সালাহউদ্দিন কাদের
চৌধুরীর মামলার
রায় যে কোন দিন
প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০১৩, ২২:৪১
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এমপির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় যেকোনো দিন ঘোষণা করা হবে। মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষে গতকাল বুধবার বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন। গতকাল মামলার বিচারিক কার্যক্রমের শেষদিনে উভয়পক্ষের আইনজীবীরা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেন। রাষ্ট্রপক্ষ সালাহউদ্দিন কাদেরের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে দাবি করে তার সর্বোচ্চ শাস্তি কামনা করেন। তবে আসামিপক্ষের দাবি এসব অভিযোগের কথিত সময়ে সালাহউদ্দিন কাদের বাংলাদেশে ছিলেন না। এছাড়া এসব অভিযোগ মিথ্যা ও রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে দাবি করে অভিযোগ থেকে সালাহউদ্দিন কাদেরের অব্যাহতি চান তার আইনজীবীরা।
সালাহউদ্দিন কাদেরের বিরুদ্ধে হত্যা, গণহত্যা, অপহরণ, নির্যাতনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের ২৩টি অভিযোগ এনেছে রাষ্ট্রপক্ষ। এর মধ্যে ১৭ অভিযোগে সাক্ষ্য প্রমাণ হাজির করেছে তারা। এ মামলায় সালাহউদ্দিন কাদের ২ বছর আট মাস আটক রয়েছেন। গতকাল মামলার কার্যক্রম চলাকালে তিনি ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন।
২০১০ সালের ২৫ মার্চ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হওয়ার পর এখন পর্যন্ত ছয়টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। রায়ে জামায়াতে ইসলামীর বহিষ্কৃত রুকন পলাতক আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার, নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদ ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। আর জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযমের ৯০ বছর ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। বর্তমানে আরো কয়েকজনের বিচার প্রক্রিয়া চলছে।
ট্রাইব্যুনালের বেঁধে দেয়া সময় অনুযায়ী গতকাল সকালে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করে আসামিপক্ষ। পরে পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন করে রাষ্ট্রপক্ষ। আসামি পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম ও আহসানুল হক হেনা। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে কৌঁসুলি সুলতান মাহামুদ নিমন, তুরিন আফরোজ ও জেয়াদ আল মালুম যুক্তিতর্ক তুলে ধরেন।
ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীরা ট্রাইব্যুনালে এসে মিথ্যা বলেছেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী পাকিস্তানপন্থি রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগের নেতা ছিলেন। কিন্তু ১৯৭১ সালের আগ পর্যন্ত তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তা প্রমাণে রাষ্ট্রপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে। আসামিপক্ষের অপর আইনজীবী আহসানুল হক হেনা বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের জবানবন্দিতে অসঙ্গতি রয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) বিনা নোটিশে ইচ্ছামতো সাক্ষী বানিয়েছেন। নিজেই জবানবন্দি নিয়েছেন, আবার নিজেই লিখেছেন। সালাহউদ্দিন কাদের নির্দোষ।
এরপর ফখরুল ইসলাম আইনি বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন, এটা মিথ্যা মামলা। সাক্ষীরা এখানে এসে মিথ্যা বলেছে। ১৯৭১ সালে সালাহউদ্দিন কাদেরকে তারা দেখেনি। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ থেকে ১৯৭৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশে ছিলেন না। এটা আমরা দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করতে পেরেছি। রাষ্ট্রপক্ষ জেরাকালে সালাহউদ্দিন কাদেরকে প্রশ্ন করেছিল, তিনি বেনামে ও বেআইনিভাবে ১৯৭৪ সালে দেশে এসেছিলেন। এ প্রশ্নের মাধ্যমে তারা স্বীকার করে নিয়েছেন যে, ১৯৭১ সালে সালাহউদ্দিন কাদের দেশে ছিলেন না। ১৯৭৪ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন। আমরা মিথ্যা মামলা থেকে সালাহউদ্দিন কাদেরের অব্যাহতি প্রার্থনা করছি।
এরপর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি সুলতান মাহমুদ। তিনি বলেন, আসামিপক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্য-প্রমাণে অসঙ্গতি রয়েছে। এরপর আইনি বিষয়ে পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন করেন কৌঁসুলি তুরিন আফরোজ। তিনি ও অপর কৌঁসুলি জেয়াদ আল মালুম সালাহউদ্দিন কাদেরের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রার্থনা করেন।
এ সময় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ট্রাইব্যুনালকে বলেন, বিভিন্ন সময়ে আমার উপর দয়া করেছেন এজন্য আমি কৃতজ্ঞ। এই পৌনে তিন বছরে আমি আমার এবং আপনাদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে বুঝতে পেরেছি। এ সময় বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আমরা আপনাকে কোনো দয়া করিনি। আইন যেটুকু অনুমতি দেয় তাই করেছি।
মামলার বিচারিক কার্যক্রম
২০১০ সালের ২৬ জুলাই সালাহউদ্দিন কাদেরের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়। গাড়ি পুড়িয়ে যাত্রী হত্যার এক মামলায় ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বর তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর ১৯ ডিসেম্বর যুদ্ধাপরাধের অভিযোগেও তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। প্রসিকিউশন ২০১১ সালের ৪ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। ২০১২ সালের ৪ এপ্রিল হত্যা, গণহত্যা, অপহরণ, নির্যাতনের ২৩টি অপরাধের ওপর ভিত্তি করে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে তদন্ত কর্মকর্তা মো. নূরুল ইসলামসহ মোট ৪১ জন সাক্ষী। আর তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেয়া চারজন সাক্ষীর জবানবন্দি সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে ট্রাইব্যুনাল। অন্যদিকে এ মামলায় সালাউদ্দিন কাদেরের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দিয়েছেন তিনি নিজেসহ মোট চারজন। অন্য তিনজন হলেন তার কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু নিজাম আহমেদ, এশিয়া-প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য কাইয়ুম রেজা চৌধুরী এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত আব্দুল মোমেন চৌধুরী। ২৮ থেকে ৩১ জুলাই যুক্তি উপস্থাপন করে রাষ্ট্রপক্ষ। ১ আগস্ট থেকে ১৪ আগস্ট সাত কর্ম দিবসে যুক্তি উপস্থাপন করে আসামিপক্ষ।