ভাষা সৈনিক চা শ্রমিক নেতা মফিজ আলী

বাংলাদেশের শ্রমিক রাজনীতির প্রথম যুগের হাতে গোনা কয়েকজনের একজন মফিজ আলী। শুধু প্রথম যুগের নয়, প্রথম সারিরও বটে। আজকাল শ্রমিক নেতা বলতে যা বোঝায় তার সাথে মফিজ আলীদের কোন মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। শ্রমিক আন্দোলন করে কেউকেটা হওয়ার ইচ্ছা কিংবা আখের গোছানোর লক্ষ্য তার ছিল না। বৃহত্তর সিলেট তথা বাংলাদেশের বামপন্থী প্রগতিশীল আন্দোলনের এক অতি পরিচিত নাম। ১৯২৭ সালের ১০ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার শ্রীসূর্য ধোপাটিলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন তার মনে রাজনৈতিক চেতনার সৃষ্টি করেছিল। প্রবীন এই চা শ্রমিক নেতা ভাষা সৈনিক, শিক্ষাবিদ, এক কালের তুখোড় সাংবাদিক, বিশিষ্ট লেখক, প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ছিলেন। শ্রীমঙ্গলের বালিশিরা কৃষক আন্দোলনসহ বিভিন্ন কৃষক আন্দোলনেরও একজন বলিষ্ট নেতা হিসেবে পরিচিত। ১৯৫০ এর দশকে শুরম্ন হয় তার কলেজ জীবন। ছাত্র ইউনিয়নের কার্যকলাপের জন্য সিলেটের এম,সি কলেজের তত্কালীন অধ্যক্ষ সুলেমান চৌধুরী মফিজ আলীকে কলেজ থেকে বহিষ্কার করায় তার পক্ষে ডিগ্রি পরীক্ষা দেয়া সম্ভব হয়নি। ছাত্র জীবন থেকেই মফিজ আলী ছিলেন একজন তুখোড় সাংবাদিক ও কলামিষ্ট। তিনি পাকিসত্মান আমলে ইত্তেফাক, ডন, সংবাদ, জনতা, আজাদ, গণশক্তিসহ বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ ও কলাম লিখেছেন। ষাটের দশকে তিনি দৈনিক সংবাদ এর নিজস্ব প্রতিবেদক ছিলেন। ছাত্র জীবনে তার প্রকাশিত পুসিত্মকার নাম “পাকিসত্মানে সাম্রাজ্যবাদী শোষণের নমুনা।” পঞ্চাশের দশকে সাপ্তাহিক ইত্তেফাকে তার লেখা প্রবন্ধের মধ্যে রয়েছে “রাষ্ট্রভাষা ও আঞ্চলিক স্বায়ত্ত্বশাসন”, “মে দিবসের ইতিহাস” এবং ঈদ সংখ্যায় ছোট গল্প “একটি গামছা।” সাপ্তাহিক সেবার নিয়মিত লেখক ছিলেন। ভাষা আন্দোলনের সেই সংগ্রামী দিনগুলোতে মফিজ আলী সিলেট এমসি কলেজের ছাত্র অবস্থায় কলেজে আন্দোলনের ফাঁকে তিনি এলাকায় ছুটে এসে কমলগঞ্জে সভা সমাবেশ করেছেন। তখন সভা সমাবেশ ছিল অসম সহসের ব্যাপার। সিলেটে কলেজ জীবনে তিনি ছাত্র ইউনিয়নে যোগদান করেন। ছাত্র ইউনিয়নের জেলা কমিটিতে মফিজ আলী প্রথমে সহ সম্পাদক এবং পরে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। পূর্ব পাকিস্থানে ৯২ (ক) ধারা জারির পর তাকে গ্রেফতার করে সিলেট জেলে প্রেরণ করা হয়। মৌলানা ভাসানীর গঠিত কৃষক সমিতির শুরম্ন থেকেই তিনি এই সংগঠনে যুক্ত ছিলেন। বৃহত্তর সিলেট জেলা কমিটির প্রথমে সহ সম্পাদক এবং পরবর্তীকালে সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৬০ সালে তিনি কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্য পদ লাভ করেন। ১৯৬৩ সালে তিনি শ্রীমঙ্গলে বালিশিরা কৃষক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। এই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে ছালিক ও গনু মিয়া নামের ২ কৃষক মারা যান। ১৯৫৪, ১৯৬০, ১৯৬৪, ১৯৬৫, ১৯৬৭, ১৯৬৯ ও ১৯৭২ সালে রাজনৈতিক কারণে পাকিসত্মান নিরাপত্তা আইন ও বিভিন্ন মামলায় তিনি দীর্ঘ প্রায় ৬ বছর কারাবরন করেছেন। চা শ্রমিকদের দুঃখ দুর্দশা দেখে তিনি ১৯৬৪ সালে চা শ্রমিক নেতা কর্মীদের নিয়ে “পূর্ব পাকিসত্মান চা শ্রমিক সংঘ” নামে একটি শ্রমিক ইউনিয়ন দাঁড় করান। নিজের লোভ লালসার উর্ধ্বে থেকে দেশের শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য তিনি আপোষহীন রাজনীতি করেছেন। যিনি কখনও নিজের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য অর্থবিত্তের দিকে ফিরেও তাকাননি। তিনি ২০০৮ সালের ১০ অক্টোবর ভোররাতে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৮১ বছর বয়সে চিকিত্সারত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।