শাশুড়ির পরিকল্পনায় জামাতা বিএনপি নেতা রফিক খুন

শাশুড়ি লিপি আক্তারের পরিকল্পনাতেই ঢাকার ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম মজুমদারকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। রফিকের ব্যক্তিগত সম্পদ হাতিয়ে নেয়ার জন্যই এ পরিকল্পনা করা হয়। লিপির সঙ্গে রফিকের অনৈতিক সম্পর্কও এ খুনের অন্যতম কারণ। রফিককে অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় লিপি ছাড়াও রফিকের দ্বিতীয় স্ত্রী ঝরা (লিপির কন্যা), ঝরার বড় বোন স্নিগ্ধা, তার স্বামী সাইদ, র্যাবের সাবেক সদস্য কনস্টেবল ফজলুর রহমান, চরমপন্থী সংগঠন জাসদ গণবাহিনীর মোহাম্মদ আলী মহব্বত, স্থানীয় দোকানদার রানা, শিমুল, সোহেল রানা ও খেলাফত জড়িত। গত জানুয়ারি মাসে সংঘটিত এই চাঞ্চল্যকর হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) গতকাল বুধবার ভোরে ঢাকা ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে লিপি (৪৬), মহব্বত (৩৬), ফজলুর রহমান (৫৩), মিজানুর রহমান ওরফে মন্টুকে (৪১) গ্রেফতার করে। গতকাল সকালে র্যাব সদর দফতরে সাংবাদিকদের সামনে হাজির করা হয় গ্রেফতারকৃতদের। সাংবাদিকদের সামনে লিপি আক্তার জানিয়েছেন, রফিকই বিএনপির ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলমকে গুম করেছে। র্যাবের মিডিয়া অ্যান্ড লিগ্যাল শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার হাবিবুর রহমান বলেন, গত ৫ জানুয়ারি কুষ্টিয়ার কুমারখালীর মনোহরপুর গ্রামের খালের পাশ থেকে পুলিশের হ্যান্ডকাফ পরা অবস্থায় রফিকুল ইসলাম মজুমদারের লাশ উদ্ধারের পর ঘটনাটি র্যাব ও পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে তদন্ত হয়। অভিযোগ উঠে যে, র্যাব রাজনৈতিক কারণে রফিককে ঝিনাইদহের আনন্দনগরে শ্বশুরবাড়ি থেকে অপহরণ করে হত্যার পর বিষয়টি ভিন্নখাতে প্রবাহের জন্য হাতে পুলিশের হ্যান্ডকাফ পরিয়ে লাশ ফেলে দেয়। গুলিস্তানে মহানগর কমপ্লেক্সে ছিল রফিকের মূল ব্যবসা। এর আগে এই মার্কেটের মালিকানা ও দখল নিয়েও রফিকের সঙ্গে প্রতিপক্ষ গ্রুপের দ্বন্দ্ব রয়েছে। মার্কেটের দখল নিয়ে রফিক গ্রুপের হাতে প্রতিপক্ষ গ্রুপের ওয়াজিউল্ল্যাহ নামে এক ব্যবসায়ী গুম হয়। ওয়ান-ইলেভেনের সময় রফিক ৫টি আগ্নেয়াস্ত্রসহ গ্রেফতার হয়ে জেলে যায়। এরপরই তার প্রথম স্ত্রী রুজিনা ইসলামের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে। রুজিনা কানাডা প্রবাসী হলেও রফিক তার প্রথম স্ত্রীর চার সন্তানের ভরণপোষণ গ্রহণ করেন। ২০১০ সালে রফিক ঝিনাইদহের আয়শা সিদ্দিকা ঝরাকে বিয়ে করেন। ঝরার মা লিপির ঝিনাইদহের চরমপন্থী সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। এর আগে ঝরা ঝিনাইদহে চরমপন্থী সংগঠন বিশেষ করে জাসদ গণবাহিনীর মহিলা দলের হয়ে কাজ করতেন। বিয়ের পর রফিক প্রায় অর্ধকোটি টাকা খরচ করে ঝিনাইদহের আনন্দনগরে শ্বশুরবাড়িতে পাকা ঘর নির্মাণ করে দেন। ঢাকা থেকে মাঝে-মধ্যেই রফিক আনন্দনগরে শ্বশুরবাড়িতে রাত কাটাতেন। র্যাব আরো জানায়, ঝরাকে বিয়ে করার পর রফিকের লোলুপ দৃষ্টি পড়ে শাশুড়ি লিপির ওপর। একপর্যায়ে রফিক তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে লিপিকে বাধ্য করেন। একইভাবে তিনি ঝরার বোন স্নিগ্ধাকেও তার সাথে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে বাধ্য করেন। লিপির পৃথকভাবে থাকার জন্য কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ঝিনাইদহ শৈলকুপা থানার আনন্দনগর গ্রামে ছয় লাখ টাকা ব্যয়ে চার কাঠা জায়গার উপর তার স্ত্রী ঝরার নামে একটি বাড়ি কিনে দেন। এ সময় রফিক নিজের বিভিন্ন অনৈতিক ও অবৈধ কাজের জন্য লিপির আপন ভাই চরমপন্থী দলের সদস্য মশিউর রহমান ওরফে মধুকে নিয়োজিত করে। র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে লিপি জানায়, ২০১০ সালের ২৫ জুন ঢাকা থেকে চৌধুরী আলম গুম হওয়ার সময় রফিক ঝিনাইদহে তার বাসায় ছিলেন। ওইদিন রফিক প্রচুর মদ্যপান করেন এবং লিপিকে বলেন, ‘চৌধুরী আলম, তোকেও শেষ করে দিলাম’। ২০১১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি মধু র্যাবের সাথে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেলে লিপি এ ঘটনার জন্য রফিককে দায়ী করেন। পরবর্তী সময়ে লিপি দুই লাখ টাকার বিনিময়ে রফিককে হত্যার জন্য প্রস্তাব দিলে রাজি হন মধুর বন্ধু মোহাম্মদ আলী মহব্বত। এর পরিপ্রেক্ষিতে লিপি তার ঝিনাইদহের বাসায় রফিকের আসার খবর মহাব্বতকে জানান। পুলিশের হ্যান্ডকাফ জোগাড় ও হত্যাকাণ্ডে অংশ নিতে মহব্বত র্যাবের সাবেক সদস্য কনস্টেবল ফজলুর রহমানকে ২০ হাজার টাকা দেন। ফজলুর রহমান ২০০৭ সালে র্যাব-৩ এ থাকা অবস্থায় অনৈতিক কার্যকলাপের দায়ে চাকরিচ্যুত হন। গত ৫ জানুয়ারি মহব্বতের কথামত ফজলু তার কাছে থাকা হ্যান্ডক্যাফ নিয়ে কিলিং মিশনের অন্য সদস্যদের সাথে রফিকের শ্বশুরবাড়িতে মাইক্রোবাসে করে যান। সেখানে তারা র্যাব পরিচয় দিয়ে রফিককে উঠিয়ে নিয়ে যান। মাইক্রোবাসে নিয়ে রফিকের হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দেন। পরে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর লাশ কুষ্টিয়ার আদাবাড়িয়া গ্রামের মাঠে ফেলে রাখা হয়।