হাইকোর্টে আদিলের রিমান্ড স্থগিত
প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০১৩, ২২:৪২
বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন অধিকার’র সম্পাদক আদিলুর রহমান খান শুভ্রের রিমান্ড মঞ্জুর করে নিম্ন আদালতের দেয়া আদেশ স্থগিত করেছে হাইকোর্ট। কোন বিলম্ব ছাড়া তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সাধারণ ডায়েরীর প্রেক্ষিতে তাকে পুনরায় রিমান্ড না দেয়ারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তবে তদন্ত কর্মকর্তা চাইলে তাকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন। এদিকে আদিলের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছেন বিশিষ্টজনরা। গতকাল সোমবার সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনের সামনে এক মানববন্ধন থেকে এই দাবি জানানো হয়।
বিচারিক আদালতের দেয়া রিমান্ড আদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা এক আবেদনের প্রেক্ষিতে বিচারপতি বোরহান উদ্দিন ও বিচারপতি কাশিফা হোসেনের হাইকোর্টের অবকাশকালীন বেঞ্চ রিমান্ড স্থগিতের আদেশ দেন। একইসঙ্গে রিমান্ড মঞ্জুরের আদেশ কেন বাতিল করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুলও জারি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দুই সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। আদিলের পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ জে মোহাম্মদ আলী। তাকে সহায়তা করেন এডভোকেট সালেহউদ্দিন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম কে রহমান। সঙ্গে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একরামুল হক।শুনানিতে এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, হাইকোর্টের রায় রয়েছে ৫৪ ধারায় কাউকে রিমান্ডে নেয়া যাবে না। কাউকে টানা তিন দিনের বেশি রিমান্ডে দেয়া যাবে না। রিমান্ডে নিলে কিভাবে নিতে হবে সে ব্যাপারেও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু নিম্ন আদালত আদিলুর রহমান খানের রিমান্ড মঞ্জুরের ক্ষেত্রে এসব আদেশ উপেক্ষা করেছেন। শুনানি শেষে হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের আদেশ স্থগিত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে রুল জারি করে।
শুনানিতে এম কে রহমান বলেন, শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের অবস্থানের ঘটনায় আদিলুর রহমানের সংগঠন অধিকার বলেছে ৬১ জন মারা গেছে। এরপর মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়েছে কিন্তু তিনি দেননি। উল্টো মন্ত্রণালয়ের চিঠির জবাবে বলেছে তদন্ত কমিটি করার জন্য। এরপর তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আর রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত।
গত রবিবার আদিলুরের ৫ দিনের রিমান্ড ও বাসা-অফিস তল্লাশির আবেদন মঞ্জুর করেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিষ্ট্রেট অমিত কুমার দে। প্রসঙ্গত, শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ উত্তরের সাইবার ক্রাইম টিম তথ্য প্রয?ুক্তি আইন (আইসিটি অ্যাক্ট) লঙ্ঘনের অভিযোগে (অভিযোগটি নন এফআইআর) আদিলুর রহমান খানকে গ্রেফতার করে। পরে তাকে নেয়া হয় ডিবি হেফাজতে। গোয়েন্দা পুলিশ বলেছে, আদিলুর রহমান তার ই-মেইল ও ফেসবুক আইডি ব্যবহার করে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। যে কারণে বেশ কিছুদিন ধরে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার ক্রাইম টিম তাকে নজরদারিতে রাখছিলো।
মুক্তি দাবিতে মানববন্ধন
আদিলুর রহমান খানের নিঃর্শত মুক্তি দাবি করেছেন বিশিষ্টজনরা। গতকাল দুপুরে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনের সামনে এক মানববন্ধন থেকে এই দাবি জানানো হয়। মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক বোরহান উদ্দীন, আসিফ নজরুল, আন্তর্জাতিক সর্ম্পক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মহসিন, সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্না, মানবাধিকার সংস্থা ব্লাস্টের প্রতিনিধি রেজাউল করিম, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিচালক নূর খান প্রমুখ।
মানববন্ধনে অংশ নিয়ে ড. শাহদীন মালিক বলেন, আদিলুর রহমানের বিরুদ্ধে আনা আভিযোগ প্রত্যাহার করে অবিলম্বে তাকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে। এছাড়া অধিকারের কার্যালয় থেকে যেসব জিনিস জব্দ করা হয়েছিল সেগুলো ফেরত দিতে হবে। এ সময় তিনি আদিলুর রহমানকে অবিলম্বে মুক্তি দাবি করেন। আসিফ নজরুল বলেন, আদিলুর রহমানকে গ্রেফতার করে তথ্য-প্রযুক্তি আইনকে কালো আইনে পরিণত করেছে সরকার।
এছাড়া সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি আদিলুর রহমান খানকে গ্রেফতারের নিন্দা ও অবিলম্বে মুক্তি দাবি জানিয়ে একটি সাংবাদিক সম্মেলন করেছে। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেন, দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি কত চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে তা মানবাধিকার সংগঠক আদিলুর রহমান খানকে গ্রেফতারের মাধ্যমে সরকারের নগ্ন-চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ হয়েছে। তার গ্রেফতার সংবিধানের মৌলিক অধিকার, মুক্ত চিন্তা, বাকস্বাধীনতা ও মানবাধিকারের পরিপন্থি।
আদিলুর রহমানকে দ্রুত মুক্তি দিতে হবে অন্যথায় সারা দেশের আইনজীবীদের নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে বলে হুঁশিয়ারী দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন। তিনি বলেন, মতিঝিলে হেফাজত ইসলামের সমাবেশে কত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান কেউ দিতে পারেনি। একজন আইনজীবী হয়েও যদি তিনি নিরাপদ থাকতে না পারেন, তাহলে সাধারণ মানুষের কি অবস্থা হতে পারে তা সহজে অনুমেয়। এ সময় আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদলসহ আইনজীবী সমিতির অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
রিমান্ডে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন সহকারী কমিশনারের রুমে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের সম্পাদক আদিলুর রহমান খান শুভ্রকে। গত রবিবার পাঁচদিনের রিমান্ডে নেয়ার পর থেকেই তদন্ত কর্মকর্তার টেবিলের সামনে রাখা একটি প্লাস্টিকের চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয় সাবেক এই ডেপুটি এটর্নি জেনারেলকে। তার মুখোমুখি বসে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে, শাপলা চত্বরে নিহতদের পরিচয়। অধিকার এর প্রতিবেদনে প্রকাশিত নিহত ও নিখোঁজ হেফাজত কর্মীদের তালিকা সরবরাহের জন্য নানা কৌশলে চাপ প্রয়োগ করা হয়।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের সেক্রেটারি শুভ্র নানা আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে শাপলা চত্বরে নিহতদের পরিচয় গোয়েন্দা পুলিশের কাছে সরবরাহে রাজি হননি। বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন ছাড়া শাপলা চত্বরে অভিযান পরিচালনাকারী সংস্থার কাছে স্পর্শকাতর বিষয়ে মুখ খুলতে নারাজ তিনি।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ওবায়েদুল হক বলেন, সরকার চাইলে আইনগতভাবে সব তথ্য দিতে বাধ্য তিনি। অথচ মানবাধিকারের বিভিন্ন আইনগত বিষয় উল্লেখ করে তিনি তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। আদালতের রিমান্ড স্থগিত বিষয়ে তিনি বলেন, সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত আদালতের আদেশনামা হাতে না আসায় আজ সকাল পর্যন্ত আদিলুর রহমানকে ডিবি হেফাজতেই থাকতে হচ্ছে।