আটজনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট মূল পরিকল্পনাকারীই বাদ

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থানার আলোচিত ফোর মার্ডারের ঘটনায় আটজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ। তবে হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারীর নাম উল্লেখ করা হয়নি চার্জশিটে। হত্যাকাণ্ডের মোটিভও রয়ে গেছে অন্ধকারে। অভিযোগ উঠেছে মূল পরিকল্পনাকারীকে রক্ষা করতেই পুলিশ তড়িঘড়ি করে চার্জশিট দিয়েছে। এদিকে হত্যা মামলার অন্যতম আসামি মিঠু ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে বলে তার পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের অন্যতম পরিকল্পনাকারী শাহাদাত হোসেন ইতিমধ্যে জামিনে বের হয়েছেন। এই হত্যাকাণ্ডের পর এই মামলার আরেক আসামি পুলিশী নির্যাতনে মারা গেছে। আরেক খুনি সোহাগ ওরফে সোহেল কোন জবানবন্দি দেয়নি। এই বিষয়গুলো মেলাতে পারছে না এলাকাবাসী ও নিহতদের স্বজনেরা। তারা বলছেন, মূল পরিকল্পনাকারীই নিজেকে বাঁচাতে আসামিদের সরিয়ে দিচ্ছেন। এলাকাবাসী বলছেন, আলোচিত ফোর মার্ডারের মূল পরিকল্পনাকারী পর্দার পেছনে থেকে কিলার মিঠু ও শামীম রেজাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। বিপুল অর্থ খরচ করে তিনি চারজনকে খুন করিয়েছেন এবং পরে মিশনে অংশগ্রহণকারীদের সরিয়ে দিয়েছেন। নিহতের পরিবারের সদস্যরা মামলার তদন্তভার যাদের উপর ন্যস্ত ছিল সেই ডিবির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, আলোচিত ওই ফোর মার্ডারের ঘটনাটি অনুসন্ধান করে দেখা হবে তদন্তে কোন ধরনের ত্রুটি হয়েছে কিনা। গত ১৯ এপ্রিল গভীর রাতে সোনারগাঁও উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের ঝাউচরের তিনতলা ভবনের দ্বিতীয় তলার বাসায় চারজনকে জবাই করে হত্যা করা হয়। নিহতরা হলেন, চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী শামীমা ইসলাম সুমা, শ্যালক রানা, দুই গৃহকর্মী মনি ও রেখা। এ ঘটনায় সুমার ভাই মামুন বাদী হয়ে সোনারগাঁও থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।এই হত্যাকাণ্ডে গ্রেফতার পাঁচজন ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা হলেন আশরাফ, শামীম রেজা, মো. রাজীব, আবদুস সাত্তার ও আবুল বাদশা। গ্রেফতার পাঁচজনই জবানবন্দিতে বলেন, চেয়ারম্যান রফিকের প্রথম স্ত্রীর সন্তান শাহাদাতের পরিকল্পনায় ভাড়াটে কিলার মিঠু ও সোহাগ ৪ জনকে জবাই করে হত্যা করেছে। হত্যাকাণ্ডের পর ২৫ লাখ টাকা লুটের নাটক সাজানো হয়। মিঠুকে আগে থেকেই চিনত শাহাদাত। শাহাদাত মিঠুকে চারজনকে হত্যার দায়িত্ব দেয়। তবে শাহাদাত ভিন্ন কথা বলে শামীম রেজাকে। বলে শামীমা ইসলাম সুমার কাছে ২৫ লাখ টাকা ও স্বর্ণালংকার রয়েছে সেগুলো লুট করতে হবে। পরে মিঠু যাত্রাবাড়ীর আরেক কিলার সোহাগকে ভাড়া করে। শামীম রেজাসহ অন্যরা পরে জানতে পারে হত্যার পরিকল্পনার কথা। মিঠু নিহত হওয়ার পর তার বাবা রাজধানীর দারুসসালাম থানায় জিডি করেছেন। ফোর মার্ডারের কয়েক দিন পর মিঠু গাবতলী থেকে যশোর যাওয়ার পথে র্যাব পরিচয়ে তাকে কে বা কারা বাস থেকে নামিয়ে নিয়ে যায়। এরপর আর তার সন্ধান মেলেনি। নারায়ণগঞ্জ পুলিশ বিভিন্ন সূত্রে নিশ্চিত হয়েছে মিঠু নিহত হয়েছে। শামীম রেজার পুলিশী নির্যাতনে মৃত্যু হয়। পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের নামে শামীমকে হত্যা করা হয়েছে বলে তার পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। পুলিশ শাহাদাতের বন্ধু শামীম রেজাকে ১৪ মে গ্রেফতার করে। সোনারগাঁও থানার ওসি (তদন্ত) অরূপ তরফদার, এসআই পল্টু ঘোষ ও সার্কেলের এএসপি উত্তম প্রসাদ পাঠক শামীমকে ৫ দিনের রিমাণ্ডে নিয়ে শারীরিক নির্যাতন চালান। নির্যাতন থেকে শামীমকে রক্ষা করতে সাত লাখ টাকা দাবি করে অরূপ তরফদার ও এসআই পল্টু ঘোষ। শামীমের পরিবার পুরো টাকা জোগাড় করতে পারেনি। আড়াই লাখ টাকা জোগাড় করে তারা ওই তিন কর্মকর্তার হাতে তুলে দেন। তারপরও শামীমকে রক্ষা করতে পারেনি। অরূপ তরফদারের বাসার ছাদে রেখে শামীমকে নির্যাতন চালানো হয়। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শামীম মারা যায়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের চিকিত্সক ময়না তদন্তের রিপোর্টে শামীমকে হত্যা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। পুলিশের তদন্তেও শামীমকে নির্যাতনের ঘটনা প্রমাণিত হয়েছে। পরে তিন অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের হয়নি বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানান হয়। এদিকে ২৭ মে শাহবাগ থানার কনস্টেবল রমজান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগ থেকে শামীমের ময়না তদন্ত রিপোর্ট গ্রহণ করেন। অথচ নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার কার্যালয় গতকাল সোমবার পর্যন্ত সেই ময়না তদন্তের রিপোর্ট পায়নি বলে জানিয়েছে। শামীম হত্যাকাণ্ডের কারণ ও উদ্দেশ্য সবই জানত। জবানবন্দিতে সে এগুলো উল্লেখ করেছে। ২০০৯ সালে চেয়ারম্যান রফিক হজ্বে যাওয়ার আগে তার দ্বিতীয় স্ত্রী শামীমা ইসলাম সুমাকে ঝাউচরের তিনতলা বাড়িটি তার নামে লিখে দেয়ার জন্য চাপ দেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। তবে চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম গতকাল ইত্তেফাককে জানান, তার দ্বিতীয় স্ত্রী সুমার সঙ্গে তার কোন বিরোধ ছিল না। তার ছেলের সঙ্গেও বিরোধ ছিল না। এসব সাজানো ঘটনা। গ্রেফতারকৃত রাজীবই হত্যাকাণ্ডের প্রধান হোতা। এলাকাবাসীর অভিযোগ শাহাদাতের পক্ষে এই ফোর মার্ডারের পরিকল্পনা একা করা সম্ভব নয়। তার পিছনে রয়েছে আরেকজন, যিনি এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী। একই দাবি করেছে পুলিশ হেফাজতে নিহত শামীমের পরিবার। অভিযোগ উঠেছে, ডিবি পুলিশ তড়িঘড়ি করে চার্জশিট দাখিল করেছে। যাতে মূল পরিকল্পনাকারীকে রক্ষা করা যায়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নারায়ণগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের পরিদর্শক (তদন্ত) সাইদুর রহমান এ চার্জশিট প্রদান করে। এতে ৫০ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। চার্জশিটে দুই জনকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। তারা হলেন নিহত শামীম রেজা ও পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের ছোট ভাই হাবিবুর রহমান। অভিযুক্ত ৮ জন হলো - চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের ছেলে শাহাদাত হোসেন, নিহত শামীমা বেগমের খালাতো ভাই রাজীব, সোহেল ওরফে সোহাগ ও আশরাফ, বাড়ির নিরাপত্তা কর্মী আবদুস সাত্তার, গাড়ি চালক আবুল বাদশা, নাছিরউদ্দিন মিঠু (পলাতক) ও অয়ন কিবরিয়া (পলাতক)। পুলিশ সুপার (নারায়ণগঞ্জ) সৈয়দ নূরুল ইসলাম বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সমস্ত সাক্ষী প্রমাণ আমলে নিয়ে তদন্ত করে চার্জশিট দেয়া হয়েছে। জড়িতদেরও জবানবন্দি নেয়া হয়েছে। সোহাগ ওরফে সোহেলকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করা হলেও তিনি স্বীকারোক্তি দেয়নি। চার্জশিট প্রদানে কোন ধরনের তড়িঘড়ি করা হয়নি বলে তিনি জানান।