আগেও একবার বঙ্গবন্ধু হত্যার চেষ্টা চালানো হয়

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের তিন মাস আগেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে একবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ২১ আগস্ট এই গুপ্তহত্যার চেষ্টা করা হয় বলে সম্প্রতি উইকিলিকসের ফাঁস করা এক মার্কিন তারবার্তায় বলা হয়েছে। ভারতীয় সংবাদপত্র দ্য হিন্দুর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা চেষ্টার পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারকে গোপন তারবার্তাটি পাঠান বাংলাদেশে নিযুক্ত তত্কালীন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ডেভিড ইউজিন বোস্টার। এ হত্যা চেষ্টার বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ না করার জন্য তখন বাংলাদেশ সরকার নির্দেশ দিয়েছিল। উইকিলিকসের ফাঁস করা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের গোপন তারবার্তায় বোস্টার বলেন, ১৯৭৫ সালের ২১ মে সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা চেষ্টার বিষয়ে আমরা দুটি সোর্স থেকে তথ্য পেয়েছি। প্রথম সোর্স হলো মার্কিন দূতাবাসের একজন বাঙালি রাজনৈতিক সহকারী। তিনি এ তথ্য জেনেছিলেন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের নিরাপত্তা ইউনিটে দায়িত্বে থাকা পুলিশের একজন ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্টের কাছ থেকে। অন্য তথ্যদাতা হলো একজন সাংবাদিক। যিনি দূতাবাসের তথ্য কর্মকর্তাকে এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন। তিনি জানান, এ খবরটি প্রকাশ না করতে তখন গণমাধ্যমকে তথ্য অধিদপ্তর (প্রেস ইনফরমেশন ডিপার্টমেন্ট) কঠোরভাবে নিষেধ করেছিল। দুটি সূত্রই জানায়, ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকায় একটি টেলিভিশন ভবন উদ্বোধন শেষে বাসায় ফেরার পথে ঐদিন সন্ধ্যায় শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। হামলায় গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়েছিল। এতে দুই ব্যক্তি আহত হলেও শেখ মুজিবুর রহমান অক্ষত ছিলেন। ঘটনার দুদিন পর ২৩ মে তারবার্তাটি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের কাছে পৌঁছে। দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমান ও মার্কিন প্রশাসনের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছিল। কারণ নিক্সন প্রশাসনের সঙ্গে পাকিস্তানের সুসম্পর্ক ছিল। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়া ও সামরিক অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেও একটি তারবার্তা পাঠিয়েছিলেন তত্কালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। এ তারবার্তায় বলা হয়, বাংলাদেশের জনগণ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর কোন আনন্দ উদযাপন করেনি। এ হত্যাকাণ্ডকে জনগণ ‘শান্তভাবে’ মেনে নিয়েছে, সম্ভবত তারা এটিকে এক ধরনের মুক্তি হিসাবে মনে করছে। তারবার্তায় আরো বলা হয়, হত্যাকাণ্ডের পর নতুন সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরকে তুলনামূলক স্বস্তির মনে হচ্ছিল। যতদূর বোঝা যায়, বাঙালি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে শেখ মুজিবুর রহমান ব্যর্থ হওয়ায় জনগণের সঙ্গে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। এছাড়া রাজনৈতিকভাবে নিজেকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নেয়ার আকাঙ্ক্ষা এর কারণ হতে পারে। জুনের প্রথমদিক থেকেই বঙ্গবন্ধু নিজের ক্ষমতা সুদৃঢ় করার চেষ্টা চালান। হয়তো এ কারণেই অভ্যুত্থানকারীরা আরো বেশি দেরি করতে চায়নি। হয়তো হত্যাকাণ্ডের জন্য ভারতের স্বাধীনতা দিবসকে বেছে নেয়ার বিষয়টি প্রাসঙ্গিক, তবে আমাদের কাছে একে কাকতালীয় বলে মনে হয়। এ ঘটনার পর বাংলাদেশে আবারো ভারতের হস্তক্ষেপ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল যুক্তরাষ্ট্র। পরে নয়াদিল্লিস্থ মার্কিন দূতাবাস জানায়, বাংলাদেশে অভ্যুত্থানের পর ভারতীয় সেনাবাহিনীর কোনো পদক্ষেপের বিষয়ে আমরা এখনো কিছু শুনতে পাইনি। যদিও এ বিষয়ে খোঁজ-খবর নেয়ার সুযোগ আমাদের কম। পূর্বাঞ্চলীয় আর্মি কমান্ডার জেনারেল জ্যাকব ও মেজর সেহগালের সঙ্গে কথা বলে তাদের নিরুদ্বেগ ও স্বাভাবিক মনে হয়েছে। যদিও এ অভ্যুত্থানে ভারতের আপত্তি ছিল। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে দূতাবাসের কর্মকর্তাদের এমনটাই মনে হয়েছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশে হত্যাকাণ্ড পরবর্তী নতুন সরকারের পররাষ্ট্র নীতি নিয়েই উদ্বেগ ছিল ভারতের। এ ঘটনার পর বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে যেমন নিরব থাকতে বলা হয়েছিল, তেমনি ভারতও তাদের দেশের গণমাধ্যমগুলোকে শান্ত থাকতে বলেছিল। এ তারবার্তায় খন্দকার মুশতাক আহমেদের গঠিত সরকারের বিষয়ে মন্তব্য করা হয়। বলা হয়, নতুন রাষ্ট্রপতি ভারত বিদ্বেষী হিসাবে পরিচিত। সরকারের মনোভাব দেখে মনে হচ্ছে, তারা পাকিস্তানসহ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে চাইবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই সরকারের সম্পর্ক বিষয়ে রাষ্ট্রদূত লিখেছিলেন, মুজিব সরকারের চেয়ে আরো বেশি আন্তরিক সম্পর্ক হতে পারে। বাংলাদেশ সরকার আমাদের কাছে আরো বেশি সহায়তা চাইতে পারে। উল্লেখ্য, গত এপ্রিলে প্রায় ১৭ লাখ গোপন তারবার্তা প্রকাশ করে উইকিলিকস। ১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের মার্কিন দূতাবাস থেকে তাদের পররাষ্ট্র দফতরে এসব তারবার্তা পাঠানো হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে পাঠানো হয় প্রায় চার হাজার ৫১১টি তারবার্তা। হত্যাকাণ্ডের জন্য ইন্দিরা সন্দেহ করতেন যুক্তরাষ্ট্রকে: এদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে মনে করতেন ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (সিআইএ) সাবেক কর্মকর্তা ব্রুস রিডেলকে উদ্ধৃত করে সম্প্রতি এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন দেশ-বিদেশের কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। এ প্রতিবেদনে বলা হয়, ইন্দিরা গান্ধী মনে করতেন ১৯৭১ সালের প্রতিশোধ হিসাবে বঙ্গবন্ধুর পর তাকেও হত্যার জন্য সিআইএ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ১৫ আগস্টের পর তার এ সন্দেহ আরো দৃঢ় হয়। রিডেল বলেন, ইন্দিরা গান্ধীর যুক্তরাষ্ট্রকে দরকার ছিলো না। তবে তিনি নিক্সনকে শত্রু বলেই মনে করতেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক সবসময়ই আন্তরিক ছিল কিন্তু ঘনিষ্ঠ ছিল না। নেহরু ও ইন্দিরাকে যুক্তরাষ্ট্র সবসময় কূটনৈতিকভাবেই স্বাগত জানিয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের প্রতি বিশ্ব সম্প্রদায়ের সমর্থনের জন্য ইন্দিরা যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছিলেন। যদিও ওভাল অফিসে রিচার্ড নিক্সনের চরম বাধার মুখে পড়েন তিনি।