সুনামগঞ্জে মজুরি বৈষম্যের শিকার নারী শ্রমিক
তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০১৩, ২২:০৭
সুনামগঞ্জ জেলার নারী শ্রমিকরা চরম মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। কাজের অভাবে মজুরি বৈষম্য সত্ত্বে্ও নারী শ্রমিকরা কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। আর অল্প মজুরি দিয়ে বেশি কাজ করানো যায় এ কারণেই তাদের মালিক পক্ষ নারী শ্রমিককে দিয়ে কাজ করাতে বেশি উত্সাহী।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই নারী শ্রমিকের অনেকেই সংসারে অভাবের তাড়নায়, কেউ স্বামী পরিত্যক্ত, কেউ স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে, আবার অনেকের স্বামীর রোগ ও বৃদ্ধ হওয়ার কারণে অল্প পারিশ্রমিকে বেশি শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। জানা যায়, এই নারী শ্রমিকের মধ্যে কেউ পাথর ভাঙ্গার মেইলে, কেউ বালু-পাথর লোড-আনলোড করতে, আবার কেউ বিভিন্ন কলখারকানায়, রাস্তার মাটি কাটা ও ইমারত নির্মাণ কাজে সারা দিন পুরুষের সমপরিমাণ কাজ করেও মজুরি বৈষ্যমের শিকার হচ্ছে। সম্প্রতি সরেজমিনে জেলার তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, জামালগঞ্জ, ধরমপাশা, জগন্নাথপুরসহ বেশ কয়েকটি উপজেলা ঘুরে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।
এ ব্যাপারে তাহিরপুর উপজেলার গাঘড়া গ্রামের পাথর ভাঙার নারী শ্রমিক রং মালা বেগম জানান, ৮-১০ বছর আগে ছোট ছোট দুই ছেলেমেয়ে রাইক্কা আমার স্বামী মারা যায়। তাই সংসারের খায়ন আর পুলা পানের লেহা পাড়ার খরছে টেহার লাইগ্গা পাথর ভাঙার মেইলে কাম (কাজ) করি। তিনি আরও বলেন, আমার দলে ৩০ জন বেইট্টাইন (নারী) কাম করে। আমরা সবাই সকাল ৭টা ৮টার সময় বেডাইনের সঙ্গে কাম করে সন্ধ্যার সময় গেলেও বেডাইনে সারাদিনে পায় ৩শ’ টাহা আর আমরা পাই ১২০ টাহা থেকে ১৫০ টাহা। যা দিয়ে আমাদের সংসার চলে না। বিশ্বম্ভরপুর, জামালগঞ্জ, ধরমপাশা, জগন্নাথপুরসহ বেশ কয়েকটি উপজেলা ঘুরে বিভিন্ন নারী শ্রমিকের সঙ্গে কথা বললে তারা অনেকেই জানান, ‘সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমাদের কাজ করতে হয়। শুধু দুপুরে খাওয়ার টাইমে আধাঘণ্টা বিরতি দেয়া হয়। আমরা সারাদিন এমন কাজ করে মজুরি পাই মাত্র ১৪০ টাহা আর আমাদের সমান কাজ করে বেডাইন (পুরুষ) পায় ৩শ’ টাহা।
তারা আরও বলেন, এখন বাজারে ১ কোছি (আড়াই কেজি) চালের দাম ৭০ টাকা। আর শাকসবজি ও শুঁটকি কিনলেই সারাদিন কাম করে যা পাই তা শেষ হয়ে যায়। মাছ ত দেখাই যায় না। বর্তমানে বাজারের দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ফলে এ সকল নারী শ্রমিকের প্রতিদিনের কাজের বিপরীতে পাওয়া টাকায় তাদের দিন চলে না। এই মজুরি দিয়ে দুই বেলা দুই মুটো ভাত খেয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে বেঁচে থাকতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও জীবন মানের উন্নয়ন নেই নারী শ্রমিকদের। ঘোচেনি মজুরি বৈষম্য। তারা শ্রম আইনেও উপেক্ষিত। এমনকি নেই নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ ও মাতৃত্বকালীন ছুটি।
এ ব্যাপারে তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনিছুল হক বলেন, হাওর বেষ্টিত সুনামগঞ্জ জেলার অধিকাংশ পরিবারই নিম্ন আয়ের। যার কারণে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও সংসারে একটু সচ্ছলতা আনার জন্য বিভিন্ন কলকারখানা ও মেইলে কাজ করে থাকেন।