শতবর্ষ আগের চা বাগানে ব্যবহূত টোকেন

শতাধীক বছর আগে শ্রীমঙ্গলের ভাড়াউড়া চা বাগানে প্রথমবারের মত প্রচলিত সরকারী মুদ্রার পাশাপাশি ধাতব ‘টোকেন’ ব্যবহারের প্রচলন শুরু হয়। তত্কালীন সময় ভারতবর্ষে ব্রিটিশের চা চাষ বিকাশ লাভ করার প্রেক্ষাপটে তত্কালীন পূর্ব পাকিসত্মানের সিলেট এবং আসামের কাছাড় অঞ্চলে ‘জেমস ফিনলে’ চা কোম্পানীর বাগানগুলিতে ব্যপকহারে চাশ্রমিক নিয়োগ পাওয়ায় শ্রমিকদের মজুরী প্রদানের প্রয়োজনে ক্ষুদ্র মূল্যমানের প্রচলিত সরকারী মুদ্রার ঘাটতি দেখা দেয়। এই পরিস্থিতিতে ১৮৮১ সালে কোলকাতাস্থ ফিনলে মু’র এন্ড কোম্পানী প্রথম-বারের মত ইংল্যান্ড এর ‘বার্মিংহাম মিন্ট’ (টাকশাল) এ ‘টোকেন’ তৈরীর ফরমায়েশ প্রদান করে। ভারতবর্ষে চা চাষের প্রসার লাভ করার প্রথম অবস্থায় আসাম ও সিলেটের টি ভ্যালীগুলোতে যখন ভারতের বিভিন্ন এলাকা হতে শ্রমিকের আগমন ঘটতে থাকে তখন ক্ষুদ্রমানের মুদ্রা স্বল্পতার কারনে শ্রমিকের ‘হাজিরা (মজুরী) প্রদানে জেমস ফিনলের চা বাগানগুলিতে প্রকট সমস্যা দেখা দেয়। পরিস্থিতি মোকবেলায় তখন জেমস ফিনলের সিলেট ও কাছাড়ের বিভিন্ন চা বাগানে ‘টোকেন’ চালু করা হয় এবং বাগানের স্টোর ও স্থানীয় বাজারগুলিতে তখন থেকে সরকারী মুদ্রার পাশাপাশি এসব টোকেনও চালু হয়ে পড়ে। তত্কালীন সময়ে চা বাগানের একজন শ্রমিকের হাজিরা বা দৈনিক মজুরী ছিল তিন আনা। তখনকার প্রচলিত মুদ্রায় দুই আনা মানের একটি রৌপ্যমুদ্রা এবং অর্ধআনা মানের দুইটি তামার মুদ্রায় শ্রমিকের হাজিরা প্রদান করতে হতো। কিন্তু এরূপ তিনটি মুদ্রা তহবিলে না থাকলে ‘সিকিআনা’ মানের ১২টি মুদ্রায় মজুরী পরিশোধ করতে হতো। ধাতব মুদ্রা পরিবহন তত্কালীন সময় ঝুঁকিপূর্ণ, সময় ও ব্যয়সাধ্য ছিল। ১৮৯০ সালে আসাম-বেঙ্গল রেলপথ সম্পূর্ণ হবার আগে পর্যাপ্ত কোলকাতা হতে এতদঞ্চলের চা বাগানগুলিতে মুদ্রাপরিবহন রিতিমত দুরুহ ছিল। নদীপথে দেশি নৌকায় সাড়ে তিনমাস সময় নিয়ে গোয়ালন্দ ও মদনাঘাট হয়ে কিছু নৌপথে এবং কিছুটা সড়কপথে মুদ্রা পরিবহন করা হতো। কিন্তু সেখানেও বিপদ ছিল এবং নৌডাকাতের উপদ্রব প্রায়ই লেগে থাকতো। ১৮৪৭ সালে একবার দুবারাই নামক স্থানে গদাধর নদীতে মুদ্রাবোঝাই দেশি নৌকা ডুবে যাবার পর নতুন আরেক সমস্যা মাথা চাড়া দেয় এবং তখন থেকে মুদ্রাভর্তি ছোট ছোট প্যাকেটে বাঁশ বেধে দেয়া হতো যাতে নৌকা ডুবে গেলেও মুদ্রার প্যাকেটগুলো যেনো ভেসে থাকে। এসব সমস্যার কারনে বড় বড় চা বাগানগুলি টোকেন ব্যবহার শুরম্ন করে তাদের প্রয়োজন অনেকটাই মিটিয়ে ফেলে। তারা কোলকাতাস্থ তাদের প্রতিনিধির মাধ্যমে বামিংহামের ‘হিটন মিন্ট’ ও ‘ক্যালকাটা মিন্ট’ এ তিন আনা, দুই আনা এবং নয় পাই মানের টোকেন তৈরী করিয়ে নিত। এসব টোকেনের কোন কোনটিতে চা বাগানের নামও লিখা থাকতো।