তাইন্দংয়ের ঘরে ঘরে অভাব
রফিকুল বাসার ও তরুণ ভট্টাচার্য্য
প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০১৩, ২২:৩৯
খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার বিধ্বস্ত পরিবারগুলোর ঘরে ঘরে এখন অভাব আর অভাব। সেখানে পর্যাপ্ত ত্রাণ প্রয়োজন। প্রয়োজন রান্না করার সামগ্রী। এক প্রকার অভুক্তই দিন কাটাচ্ছেন সেখানের মানুষ। কিছু সাহায্য যদিও সরকারিভাবে দেয়া হয়েছে, তা পর্যাপ্ত নয়।
এদিকে তিন আগষ্ট তাইন্দং সহিংসতার পর মামলা ও গ্রেফতার ভয়ে কয়েকটি বাঙালি গ্রামে পুরুষ নেই বললেই চলে। ইতিমধ্যে ১৮০ জনের নামে মামলা দেয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাসহ ১১ জনকে আটক করেছে পুলিশ। খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার শেখ মোহাম্মদ মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, তাইন্দং ঘটনার পর দায়ের করা মামলার অন্য আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, হামলার পর গ্রামবাসী তাদের নিজ নিজ এলাকায় ফিরে এসে দেখেন অবশিষ্ট বলতে কিছুই নেই। গ্রামবাসীরা বলেন, গ্রামে ফিরে ঘরে ঠাইঁ পেলেও ফেলে যাওয়া কোন মালামাল পাওয়া যায়নি। সবকিছু লুট হয়ে গেছে। গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগী - এমনকি ঘর থেকে সৌর প্যানেল, টেলিভিশন ও রান্নার বাসন পর্যন্ত লুট করে নিয়ে গেছে হামলাকারীরা। এখানে যুগ যুগ ধরে বসবাসরত উপজাতীয়রা অতিকষ্টে জীবন ও জীবিকা চালিয়ে আসছিলো। জুম চাষ ও বনজ দ্রব্য বিক্রি করেই চলে এখানকার অধিকাংশ মানুষের জীবন। অথচ এক ঘন্টার সহিংসতায় সবকিছুই ধ্বংস হয়ে গেছে। নিঃস্ব হয়ে পড়েছে কয়েকশ’ পরিবার। তাইন্দং ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ও এলাকার ত্রিপুরা সমপ্রদায়ের নেতা সুকুমার ত্রিপুরা ইত্তেফাককে বলেন, আমাদের ঘর-বাড়িতে অবশিষ্ট আর কিছুই নেই। প্রাণ বাঁচাতেই ্পালিয়ে গিয়েছিলাম। আশা ছিলো সহসাই ফিরে আসবো, সবকিছুই ঠিকঠাক থাকবে। কিন্তু কিছুই ঠিক নেই।
গত তিন আগষ্ট তাইন্দং সহিংসতার শিকার তাইন্দং হেডম্যানপাড়া ও বাত্তি টিলার ১৬৫ উপজাতীয় পরিবার ভারতীয় সীমান্তে না গিয়ে মাটিরাঙ্গার পার্শ্ববর্তী পানছড়ি উপজেলার প্রফুল্ল কার্বারীপাড়া, নবরত্ন কার্বারীপাড়া ও রবীন্দ জয় কার্বারীপাড়ায় আশ্রয় নিয়েছিল। তিনদিন পর গত মঙ্গলবার সন্দ্ধ্যায় মাটিরাঙ্গা ও পানছড়ির উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় নিজ নিজ গ্রামের বাড়ী-ঘরে ফিরে এসেছেন তারা।
তাইন্দং ইউনিয়নের মহিলা জনপ্রতিনিধি রেশনা চাকমা বলেছেন, সহিংসতায় লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়া তাইন্দং-এর বগাপাড়া, বান্দরশিংপাড়া, মনুদাশপাড়াসহ বেশ কয়েকটি চাকমা অধ্যুষিত পাড়ার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুই বেলা আহার জুটছে না। আগুনে যাদের ঘর পুড়ে গেছে তারা ঘরের কাজে হাত দিতে পারেননি। হামলার সময় লুট হয়ে যাওয়া গরু, ছাগল, মহিষ হাঁস-মুরগী কিছুই ফেরত পায়নি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো। তাইন্দং উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী রঞ্জিতা চাকমা (১৪)। মা-বাবা নেই। জেঠার বাড়ির কাছে ছোট্ট একটি ঘরে বাস করতো। ঘটনার দিন হামলাকারীরা তার ঘরসহ জেঠার ঘরও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। তাইন্দং ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের মেম্বার বিরঙ্গলাল ত্রিপুরা জানান, আক্রান্ত গ্রামগুলোর আগুনে পুড়ে যাওয়া ঘরগুলোর আবর্জনা-ছাই যেভাবে ছিলো সেভাবেই আছে। পোড়া ভিটায় নতুন করে ঘর তুলবে এমন সাহস ও সামর্থ্য এখন তাদের নেই।
শিশু আশামনির মৃত্যু: এদিকে সহিংসতার সময় দুই মাস বয়সী কোলের শিশু আশামনি চাকমাকে নিয়ে পিতা সুকুমনি চাকমা ও মাতা আলো রানী চাকমা আশ্রয় নিয়েছিলেন গহীন জঙ্গলে। সেখানে খোলা আকাশের নীচে রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে অসুস্থ হয়ে পড়ে কোলের শিশু আশামনি। স্থানীয়দের সহায়তায় আট আগস্ট তাকে তাইন্দং থেকে খাগড়াছড়ি জেলা সদরে এনে ভর্তি করানো হয় জেলা সদর হাসপাতালে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো যায়নি। ১০ আগস্ট ছোট্ট শিশুটি মারা যায়।
ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ত্রাণ: জেলা প্রশাসক মো. মাসুদ করিম সাংবাদিকদের জানান, তাইন্দং ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। তাছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে তাত্ক্ষণিকভাবে কিছু ত্রাণও দেয়া হয়েছে। তাইন্দং ইউপি চেয়ারম্যান মো. তাজুল ইসলাম জানান, এলাকার জীবন-যাত্রা এখন স্বাভাবিক হয়ে আসছে। পাহাড়ী ও বাঙালিদের পাড়া-গ্রামে সেনাবাহিনী ও বিজিবি’র টহল জোরদার করা হয়েছে।