শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দৈন্যদশা বনাম কারিগরি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০১৩, ২০:৪০
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। বিংশ শতাব্দীর শেষদিকেও আমাদের দেশে যে ধরনের শিক্ষাপদ্ধতি বা বিষয় নির্ধারিত ছিল, একবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই সেটি অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞানের দ্রুতগামী অগ্রযাত্রা আমাদের ব্যক্তিগত জীবন ও কর্মক্ষেত্রকে ক্রমেই প্রযুক্তিনিভর করে তুলেছে। ফলে জীবনমুখী শিক্ষা ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা সর্বত্র অনিবার্য হয়ে উঠেছে। বিশ্বের উন্নত জাতিগুলোর এই বাস্তব উপলব্ধি থেকে আমরা এখনো প্রায় শতাব্দীকাল পিছিয়ে বলা যায়। সুতরাং দেশের শিক্ষানীতিতে জীবনমুখী ও সময়োপযোগী শিক্ষাব্যবস্থার ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়াই সঠিক। কিন্তু অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি অনেকের নীতি-আদর্শবিহীন তত্পরতা বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থাকে হাস্যকর ও ব্যয়ের চেয়ে প্রাপ্তির অসঙ্গতিকে স্পষ্ট করে তুলেছে। সরকারিভাবে কারিগরি ও ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা একেবারেই অনুল্লেখযোগ্য। কাজেই বেসরকারি খাতে এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও সেসব প্রতিষ্ঠানে অর্থ প্রদানের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। সাধারণ শিক্ষা ও মাদ্রাসা শিক্ষা সমপ্রসারণের আদলে ইতোমধ্যে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডও কার্যকর আছে। সাধারণ শিক্ষা বোর্ড ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন অনেক স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসাতেই বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি না থাকায় বিজ্ঞান শাখা চালু করা হয় না। কারিগরি শিক্ষা বলতে ব্যবহারিক শিক্ষার প্রাধান্য থাকার কথা। কেবলমাত্র যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক দিয়ে সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা গেলেও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেলায় সেটি একেবারেই অসম্ভব। অতএব দেশের অনুমোদিত কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশের বাস্তব চিত্র হতাশাজনক ও উদ্দেশ্যপূর্ণ বলে অনেকেই অভিযোগ করে থাকেন।
দীর্ঘদিন ধরে দেশের মাদ্রাসাশিক্ষাকে যুগোপযোগী করার প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। ধীরে ধীরে সেখানে শুধু সাধারণ শিক্ষাই নয়, পাশাপাশি বিজ্ঞানশিক্ষারও প্রসার হচ্ছে। ভবিষ্যতে একমুখী শিক্ষানীতি চালু হলে আমরা মনে করি কারিগরি শিক্ষা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব আরো বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা বিষয় নিয়ে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো চালু আছে। বিএম শাখা শিক্ষকনির্ভর হলেও ভোকেশনাল শাখায় ব্যবহারিক বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী দেশের নামসর্বস্ব টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজগুলোতে ভবনের চেয়ে চেয়ার-টেবিলের আকাল ভয়াবহ। এমন অনেক কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খবর আছে যেখানে একটি কম্পিউটার পর্যন্ত নেই। বাংলাদেশের যে কোনো মধ্যবিত্ত পরিবারে যখন পারিবারিকভাবে কম্পিউটারের ব্যবহার স্বাভাবিক ব্যাপার, সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেটি না থাকা হাস্যকর তো বটে। বিশেষ করে যেখানে সিলেবাস অনুযায়ী কম্পিউটার শিক্ষা একটি আবশ্যকীয় বিষয়। লক্ষণীয় বিষয় এই যে, অধিকাংশ ঝরে পড়া শিক্ষার্থী বিশেষ করে মেধাহীন শিক্ষার্থী যখন স্কুল ত্যাগ করতে বাধ্য হয়ে বেকারত্বের পাশাপাশি কাজের সন্ধানে ছোটাছুটি করতে থাকে, তখন সঙ্গত কারণেই তারা কারিগরি শিক্ষার দিকে ঝুঁকে পড়ে। ব্যবহারিক শিক্ষায় উপযুক্ত হয়ে তারা কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখে। তত্ত্বীয় শিক্ষা ধারণের ক্ষমতাই যাদের সীমিত ব্যবহারিক শিক্ষার উপকরণ ছাড়া তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্পূর্ণই অসম্ভব বলে মনে হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি বহাল রাখতে পাবলিক পরীক্ষাগুলোয় পরীক্ষার্থীদের অসদুপায় অবলম্বন অনিবার্য হয়ে পড়ে। এমনকি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কর্তব্যরত শিক্ষকদের এসব কাজে ব্যবহার করার বিষয়টি খুবই ন্যক্কারজনক।
যুগের চাহিদা অনুযায়ী সরকার কারিগরি শিক্ষার ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়ায় যত্রতত্র নামসর্বস্ব ভোকেশনাল স্কুল এবং বিএম শাখার কলেজ প্রতিষ্ঠা করে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে অনেকেই এদিকে ঝুঁকে পড়ছে। আত্মকর্মসংস্থানের ইচ্ছা নিয়ে প্রকৃতপক্ষেই যারা এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়, তারা হতাশ হয়ে মেধার অপচর্চা করে। সুতরাং এই খাতে ব্যয় করা অর্থ শিক্ষাখাতে অপচয় বলা না গেলেও অপব্যয় বলা খুব বেশি ভুল বলে মনে হয় না।
আমরা মনে করি, প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান সমাজব্যবস্থায় কারিগরি শিক্ষা অত্যন্ত আবশ্যকীয়। এই খাতে ব্যয়িত অর্থের শতভাগ কাঙ্ক্ষিত সাফল্য বয়ে আনবে এটাই সকলের প্রত্যাশা। স্বাধীনতার চার দশক পরও দেশে বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার না ঘটা যেমন আমাদের ব্যর্থতা, তেমনি কারিগরি শিক্ষার নামে উত্সাহী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করাও অনুচিত। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডকে শক্তিশালী ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর করে গড়ে তুলতে হবে। সংখ্যায় কম হলেও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারি বরাদ্দ বৃদ্ধি করে কেবল জনবল নয়, ব্যবহারিক শিক্ষার জন্য পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ও শিক্ষাসরঞ্জাম সরবরাহ করতে হবে। সরকারি উদ্যোগে বেশি বেশি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পাশাপাশি বেসরকারি যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বর্তমান আছে সেগুলোর মান উন্নয়নের জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে নিম্নবিত্তের বেকারদের সংখ্যাই সর্বাধিক। স্বল্পশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত এই বেকাররা সমাজের বাড়তি বোঝা হয়ে উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে চলেছে। বেকারত্বের কারণে তাদের মধ্যে সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় ক্রমেই ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বিশ্বায়নের এই যুগে দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নিতে হলে কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থাকে দায়সারা ভাবলে চলবে না। সর্বাধিক গুরুত্ব সহকারে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দক্ষ কারিগর গড়ার কারখানায় পরিণত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরো বেশি আন্তরিক ও যত্নবান হতে হবে।
ঢাকা