খেলাপি ঋণে বিপাকে বাণিজ্যিক ব্যাংক

ব্যবসা-বাণিজ্যের মন্দায় ব্যাংকগুলো নতুন করে ঋণ বিতরণ করতে পারছে না। অন্যদিকে আগে যেসব ঋণ বিতরণ করা আছে সেসব ঋণের টাকাও ফেরত পাচ্ছে না। ফলে খেলাপি ঋণের সংখ্যা বাড়ছে অস্বাভাবিকভাবে। এ অবস্থায় ব্যাংকগুলো পড়েছে মহাবিপাকে। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের ১১ দশমিক ৯১ শতাংশ খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। জুন প্রান্তিক শেষে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫২ হাজার ৩১০ কোটি টাকায়, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৩ হাজার ৩১০ কোটি টাকা বেশি। আর চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিকের চেয়ে এক হাজার ২৯০ কোটি টাকা বেশি। তবে তিন মাসের ব্যবধানে প্রভিশন ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ব্যাংকাররা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নীতিমালার আলোকে মার্চ প্রান্তিক থেকে ব্যাংকগুলো ঋণ শ্রেণিকরণ করছে। নতুন নীতিমালার কারণে শ্রেণিকৃত (খেলাপি) ঋণের পরিমাণ বেড়ে গেছে। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা যাচ্ছে। এজন্য ঋণ গ্রহীতারা ঋণের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। ফলে বাড়ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। খেলাপি ঋণ বাড়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী বলেন, নতুন নীতিমালার ফলে প্রথম দিকে ব্যাংকগুলো কিছুটা সমস্যায় পড়লেও পর্যায়ক্রমে তা কাটিয়ে উঠবে। প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় দ্বিতীয় প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বাড়ার হারটা কমেছে। একই সঙ্গে প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তাও অনেকটা কমে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, গত বছরের (২০১২) জুন শেষে ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২৯ হাজার এক কোটি টাকা, যা ওই সময়ের মোট ঋণের ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ ছিল। তিন মাস আগে তথা গত মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৫১ হাজার ২০ কোটি টাকা, যা ছিল মোট ঋণের ১১ দশমিক ৯০ শতাংশ। শ্রেণিকৃত ঋণের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, জুন শেষে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চার বাণিজ্যিক ব্যাংকে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ২৬ শতাংশ। গত মার্চ শেষে ছিল ২৪ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা বা মোট বিতরণ করা ঋণের ২৭ দশমিক তিন শতাংশ। বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতে মোট শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৬১১ কোটি টাকা (মোট ঋণের ছয় দশমিক ৬২ শতাংশ), মার্চে ছিল ১৭ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা (ছয় দশমিক ২৩ শতাংশ)। বিশেষায়িত ব্যাংকে সাত হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা (২৬ শতাংশ), মার্চে ছিল সাত হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা (২৭ দশমিক ১৭ শতাংশ)। বিদেশি ব্যাংকে শ্রেণিকৃত ঋণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৮৮ কোটি টাকা (চার দশমিক ৬৬ শতাংশ)। আর তিন মাস আগে ছিল এক হাজার ৫৮ কোটি টাকা (তিন দশমিক ২৩ শতাংশ)। এদিকে তিন মাসের ব্যবধানে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ বাড়লেও কমেছে প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ। জুন শেষে প্রভিশন ঘাটতি কমে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৪৬৩ কোটি টাকায়। গত মার্চ শেষে এ ঘাটতি ছিল নয় হাজার ৪৫৮ কোটি টাকা। মূলত রাষ্ট্রীয় মালিকানার চার বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রভিশন সংরক্ষণে উন্নতি হওয়ায় সামগ্রিক ব্যাংক খাতে প্রভাব দেখা দিয়েছে। গত মার্চ শেষে চারটি ব্যাংকের ৭ হাজার ৪৬৮ কোটি টাকা ঘাটতি ছিল, জুনে তা কমে ৩৯১ কোটিতে নেমে এসেছে। এছাড়া গত মার্চে ঘাটতির তালিকায় ছিল ১১টি ব্যাংক, এখন তা কমে ৮টিতে নেমে এসেছে। জুন শেষে প্রভিশন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের ৬৩৫ কোটি টাকা, রূপালীর ৪২৩ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এক হাজার ৫৭১ কোটি, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ৩০৫ কোটি ও বাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট ব্যাংকের ৬২ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৯৮ কোটি টাকা ও ন্যাশনাল ব্যাংকের ২৬৯ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে।