এনজিওতে চাকরির সুযোগ

আমাদের দেশে ছোটবেলা থেকেই ভবিষ্যতে পেশা হিসেবে ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ারকেই বেছে নিতে শেখানো হয়। সেখান থেকে কেউ যদি বলে এনজিও’র কর্মী হবো, তাহলে অবাক হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তবে বর্তমান সময়ে এসে এতে খুব বেশি অবাক হওয়ার কারণ নেই। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে কেউ যদি জীবনের শুরু থেকেই ভেবে নেয় কীভাবে তার ক্যারিয়ার গড়বে আর তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপই বা কী হবে, সেক্ষেত্রে তার গাইডলাইনের প্রয়োজন আছে। সরকারি চাকরি তো আছেই, তার সাথে সাথে বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রে যে সংস্থাগুলো সবচেয়ে এগিয়ে আছে তা হলো বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বা এনজিও, বেসরকারি ব্যাংক এবং বেসরকারি টেলিকমিউনিকেশন সংস্থা। ইদানিং এনজিওগুলোর নানামুখী কাজের সুযোগ এবং কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন সুবিধা থাকায় এ ক্ষেত্রে ক্যারিয়ার গড়ার আগ্রহীদের সংখ্যাও দিন দিন বেড়ে চলেছে। কাজের নানা ক্ষেত্র এক সময় এনজিওতে চাকরি মানেই মানুষ বুঝত মাঠকর্মী। যে কেউ শুনেই বলতো এনজিও, তার মানে তো মাঠে মাঠে ঘুড়ে বেড়ানো। কিন্তু না, এনজিওগুলোর কাজের ক্ষেত্র যেমন প্রসারিত, কর্মক্ষেত্রও এখন তেমন বিচিত্র। আন্তর্জাতিক, দেশি ও স্থানীয় এনজিওগুলোতে বিভিন্ন বিভাগ, যেমন- গবেষণা, উন্নয়ন, প্রোগ্রাম, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিভাগ, মানবসম্পদ উন্নয়ন বিভাগ, হিসাবরক্ষণ বিভাগ থাকে। এসব ক্ষেত্রেও রয়েছে চাকরির সুযোগ। যেমন, যদি গবেষণা বিভাগ হয় তবে তার অধীনে রয়েছে গবেষক, সহকারী গবেষক, মাঠ গবেষণা পর্যবেক্ষক, পর্যবেক্ষক, গবেষণা পদ্ধতি উন্নয়ন, তথ্য সংগ্রহকারী এবং গবেষণা প্রকল্প উন্নয়ন এবং গবেষণা প্রতিবেদক। তেমনি অন্যান্য বিভাগের অধীনেও রয়েছে আরও সাবডিভিশান। তাই যে কেউ যে কোনো বিষয়ে পড়াশোনা করেও এনজিওতে ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখতে পারেন নিশ্চিন্তে। পড়ালেখার খবর আমি বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স করেছি, আমাকে দিয়ে কী গবেষণা হবে? আমি এমবিএ করেছি, এনজিওতে কী আমার দরকার আছে? এমন চিন্তা যাদের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে তারা এবার নড়েচড়ে বসেন। ইচ্ছা করলেই আপনি এনজিও’র গবেষক দলের সদস্য হতে পারবেন কিংবা হিসাব বিভাগে আপনার প্রতিভা দেখাতে পারবেন। আসলে এনজিওতে কাজ করার ব্যাপারে কী বিষয়ে পড়ালেখা করেছেন, সেটা বড় নয়। সব বিভাগ থেকেই কাজ করার সুযোগ রয়েছে। তবে সমাজবিজ্ঞান, সমাজকল্যাণ, নৃবিজ্ঞান, লোক প্রশাসন, অর্থনীতি, উন্নয়ন অধ্যয়ন, নারী অধ্যয়ন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানসহ সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো বেশি প্রাধান্য পেয়ে থাকে। তবে সামাজিক গবেষণার ক্ষেত্রে ইতিহাস, বাংলা, ইংরেজি, মনোবিজ্ঞান, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিষয়গুলোর গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংখ্যাত্মক গবেষণার ক্ষেত্রে পরিসংখ্যান ও গণিত বিষয়ের চাহিদা সবসময়ই বেশি। এ ছাড়া প্রতিটি এনজিও’র হিসাব বিভাগে অ্যাকাউন্টিং ও ফিন্যান্স, ব্যবস্থাপনা বিভাগে ম্যানেজমেন্ট এবং মানবসম্পদ বিভাগে হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্টে যাদের মেজর নিয়ে এমবিএ, তাদের রয়েছে সুযোগ। ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়াররাও হতাশ হবেন না। এনজিওর সকল গঠনমূলক কাজের জন্য ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ করা হয়। আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর বেশিরভাগ এনজিও স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন, প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার, স্বাস্থ্য বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি, এইচআইভি/ এইডস নিয়ে কাজ করে এবং এসব বিষয়ে অগ্রাধিকার পায় ডাক্তাররা। তাই এমবিবিএস পাস করে মোড়ের দোকানকে চেম্বার বানানোর থেকে এনজিওতে উন্নয়নকর্মী হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে পারেন। কাজের এলাকা এনজিওতে চাকরির প্রাথমিক পর্যায়ে সবাইকেই প্রোগ্রাম এরিয়াতে গিয়ে কিংবা গবেষণার এলাকাতে গিয়ে কাজ করতে হবে এরকম মানসিক প্রস্তুতি থাকতে হবে। এনজিওতে চাকরি করতে হলে বিভিন্ন বৈরি পরিবেশের সম্মুখীন হতে পারে। আবার প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করার সময় হঠাত্ অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ সমস্ত সমস্যায় মানিয়ে নেওয়া ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকতে হবে। চাকরির বাজারে এনজিও চাকরি শুধু চাহিদার সৃষ্টি করছে না এর কর্মক্ষেত্রের বিস্তার ও নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ রয়েছে এখানে। বর্তমানে অনেক দেশি এনজিও দেশের বাইরে বিভিন্ন দেশে প্রোগ্রাম শুরু করেছে। আপনি যদি নিজেকে প্রমাণ করতে পারেন, তবে আপনিও পেতে পারেন কেনিয়া, আফগানিস্তান কিংবা শ্রীলংকায়; আর নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগটাও পাবেন এতে করে। বেতন-ভাতা বিভিন্ন এনজিও’র বেতনক্রম বিভিন্ন হয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোতে বেশি ও দেশি ও স্থানীয় এনজিও’র বেতনক্রম কিছুটা কম থাকে। এ ছাড়া দেশের বাইরের প্রোগ্রামে কাজ করলে পেমেন্ট হয় আন্তর্জাতিক স্কেলে। দেশি, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোতে নিয়মিত, অনিয়মিত, সাময়িক এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। সাধারণত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি সংবাদপত্র ও ইন্টারনেটে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সাইটে পাওয়া যায়। এ ছাড়া এখন জব পোর্টালগুলোতেও মিলবে এসব বিজ্ঞাপনের খবর। আবার প্রতিটি এনজিও’র রয়েছে নিজস্ব মানবসম্পদ বিভাগ। সেখানে নিজের সিভি, আবেদনপত্র ও ছবি জমা দিয়ে রাখতে পারেন। তাদের চাহিদা অনুযায়ী নিয়োগের সময় তারা আপনাকে ডাকতেই পারে। বাড়তি যোগ্যতা এনজিওতে কাজ করার জন্য পড়ালেখার বিষয় নিয়ে কথা নেই। তবে কোনো এনজিওতে কাজ করতে চাইলে তাদের কাজের ধরণ অনুযায়ী কিছু বাড়তি যোগ্যতা অর্জন করে নিতে হবে। আর কম্পিউটারের প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ জানা তো বাধ্যতামূলক। বিশেষ করে এমএস ওয়ার্ড, এক্সেল, পাওয়ার পয়েন্ট এবং এসপিএসএস সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকা দরকার। আর ইন্টারনেটের ব্যবহারটাও জানতে হবে। আর বসে থাকা কেন, এখনই এনজিওতে নিজের ক্যারিয়ারের জন্য মনোনিবেশ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে পারেন।