কমলা চাষির মুখে হাসি ফুটেছে
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০১৩, ১৯:৫৪
ভারতের কমলার সংগে পাল্লা দিয়ে মৌলভীবাজার জেলার চাহিদা মিটিয়ে ২০০৪ সাল থেকে মৌলভীবাজারের কমলা রপ্তানি করা হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। কমলা চাষিরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে মাঝে মাঝে কমলা ফলন কম হলেও চাষিরা আগাম কমলা বাজারজাত করে তাদের চাহিদা মিটিয়ে নিতে সক্ষম হচ্ছেন ।
মৌলভীবাজারের কমলার অতীত ইতিহাস অত্যন্ত মর্মান্তিক। প্রাক স্বাধীনতা কাল থেকে মৌলভীবাজারের জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার কমলাটিলা গুলিতে প্রাকৃতিক উপায়ে বেড়ে উঠে ঝোপজংগলে ভরে যেত। পাহাড়ে বসবাসকারীরা কমলা গাছকে জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করত। স্বাধীনতা উত্তর কালে জংগলের কমলা শিশু-কিশোরদের খেলার উপকরণ হিসাবে ব্যবহার হত। কমলা বাজারজাতকরণের পদ্ধতি তাদের জানা না থাকায় গাছের নিচে কমলা পচে স্তূপীকৃত হয়ে থাকত। জেলা কমলা চাষ প্রকল্প চালু হলে কালক্রমে চাষিরা কমলা চাষে উত্সাহিত হয়ে পড়েন, কিন্তু দুর্ভোগ তাদের পিছু ছাড়েনি। তাদের উত্পাদিত কমলা তারা তাদের এলাকার বাইরের বাজারগুলিতে পর্যন্ত আনতে পারত না। ভারতীয় কমলা বলে পথে পথে বাধাগ্রস্ত হতে হত।
মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার রূপাছড়া, আয়নাছড়া, হায়াছড়া, শুকনাছড়া, লাঠিটিলা, জলাবাড়ি, উত্তর কুচাইর থল, পশ্চিম ও পূর্ব কচুরগুল এবং বড়লেখা উপজেলার ডিমাই, উত্তর শাহবাজপুর ও নিজ বাহাদুরপুর এলাকা নিয়ে গঠিত হয় কমলা চাষ প্রকল্প। কালক্রমে কমলা বাগানের মালিকরা কমলা চাষে উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠেন। নানা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এলাকার কমলা চাষিরা প্রশিক্ষিত কমলা চাষি হয়ে উঠেন। কালক্রমে নতুন নতুন কমলা বাগানের সূচনা হতে থাকে। এমনকি এলাকার মহিলারাও কমলা চাষে আগ্রহী হয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন কমলা বাজারজাতকরণ নিয়ে তাদেরকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। স্থানীয় রেলস্টেশনে কমলা ঢাকা, চিটাগাং পাঠানোর জন্য বুক করতে এলে তাদেরকে হেস্তনেস্ত হতে হত। সময় সময় ভারতীয় কমলা পাচারকারী হিসাবে তাদেরকে হাজতবাসও করতে হয়েছে। অনেক আবেদন-নিবেদনের পর ২০০৫ সালের প্রথম দিকে জেলা প্রশাসন থেকে কমলাচাষিদের মধ্যে “কমলা চাষি” শনাক্তকরণ কার্ড বিতরণ করা হয় । এরপর থেকে তাদের দুঃখ কিছুটা লাঘব হতে থাকে। আগাম বাজারজাতকরণের ফলে কমলাচাষিরা ক্রমেই উত্সাহী হয়ে উঠে। বর্তমানে এই জেলার কমলা অনেক সময় ঢাকা ও চিটাগাং এর বাজারে ভারতীয় কমলার সংগে পাল্লা দিয়ে বিক্রয় হচ্ছে। কমলাচাষিদের অভিযোগ শুষ্ক মৌসুমে এলাকার পাহাড়ি ঝরনা এবং ছড়ার পানি থাকলেও সেচ ব্যবস্থা না থাকায় এই পানি গাছে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। কমলা চাষিরা দীর্ঘদিন যাবত্ যান্ত্রিক উপায়ে কমলা বাগানে পানি সেচের ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছে। পর্যাপ্ত পানির অভাবে কমলা নষ্ট হচ্ছে দেখে চাষিরা অনেক বছর কমলা অল্প মূল্যে বিক্রি করে দেন। গত মৌসুমে এই কমলা প্রতি শত ৬শ থেকে ৮শ টাকা দরে বিক্রি হয়েছিল এবং ফলনও বেশি ছিল। মৌলভীবাজারের কমলার অতীত ও বর্তমান প্রসঙ্গে এলাকার কমলা চাষিরা জানান, ২০০১ সালে সরকার জেলায় কমলা-আনারস উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করে। ঐ বছর প্রকল্প থেকে চারা সংগ্রহ করে চাষিদেরকে উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শতাধিক নতুন কমলা বাগান সৃজন করা সম্ভব হয়। বর্তমানে জুড়ী, কুলাউড়া ও বড়লেখা উপজেলা দুই সহস্রাধিক কমলা চাষি রয়েছেন। ২০০৮ সাল পর্যন্ত ২শতাধিক মহিলা কমলা চাষিকে উন্নত প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। তারা ২০০৬ সাল থেকে কমলা চাষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জেলা কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে মৌলভীবাজারের উত্পাদিত কমলায় রসের পরিমাণ ও মিষ্টির মাত্রা কম। মিষ্টির পরিমাণ ৬ থেকে ৭ টিএসএস (টোটাল সলিগুল সলিড)। এই বছর শীত মৌসুমে প্রথম ভাগ থেকে শীতের পরিমাণ যদি বৃদ্ধি পায় তবে কমলায় মিষ্টির পরিমাণ এবং রসের ভাগ বৃদ্ধি হবে। কমলা চাষিরা নভেম্বর মাস থেকে কমলা বাজারজাত করা শুরু করেন। বর্তমানে জেলায় ২শ হেক্টর এলাকা জুড়ে কমলা বাগান রয়েছে