ফের নিরানন্দ ঈদ শেয়ারবাজার বিনিয়োগকারীদের

ঈদ যেন দুখের বারতাই বয়ে আনে শেয়ারবাজারের ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের কাছে। ২০১০ সালের পর থেকে যতবার ঈদ এসেছে ততবারই এ মানুষগুলোর চোখে পানি ঝরেছে। সবাই যখন ঈদের আনন্দে উদ্বেলিত তখন তারাও ছেলে সন্তান আর পরিবার-পরিজন নিয়ে আনন্দে মেতে উঠতে চান। কিন্তু শেয়ারবাজারের উপর্যুপরি ক্ষত তাদের আনন্দ ম্লান করে দেয়। তাই ঈদ আসলেই এক অজানা শঙ্কা ধেয়ে আসে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের দিকে। একাধিক বিনিয়োগকারীর সাথে কথা বলে জানা গেছে তাদের বিষাদময় ঈদের কথা। আরিফুল হক। ২০১০ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স পাস করে চাকরি খুঁজছেন। এ সময় বন্ধুর কাছ থেকে শেয়ারবাজারের কথা শুনে আগ্রহী হন বিনিয়োগে। ভাইয়ের কাছ থেকে ঋণ করে ৪ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। কিছু টাকা লাভ হয়। বাবার কাছ থেকে নেন পেনশনের ১৪ লাখ টাকা। মার্জিন লোনসহ তার মোট বিনিয়োগ দাঁড়ায় ২৫ লাখ টাকায়। মাসে মাসে লাভ আসছিল ভালোই। কয়েক মাসে প্রায় সাড়ে ১০ লাখ টাকা লাভ হয়ে যায়। সব টাকাই যখন বিনিয়োগে ঠিক তখনই আসে মহাধস। ধস শুরু হলেও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পক্ষ থেকে ও অর্থমন্ত্রী নিজেও বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রি না করতে অনুরোধ করেন। ফলে আশান্বিত হয়ে শেয়ার বিক্রি থেকে বিরত থাকেন আরিফুল হক। কিন্তু দফায় দফায় পতনের ফলে শেষ পর্যন্ত তার বিনিয়োগের বাজার মূল্য ঋণাত্মক হয়ে পড়ে। বর্তমানে ব্রোকারেজ হাউসের কাছে তার ঋণ দাঁড়িয়েছে তিন লাখ টাকায়। জিয়াউল হক। নারায়ণগঞ্জে কাপড়ের ব্যবসা করতেন। তারই এক ব্যবসায়ী বন্ধুর কাছ থেকে শেয়ারবাজারে উত্তরোত্তর দাম বাড়ার কথা শুনে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে উত্সাহী হন। পরে তার নিজের তিন লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। লাভ আসতে শুরু করে। ফলে বিনিয়োগ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। স্ত্রীর গহনা বিক্রি করে ৭ লাখ টাকা নিয়ে আসেন শেয়ারবাজারে। লাভের মুখ দেখে শেষ পর্যন্ত কাপড়ের ব্যবসা গুটিয়ে সব টাকা বিনিয়োগ করেন শেয়ারবাজারে। মার্জিন লোন নিয়ে ব্যবসা করতে শুরু করেন। লাভ আসতে থাকে। ভালোই কাটছিল দিন। হঠাত্ আসে ডিসেম্বরের সেই মহাধস। দফায় দফায় নিঃস্ব হতে থাকেন জিয়াউল হক। এক পর্যায়ে মার্জিন লোনের চাপে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন তিনি। এখন একদিকে তিনি ঋণগ্রস্ত অন্যদিকে ব্যবসাও বন্ধ। ফলে পরিবার চালাতে পারছেন না। এ পরিস্থিতিতে ঈদে সন্তানদের জন্য কিছু কিনে দেয়া অসম্ভব। ফলে ঈদ ঘনিয়ে আসলেই জিয়াউল হক যেন আরও মুষড়ে পড়েন। এভাবে অসংখ্য বিনিয়োগকারী বিনিয়োগ হারিয়ে দিশেহারা। তাদের অনেকেই পরিবার চালাতেই হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন। এ অবস্থায় ঈদে সন্তানদেরকে নতুন জামা কিনে দেয়ার সামর্থ্য নেই। ফলে ঈদ যতটা আনন্দের শেয়ারবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের কাছে ততটাই নিরানন্দের। গত আড়াই বছরে বার বার তারা স্বপ্ন দেখেছেন সুদিনের। যত স্বপ্ন দেখেছেন ততই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ বাজার থেকে কেউ কেউ বড় অঙ্কের টাকা গড়ে নিলেও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা তাদের টাকা হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। ২০১০ সালে ডিসেম্বরে মহাধসের উত্পত্তি। যার ক্ষত এখনও শুকায়নি। অদৃশ্য এ ক্ষত এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন দেশের লাখো বিনিয়োগকারী ও তাদের পরিবার। বিনিয়োগ হারানোর ব্যথা সইতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন একাধিক বিনিয়োগকারী। বিনিয়োগকারীদের অভিমত, যদি সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমে বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করা হতো এবং বিনিয়োগকারীদের নির্দেশনা দেয়া হতো, তাহলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ হারাতেন না। ঝরে পড়ত না কয়েকটি মূল্যবান প্রাণ।