বাড়ির পথে লাখো লাখো মানুষ
প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০১৩, ২৩:০৭
আজ চাঁদ উঠলে কাল ঈদ। তাই শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত নগরবাসী। কেনাকাটা আগেই সেরে ফেলেছেন। গত কয়েকদিন ধরে শুরু হয়েছে ট্রেন, বাস কিংবা লঞ্চে করে চিরচেনা সেই প্রিয় গ্রামে ফেরা। আহ! সেই ফসলের ক্ষেত, মাটির আল ধরে গ্রামে ফেরা! যাত্রাপথে বার বার মনের চোখে ভেসে উঠছে মায়ের মুখ। বাস, ট্রেন কিংবা লঞ্চে শুধু মানুষ আর মানুষ। বসবার জায়গা তো দূরের কথা, ঠিকমতো দাঁড়ানোও কষ্টসাধ্য। তবুও নাড়ীর টানে প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের ছুটি কাটাতে শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়ির পথে ছুটছেন সবাই। কোনো দুর্ভোগ কিংবা কষ্টকে পাত্তা দিচ্ছেন না কেউ-ই।
গ্রামমুখী এমন জনস্রোতের ফলে এখন অনেকটাই খালি হয়ে গেছে ঘনবসতির নগরী ঢাকা। শুধুমাত্র বিপণী বিতান, বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাট এলাকা ছাড়া রাজধানীর অধিকাংশ সড়কই এখন বেশ ফাঁকা। আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর নিত্যদিনের চেহারা পুরোপুরিই পাল্টে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে গতকাল বুধবার দপুরে গাবতলী বাস টার্মিনালে যাওয়ার পথেই পড়তে হয় বিপত্তিতে। শ্যামলীর আগে থেকেই সড়ক অবরুদ্ধ হয়ে আছে যানজটে। এমন যানজটের কারণে ঘরমুখো বহু মানুষ বাস থেকে নেমে পায়ে হেঁটেই রওয়ানা দেন টার্মিনালের পথে। দেখা গেল, শ্যামলী, কল্যাণপুর ও মাজার রোড এলাকায় লোকাল বাস ও যাত্রীবাহী দূরপাল্লার বাসগুলো রাস্তার ওপর এলোমেলো অবস্থানের কারণেই মূলত এমন জটলা। গাবতলী টার্মিনালের সামনের রাস্তায়ও একই দৃশ্য। স্বল্প দূরত্বের গন্তব্যে চলাচলকারী কিছু বাস মূল সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলার কারণে পুরো এলাকা স্থবির হয়ে গেছে যানজটে। এরপর আমিনবাজারের আগে মিরপুর সেতুকে ঘিরে আরেক দফা জটলা। সবমিলিয়ে ঢাকা থেকে বের হতেই নষ্ট হচ্ছে কয়েক ঘণ্টা সময়।
অন্যদিকে উত্তরা থেকে টঙ্গি সেতু হয়ে গাজীপুরের দিকে যেতেও একই ধরনের যানজটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে ঈদযাত্রীদের। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ি এলাকায়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের যাত্রীদের এই এলাকা পার হতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকা পড়ে থাকতে হচ্ছে।
বাগেরহাটগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেসের যাত্রী রুহুল মোল্লা ইত্তেফাক প্রতিনিধিকে বলেন, পুলিশ একটু সক্রিয় হলেই ঢাকা থেকে বের হওয়ার পথে এতোটা যানজট হতো না। কিন্তু পুলিশের যেসব সদস্য রাস্তায় দায়িত্ব পালন করছেন তাদেরকে অসহায় অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বুধবার ভোর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে স্রোতের মতো মানুষ ছুটতে থাকেন বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট কিংবা রেলস্টেশনের দিকে। সম্ভাব্য যানজটের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে অনেকেই তাদের যাত্রার নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই ঘর থেকে বের হন। এমনই একজন ঝিনাইদহের হরিনাকুন্ডুর যাত্রী নূর রহমান আকন্দ। চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্সের অগ্রিম টিকিট নেয়া ছিল তার। সকাল ১০টায় গাড়ি ছাড়ার কথা থাকলেও যানজটের চিন্তায় তিনি বাসা থেকে রওনা দেন ভোর সাড়ে ৬টায়। অবশ্য সকাল ৮টার মধ্যেই তিনি গাবতলী টার্মিনালে পৌঁছে যান। এরপর দেখা গেল যে, তার নির্ধারিত গাড়িটি যথাসময়ে এসে টার্মিনালে পৌঁছাতে পারেনি। মহাসড়কে যানজটের কারণে বিলম্ব হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সকাল ১১টার পর বাড়ির পথে রওয়ানা দেন নূর রহমান।
এবিষয়ে সংশ্লিষ্ট পরিবহনের কর্মীরা জানান, মহাসড়কে যানজটের কারণে ঢাকামুখী সবগুলো গাড়িরই গাবতলী পৌঁছাতে বিলম্ব হচ্ছে। এ কারণে কাউন্টারে জড়ো হওয়া যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। দুপুরের দিকে দুই দফা বৃষ্টির কারণে অপেক্ষমান যাত্রীদের বেশ দুর্ভোগের কবলে পড়তে হয়। এ সময় টার্মিনালমুখী যাত্রীদের অনেকেই বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে কাউন্টারে পৌঁছান।
এদিকে ট্রেন, বাস কিংবা লঞ্চে আসন কিংবা কেবিনে ভ্রমণের টিকেট না পেয়ে সামর্থ্যবানরা বাড়ি যাচ্ছেন বিকল্প ব্যবস্থায়। তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারের সদস্যরা মাইক্রোবাস কিংবা ট্যাক্সিক্যাব ভাড়া নিয়ে রওনা দিচ্ছেন বাড়ির পথে। আবার যাদের সামর্থ্য একটু কম, তারা কয়েকজন মিলে ভাড়া করে নিচ্ছেন মাইক্রোবাস। এছাড়া রাজধানীর অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী লোকাল বাস ভাড়া করেও যেতে দেখা গেছে অনেককে। স্বল্প আয়ের শ্রমজীবী মানুষরা যথারীতি বাসের ছাদে কিংবা ট্রাকে রাজধানী ছাড়ছেন।
অন্যদিকে ঈদের এই আনন্দ যাত্রায় গতকাল বিষাদ নেমে আসে দু’টি দুর্ঘটনায়। ঢাকা থেকে লালমনিরহাটগামী একতা এক্সপ্রেসের একজন যাত্রী সকাল ৮টার দিকে নাটোর এলাকায় পৌঁছে ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে মাথা বের করে দেয়ায় একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ঘটনাস্থলে মৃত্যুবরণ করেন। নিহত সিরাজুলের বাড়ি বগুড়ার সোনাতলা উপজেলায় বলে জানা গেছে। তিনি ঈদ করতে বাড়ি যাচ্ছিলেন। এছাড়া গতকাল দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী একটি ট্রেনের ছাদে আরোহণকারী জাকির হোসেন ও নুরু মিয়া নামের দুই যাত্রী গেন্ডারিয়া এলাকায় ট্রেন থেকে পড়ে গিয়ে মারা যান। তারা ঈদ করতে ঢাকা হয়ে বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশে রওয়ানা দিয়েছিলেন।
এ বিষয়ে রেলওয়ের মহাপরিচালক প্রকৌশলী আবু তাহের বলেন, ঈদের সময় যাত্রীদের ঘরে ফেরার দুর্নিবার ইচ্ছার কথা বিবেচনায় নিয়ে রেল কর্তৃপক্ষ দাঁড়ানো যাত্রী বহন করে থাকে। কিন্তু কোনোভাবেই ছাদে ভ্রমণকে উত্সাহিত করা হয় না।
এদিকে সদরঘাট নদীবন্দরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মঙ্গলবার রাতে এবং বুধবার সকাল থেকে সারাদিন যেসব লঞ্চ ছেড়ে গেছে তার অধিকাংশতেই ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা হয়েছে। এ ব্যাপারে বিআইডব্লিউটিএর তরফ থেকে নানা রকম সতর্কতা জারি করা হলেও কার্যক্ষেত্রে সেটার তেমন বাস্তবায়ন ছিল না। সদরঘাট থেকে ইন্তাজুল সিকদার নামের একজন যাত্রী টেলিফোনে ইত্তেফাক প্রতিনিধিকে বলেন, লঞ্চ মালিকরা ঘোষণা দিয়েছিল যে, ঈদ উপলক্ষে তারা ১৮ শতাংশ কম ভাড়ায় যাত্রী বহন করবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে যে, কম নেয়া দূরের কথা, উল্টো কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।