সৌরবিদ্যুতে আলোকিত
ফুলছড়ির চরাঞ্চল
জয়নুল আবেদীন, ফুলছড়ি (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০১৩, ২১:৪৩
গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার চরাঞ্চলের অর্ধ-লক্ষাধিক মানুষকে আলো এনে দিয়েছে সোলার বা সৌরশক্তিদ্ধ। আর ব্রহ্মপুত্র বেষ্টিত চরের মানুষকে এ সুবিধা পৌঁছে দিতে কাজ করছে ১০টি বেসরকারি সংস্থা। তাদের বিক্রি করা সোলার প্যানেলের আলোয় আলোকিত হচ্ছে আধুনিক সুবিধাবঞ্চিত দরিদ্র এ জনপদের মানুষ। মান্ধাতা আমলের কেরোসিনের কূপি আর হারিকেনের পরিবর্তে ঘরে ঘরে জ্বলতে দেখা যাচ্ছে সৌরশক্তির বাতি। কমে গেছে জ্বালানি খরচ। সৌরশক্তির বদৌলতে গ্রামীণ জনজীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টেলিভিশন, কম্পিউটারের মতো আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, যা তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৌরবাতির কারণে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ারও যথেষ্ট সুবিধা হয়েছে। তাদের শিক্ষার মানোন্নয়নে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। দেশের অন্যান্য এলাকার মতো বিদ্যুতের লোডশেডিং বা লো-ভোল্টেজ কিংবা যান্ত্রিক গোলযোগের বিড়ম্বনা নেই ফুলছড়ি উপজেলার চরাঞ্চলের ঘরে ঘরে স্থাপিত এসব সৌর প্যানেলে। দিনের বেলায় সূর্য থেকে শক্তি সঞ্চয় করে রাতের অন্ধকার দূর করা হয় সেই সোলার পাওয়ার দিয়েই। রাতের আঁধার দূর করার সাথে সাথে শিক্ষাক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা এ জনগোষ্ঠির জীবনযাত্রার উন্নয়নেও অবদান রাখছে এ সৌরশক্তি। গজারিয়া ইউনিয়নের চর গলনা গ্রামের জিয়াডাঙ্গা রেজি: বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী কবিতার এতদিন রাতে লেখাপড়া করতো হারিকেনের আলোতেই। তার বাবা ঘরে সোলার প্লান্ট স্থাপন করার পর কবিতার লেখাপড়া করতে অনেক সুবিধা হয়েছে। জ্বালানি খরচও কমে গেছে। কবিতা জানায়, কুপি বা হারিকেনের আলোর চেয়ে সোলারের বাতিতে পড়াশোনা করতেই বেশি আনন্দ পায় সে। কেবল কবিতা নয়, ফুলছড়ি উপজেলার এরেন্ডবাড়ি, ফজলুপুর, ফুলছড়ি ও গজারিয়া ইউনিয়নের দুই শতাধিক গ্রামের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের কাছে রাতে পড়াশোনার জন্য তেলের বাতির চেয়ে সোলার বাতিই বেশি জনপ্রিয়। চর দেলুয়াবাড়ি গ্রামের গৃহিণী মমতা জানান, সৌরবিদ্যুত্ তার পরিবারের জীবনযাত্রাই পাল্টে দিয়েছে। তিনি জানান, ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা, তার রান্নাবান্নাসহ রাতের গৃহস্থালির কাজ অনেক সহজ হয়ে গেছে। কমে গেছে বাতি বা ল্যাম্প জ্বালানোর ঝামেলাও।
এ প্রসঙ্গে ফুলছড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা এমএ সবুর সরকার বলেন, সোলার প্যানেল নিতে গেলে কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, আবেদন কিংবা কোনো জামানতের প্রয়োজন নেই। সহজ কিস্তিতে পাওয়া যায় সোলার প্যানেল। সংযোগ দেয়া, সার্ভিসিংসহ প্রয়োজনীয় সব সেবাই পাওয়া যায় ঘরে বসেই। তাই ব্যবহারকারীদের কোনো বিড়ম্বনায় পড়তে হয় না। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চরাঞ্চলের প্রায় ৫০ হাজার পরিবারের মধ্যে প্রায় শতকরা ৫০ ভাগ পরিবার সোলার প্যানেল ব্যবহার করছে।
ফুলছড়ির চরে সোলার বাতি প্রথম আসে বছর চারেক আগে। এরই মধ্যে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। আর্থিকভাবে সচ্ছল প্রায় সব পরিবারই সোলার বাতি ব্যবহার করছে। দরিদ্র মানুষও কিস্তিতে তা নিতে শুরু করেছে। সোলার বাতি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও এনে দিয়েছে ব্যাপক পরিবর্তন। এতে জ্বালানি তেল খরচ অনেক কমে গেছে। ফুলছড়ি বাজারসহ ছোটবড় অর্ধ-শতাধিক হাট-বাজারের প্রায় সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেই সোলার বাতি ব্যবহার করা হচ্ছে। রাস্তা, বেড়িবাঁধ ও রিমোট এলাকার মাছঘাট, বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের দোকান, মাছের আড়তের চালে শোভা পাচ্ছে সোলার প্যানেল। বিদ্যুতের বাতির মতো সোলার বাতির আলো ঝলমলে না হলেও বিদ্যুত্ সুবিধা বঞ্চিত প্রান্তিক জনপদের বাসিন্দারা এতেই খুশি।
ফুলছড়ি উপজেলায় ১০টি বেসরকারি সংস্থা এ পর্যন্ত প্রায় ১৮ হাজার ২৯৩টি সোলার বাতির সেট বিক্রি করেছে। এর মধ্যে ব্রাইট গ্রীন এনার্জি ফাইন্ডেশন ৪৫০টি, সৃজনী বাংলাদেশ ৯টি ইউনিটে ১ হাজার ৫শ’টি, গ্রীণ হাউজিং ১ হাজার ৩৫৬টি, আভা ডেভলোপমেন্ট ৮৭৭টি, শক্তি ফাউন্ডেশন ৯৬৩টি, নুসরা ৯২টি, গ্রামীণ শক্তি ২ হাজার ৩২২টি , ইমজেন টেকলোনজি ৮৯৯টি, রুরাল সার্ভিসেস ফাইন্ডেশন ৫৪৮টি ও সোলারেন ফাউন্ডেশন ৩৫০টি পরিবার ও ব্যবসায়ীকে সৌরশক্তির সুবিধা দিচ্ছে। সৃজনী বাংলাদেশের ফুলছড়ি ব্রাঞ্চ ম্যানেজার মো: আলমগীর বাদশা বলেন, সর্বনিম্ন ২০ থেকে সর্বোচ্চ ৮৫ ওয়াট সৌর প্যানেল ফুলছড়িতে রয়েছে। ৮৫ ওয়াটের একটি প্যানেলে একটি সাদা-কালো টিভি, ৭-৮টি লাইট ও একটি ফ্যান চলে। ব্যাটারি, লাইট ও কন্ট্রোলার নিয়ে একটি সোলার প্যানেল। ২০ ওয়াট নগদে ১১ হাজার ৬২০ টাকা এবং তিন বছরের কিস্তিতে পড়বে প্রায় ১৪ হাজার ৫৯২ টাকা। ৮৫ ওয়াট নগদে ৪২ হাজার ৭শ’ টাকা এবং তিন বছরের কিস্তিতে পড়বে ৫১ হাজার ৪১১ টাকা।
সৃজনী বাংলাদেশের গাইবান্ধা এরিয়া ম্যানেজার খলিলুর রহমান জানান, একবার সৌর প্যানেল বসানো হলে ২০ বছর এর সুবিধা ভোগ করা যায়। মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন ও বিদ্যুত্ না থাকার কারণে ফুলছড়িতে সৌর প্যানেলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। প্রতিদিনই বাড়ছে গ্রাহক।