ি সকলেই যেন চরম অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। তবে এ অবস্থা জেলা বা উপজেলা শহরের চেয়ে গ্রামাঞ্চলেই বেশি।