নেত্রকোনায় বিএনপির তত্পরতা শুরু, আওয়ামী লীগের খবর নেই
শ্যামলেন্দু পাল, নেত্রকোনা প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০১৩, ২৩:১৪
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে জেলার ৫টি সংসদীয় আসনের প্রত্যন্ত এলাকায় চায়ের দোকানে, হাটে-বাজারে চলছে তর্ক-আলোচনা। কোন সংসদ সদস্য সফল, কে ব্যর্থ এগুলো নিয়ে ভোটাররা চায়ের কাপে ঝড় তুলছেন। তবে নেত্রকোনায় ১৪ দলীয় জোট বা ১৮ দলীয় জোট বলে কিছু নেই। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিই এখানে সব। নামকাওয়াস্তে দলগুলোর নাম জানে না ভোটাররা। বিএনপি নেতারা নেত্রকোনার সবক’টি আসনে জয়লাভের জন্য ব্যাপক সাংগঠনিক তত্পরতা শুরু করেছেন। যার ধারে-কাছেও নেই আওয়ামী লীগ। বর্তমানে নেত্রকোনার সবক’টি আসনই আওয়ামী লীগের দখলে। তবে আগামী নির্বাচনেও জয় অক্ষুণ্ন রাখতে চায় আওয়ামী লীগ।
গত ৫ বছরে মহাজোট বা ১৮ দলীয় জোটের তেমন সভা হয়নি, নেই জোটে সমন্বয়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সম্ভাব্য নতুন প্রার্থীরা নতুন নতুন কৌশলে চালাচ্ছেন নির্বাচনী প্রচারণা। নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা)
বর্তমান এমপি আওয়ামী লীগের তরুণ নেতা মোশতাক আহমেদ রুহী। এই আসনে তার বড় অবদান হচ্ছে দূর্গাপুর সড়ক সংস্কার এবং বহুল আলোচিত শুকনাকুড়ি সেতু নির্মাণের কাজ শত বাধার মুখেও শেষ করা। সীমান্ত এলাকার হাজার হাজার মানুষেল যাতায়াতের পথ সুগম হয়েছে শুকনাকুড়ি সেতু নির্মাণে। তাই এবারও তিনি এই আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী। এই আসনে আওয়ামী লীগের অন্য সম্ভাব্য প্রার্থীরা হচ্ছেন, আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি মরহুম জালাল তালুকদারের ছেলে কুতুব উদ্দিন তালুকদার রয়েল, কৃষকলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ছবি বিশ্বাস, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এমদাদুল হক খান, কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা এরশাদুর রহমান মিন্টু, আওয়ামী লীগ নেতা এসএম ফখরুল ইসলাম ফিরোজ। এই আসনে সিপিবি থেকে এবার নির্বাচন করবেন সিপিবির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কমরেড মনিসিংহের ছেলে ডা. দিবালোক সিংহ।
অপরদিকে, ১৮ দলীয় জোট হতে মনোনয়ন প্রত্যাশী নতুন পুরনো অনেক নেতা। বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে গেছে জেলা, উপজেলা শহর। পোস্টারিং আর বিলবোর্ডের রীতিমত প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এই আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেতে চেষ্টা করছেন সাবেক এমপি বিএনপি নেতা এবং কলমাকান্দা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান গোলাম রব্বানী। এই আসনে আর একজন সম্ভাব্য প্রার্থী হচ্ছেন নেত্রকোনা জেলা ছাত্রদলের দুই দুইবারের সভাপতি এবং বর্তমানে জেলা বিএনপির সদস্য জাহাঙ্গীর আলম মাসুদ। আরেক শক্তিশালী প্রার্থী হচ্ছেন দুর্গাপুর উপজেলা বিএনপি নেতা সেলিম রেজা খান। বয়সে তরুণ এই প্রার্থী তার এলাকায় সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া এই আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেতে তত্পর বিএনপির চেয়ারপারসনের আইনজীবী প্যানেলের সদস্য কলমাকান্দার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তিনিও কম বেশি সভা সমাবেশ করছেন। এই আসনে বিএনপির অপর প্রার্থীরা হচ্ছেন দুর্গাপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, এডভোকেট হামিদুর রহমান রাশেদ এবং এডভোকেট আব্দুল ওয়াহাব।
নেত্রকোনা-২ (নেত্রকোনা-বারহাট্টা)
এই আসনটি নেত্রকোনার ৫টি আসনের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি জেলা শহরের আসন। আর এখান থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয় জেলার রাজনীতি। নেত্রকোনা- ২ আসনে বর্তমান এমপি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আশরাফ আলী খান খসরু। এই আসনটি ধরে রাখার জন্য আওয়ামী লীগ জোর চেষ্টা চালাবে। এই আসনে আওয়ামী লীগ প্রচুর উন্নয়নমূলক কাজ করেছে। বিশেষ করে বড় বড় সেতু এবং কালর্ভাট নির্মাণ হয়েছে বেশ কয়েকটি। দুইশ কোটি টাকা ব্যয়ে রেলকে আধুনিক করা হয়েছে এবং আন্তঃনগর ট্রেন সার্ভিস চালু করা হয়েছে সম্প্রতি। এই আসনে মনোনয়ন চাইবেন বর্তমান এমপি মতিয়র রহমান খান, সাবেক পৌর মেয়র নজরুল ইসলাম খান, জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য লে. কর্নেল (অব.) নূর খান। তরুণদের মধ্যে মনোনয়ন চাইবেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সহ-সভাপতি আরিফ খান জয় এবং নেত্রকোনা সরকারি কলেজের সাবেক ভিপি শামসুল হক লিটন। জাসদ (ইনু) কেন্দ্রীয় নেতা মুখলেছুর রহমান খান মুক্তাদিরও ১৪ দল থেকে মনোনয়ন চাইবেন। মনোনয়ন পেতে প্রার্থীর সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
জাতীয় পার্টি (এরশাদ) থেকে ব্যবসায়ী নেতা ফকির আশরাফ মনোনয়ন চাইবেন। তিনি দল থেকে মনোনয়ন না পেলে আলাদাভাবে নির্বাচন করবেন। সিপিবি থেকে জেলা সিপিবির সম্পাদক খন্দকার আনিসুর রহমান প্রার্থী হবেন। জাতীয় পার্টি (জেপি) থেকে নির্বাচন করবেন জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি আইয়ুব আলী ফনু।
বিএনপিতে দলীয়ভাবে না হলেও ব্যক্তিগত পর্যায়ে অনেকেই নির্বাচনী তত্পরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে বিএনপির জেলা কমিটি গঠনের পর থেকেই গ্রুপিং দৃশ্যমান হয়। এই আসনে এবার বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক এমপি মুক্তিযোদ্ধা আশরাফ উদ্দিন খান, ঢাকা বারের সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট খোরশেদ আলম মিয়া, ড. আরিফা জেসমিন, বিএনপি নেতা ও সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান খান, বিশিষ্ট চিকিত্সক ডা. আনোয়ারুল হক, জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি বিশিষ্ট চিকিত্সক দেলোয়ার হোসেন টিটু, বিএনপি নেতা আলহাজ্ব শওকত হোসেন তালুকদার, জেলা বিএনপির সাবেক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহফুজুর রহমান, বিএনপি নেতা মোস্তাফিজুর রহমান খান, কেন্দ্রীয় নেতা আব্দুল বারি ড্যানী। জেলা বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সমাজ সেবক মুজিবুল হক মামুন।
নেত্রকোনা-৩ আসন (কেন্দুয়া-আটপাড়া)
এই আসনে বর্তমান এমপি আওয়ামী লীগের মঞ্জুর কাদের কোরাইশী। এই আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা হচ্ছেন মঞ্জুর কাদের কোরাইশী এমপি, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা অসীম কুমার উকিল, যুব মহিলা লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক অধ্যাপক অপু উকিল এমপি, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন, কেন্দুয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইফতেখার উদ্দিন পিন্টু, জেলা যুবলীগ নেতা ও শিল্পপতি আলহাজ্ব মনিরুজ্জামান ভুঁইয়া শামীম।
বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা ড. রফিকুল ইসলাম হিলালী। এই আসন থেকে বিএনপির অন্যান্য প্রার্থীরা হচ্ছেন সুলতানা রাজিয়া শাওন, সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হায়দার জাহান চৌধুরী, হায়দার আহমেদ খান মন্টু এফসিএ, সাবেক পৌর মেয়র দেলোয়ার হোসেন ভুঁইয়া দুলাল, যুবদল নেতা রায়হান আহমেদ রনি।
নেত্রকোনা-৪ (মদন মোহনগঞ্জ খালিয়াজুরী)
হাওর এলাকা হিসাবে পরিচিত এই আসনে বর্তমান এমপি আওয়ামী লীগের রেবেকা মমিন। এই আসন থেকে মনোনয়ন চাইবেন শফি আহমেদ, বিশিষ্ট আইটি বিশেষজ্ঞ মোস্তফা জব্বার, সমাজ সেবক ক্যাপ্টেন (অব.) মঞ্জুরুল হক মঞ্জু এবং মোহনগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শহীদ ইকবাল। এই আসনে চারদলীয় জোটের এমপি ছিলেন লুত্ফুজ্জামন বাবর। তিনি এখন কাশিমপুর কারাগারে। যদি তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন তবে তার স্ত্রী শ্রাবণী জামান বিএনপি থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন বলে নির্বাচনী গুজব রয়েছে।
নেত্রকোনা-৫ (পূর্বধলা)
নেত্রকোনার ৫টি আসনের মধ্যে ৪টি আসন একাধিক উপজেলা নিয়ে গঠিত হলেও এই আসনটি এবার থেকে মাত্র একটি উপজেলা নিয়ে গঠিত। এর আগে নেত্রকোনা সদরের মৌগাতি ইউনিয়নকে এই আসনের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছিল। এবার তা বাদ দেয়া হয়েছে। আর এ কারণেই প্রার্থীদের নির্বাচনী তত্পরতা চালাতে সুবিধা বেশি হবে। এই আসনের বর্তমান এমপি হচ্ছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল বীর প্রতিক। তিনি ইতিমধ্যে তার সকল ইউনিয়ন কমিটিগুলো তৃণমূল ভোটারের মাধ্যমে গঠন করে ফেলেছেন। এই এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। এই আসনেও তিনি এবারো মনোনয়ন প্রার্থী। এছাড়া এই আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সম্ভাব্য প্রার্থীরা হচ্ছেন আওয়ামী লীগ কেদ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন। এই আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা হচ্ছেন জেলা বিএনপির সম্পাদক আবু তাহের তালুকদার, উপজেলা বিএনপির সভাপতি ছাইদুর রহমান তালুকদার, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহ-সভাপতি এএসএম শহীদুল্লাহ ইমরান, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সদস্য ড. আব্দুল জলিল প্রমুখ।