চাকরিপ্রার্থীদের ‘পে অর্ডার, ব্যাংক ড্রাফট’ আতংক
প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০১৩, ২০:৪৯
বাংলাদেশে চাকরির বাজারে শূন্যপদের বিপরীতে চাকরিপ্রার্থীর আধিক্য দিন দিন বাড়ছে। এতে করে আরও বেশি প্রতিযোগিতার সম্মুখীন করছে হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থীদের। বাংলাদেশে চাকরির শূন্যপদের বিপরীতে চাকরীপ্রার্থীদের সংখ্যা এত বেশি যে, সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ অর্জনের পরও একটি চাকরি পাওয়ার আশায় বছরের পর বছর সময় পার করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে চাকরিপ্রার্থী অসংখ্য তরুণ-তরুণীদের নিকট বর্তমানে আতংকের কারণ হিসেবে চাকরি লাভের আবেদনপত্রে উচ্চমূল্যের পে-অর্ডার/ব্যাংক ড্রাফট প্রদানের বিষয়টি আলোচিত হয়ে আসছে।
প্রতিবছর লক্ষাধিক তরুণ-তরুণী স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষা সমাপনের পরবর্তী পর্যায়ে চাকরি লাভের আশায় পুরোনদের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে। কিন্তু চাকরি প্রার্থীদের তুলনায় বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে চাকরি ক্ষেত্র বৃদ্ধি পাচ্ছে না। বাংলাদেশে চাকরির ক্ষেত্রে পদের তুলনায় চাকরিপ্রার্থীদের আধিক্য বিষয়টিকে করে তুলেছে আরও জটিল। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানের চাকরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলেই সেখানে অসংখ্য তরুণ-তরুণী আবেদন করার আগ্রহ প্রকাশ করে। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ বিজ্ঞাপ্তিতে উচ্চমূল্যের পে-অর্ডার/ব্যাংক ড্রাফট প্রদানের বাধ্যবাধকতা থাকায় দারিদ্র্যপীড়িত অসংখ্য পরিবারের মেধাবী তরুণদের চাকরিতে আবেদন করার সুযোগ সীমিত হয়ে আসছে।
বিশেষ করে, আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের চাকরি লাভের পূর্ববর্তী সময়ে তাদের পরিবারের উপর অর্থনৈতিক বিষয়াদির ক্ষেত্রে নির্ভরশীল হতে হয়। কিন্তু বিগত কয়েক মাসের চাকরির বিজ্ঞপ্তি পর্যালোচনার মাধ্যমে দেখা গেছে, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহে চাকরির আবেদনের সাথে ৩০০-৪০০ টাকা পর্যন্ত পে-অর্ডার/ব্যাংক ড্রাফট চাওয়া হয়ে থাকে। প্রতি মাসে যদি চারটি প্রতিষ্ঠানেও একজন তরুণ-তরুণী চাকরির আবেদন করে তবে আনুষাঙ্গিক বিভিন্ন খরচসহ তার দু’হাজার টাকার মতো খরচ করতে হয়। ফলে একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী তরুণের পক্ষে নিজ মেধা এবং যোগ্যতা থাকার পরও চাকরির আবেদন করা সম্ভপর হয় না। সেই সাথে রয়েছে পে-অর্ডার/ব্যাংক ড্রাফট করার ক্ষেত্রে ব্যাংকসমূহের অসহযোগিতামূলক মনোভাব।
আমাদের দেশে প্রতিষ্ঠিত মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতি চাকরিপ্রার্থীদের আগ্রহ থাকায় যেকোনো মধ্যম মানের পদের বিপরীতেই আনুমানিক ৫ সহস্রাধিক চাকরিপ্রার্থী আবেদন করে থাকে। প্রতিজনের আবেদনের সাথে ৩০০-৪০০ টাকার পে-অর্ডার/ব্যাংক ড্রাফট সংযুক্ত থাকায় এই খাত হতে প্রতিষ্ঠানটি বিপুল অংকের অর্থ লাভ করে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পাদনের ক্ষেত্রে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয় কিনা?
আগে চাকরিপ্রার্থীদের নিকট ১০০-২০০ টাকার পে-অর্ডার/ব্যাংক ড্রাফট চাওয়া হলেও বর্তমানে উচ্চমূল্যে পে-অর্ডার/ব্যাংক ড্রাফট চাওয়ার বিষয়টি আতংকের কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে মধ্যবিত্তসহ নিম্নবিত্ত পরিবারের বেকার তরুণ-তরুণীদের। সেই সাথে চাকরির অপ্রতুলতা এবং চাকরিপ্রার্থীর আধিক্যের কারণে সারাদেশে বেশকিছু ভুয়া প্রতিষ্ঠান গজিয়ে উঠেছে, যাদের প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে চাকরি প্রদানের মিথ্যা আশ্বাস প্রদানের মাধ্যমে পে-অর্ডার/ব্যাংক ড্রাফট গ্রহণ করে চাকরিপ্রার্থীদের বিভিন্নভাবে প্রতারিত করা।
চাকরিক্ষেত্রে প্রতারণার শিকার হয়ে চাকরিপ্রার্থীরা শুধু যে আর্থিক ক্ষতির শিকার হয় তা নয়, মানসিকভাবেও হয়ে পড়ে বিপর্যস্ত। ফলে বিষয়টির যথাযথ নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। কেননা, বাংলাদেশের বেসরকারি পর্যায়ে শীর্ষ চাকরি প্রদানকারী টেলিকম প্রতিষ্ঠানসহ আইসিটি এনাবল প্রতিষ্ঠানসমূহ অনলাইনে চাকরিপ্রার্থীর নিকট হতে দরখাস্ত আহবান করলেও কোনরূপ পে-অর্ডার/ব্যাংক ড্রাফটের শর্ত আরোপ করে না। বিষয়টির প্রতি যথাযথভাবে গুরুত্বারোপ প্রদানের মাধ্যমে দেশের লক্ষ্য বেকার তরুণ-তরুণীদের পে-অর্ডার/ব্যাংক ড্রাফট প্রদানের শর্তের বাধ্যবাধকতা হতে মুক্তি প্রদানের লক্ষ্যে প্রণীত হোক নতুন দিনের চাকরিক্ষেত্র।