রাজস্ব আদায় আর রেমিট্যান্সে অব্যাহত অগ্রগতি

গত চার বছরে দেশের অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায় ও রেমিট্যান্স আয়। রেমিট্যান্স আয় বাড়ার ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এ সরকারের আমলে ১০ বিলিয়ন ডলার থেকে প্রায় সাড়ে ১৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি টাকার মানও ডলারের বিপরীতে শক্তিশালী হয়েছে। আর রাজস্ব আয় বাড়ায় চার বছরের ব্যবধানে দেশের উন্নয়ন ব্যয় ২৩ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫৫ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া বিশ্বমন্দার মধ্যেও বড় অঙ্কের রফতানি আয় ও ৬ শতাংশের উপরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করাও এ সময়ের বড় অর্জন বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর বড় সফলতা এসেছে রাজস্ব আদায়ে। সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাজস্বের লক্ষ্য ঠিক করেছিল সাড়ে ৫৪ হাজার কোটি টাকা। চার বছরের ব্যবধানে সরকার রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা টেনে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকায় নেয়ার সাহস দেখাতে পেরেছে। টানা তিন অর্থবছর পর কেবল সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা থেকে খানিকটা পিছিয়ে রয়েছে রাজস্ব আদায়। এই সময়ে ১ লাখ ১২ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর আগের তিন অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা কেবল অর্জন নয়, অতিক্রমও করতে সমর্থ হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সরকারের গত চার বছরে প্রত্যক্ষ কর বা আয়কর আদায়ও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। চলতি অর্থবছরে কেবল ৪৮ হাজার ৩০০ কোটি টাকা আসবে আয়কর খাত থেকে। রাজস্ব বাড়াতে সরকারের নানামুখী উদ্যোগ লক্ষ্য করা গেছে গত চার বছরব্যাপী। রাজস্ব বাড়াতে বিভিন্ন বিভাগের সাথে আন্তঃসম্পর্ক আগের তুলনায় বেড়েছে। করদাতাদের হয়রানি কমিয়ে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর কৌশল লক্ষ্য করা গেছে। এই সময়ে রাজস্ব কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে জনবল। করের আওতা নিয়ে যাওয়া হয়েছে উপজেলা এমনকি গ্রাম পর্যায়েও। কর প্রদান প্রক্রিয়া সহজ করতে অনলাইনে টিআএন পূরণ ও রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তবে রাজস্বের এত বড় সফলতার পরও অর্থমন্ত্রী মনে করেন কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব সরকারের ঘরে আনা যাচ্ছে না। তিনি মনে করেন, দেশের অর্থনীতির আকার অনুযায়ী ৬০ লাখ লোকের কর দেয়া উচিত। কিন্তু গত বছর কর দিয়েছেন মাত্র ১৩ লাখ লোক। এছাড়া যে পরিমাণ ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে তার সিকিভাগও যথানিয়মে ভ্যাট দিচ্ছে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। অতি বা অবমূল্যায়নের মাধ্যমে আমদানি বা রফতানি পর্যায়ে শুল্কও ফাঁকি বন্ধ করা যায়নি। তবে এনবিআরের পুরো কার্যক্রমকে অটোমেশনের আওতায় আনা গেলে রাজস্ব আদায় বর্তমানের তুলনায় কয়েকগুণ বাড়ানো যাবে বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশের রেমিট্যান্স আয় ছিল ৯ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার, যা চলতি অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ১৪ দশমিক ৪৬১ বিলিয়ন ডলারে। বর্তমানে দেশের রেমিট্যান্সের পরিমাণ আমাদের মোট জিডিপি’র ১০ শতাংশের বেশি, রফতানি আয়ের অর্ধেকের বেশি এবং প্রাপ্ত বৈদেশিক সাহায্যের প্রায় ১০ গুণ। এদিকে রেমিট্যান্স আয় বাড়ার পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগে কম খরচে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে লোক পাঠানোর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এসবের ফলে বর্তমানে রেমিট্যান্স প্রবাহের দিক দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বে সপ্তম এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। তবে কয়েকটি বড় শ্রমবাজারে শ্রমিক রফতানির পথ অনেকটাই বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আগামীতে রেমিট্যান্স আয় ধরে রাখার ব্যাপারে কিছুটা শঙ্কাও রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে কৃষিতে ঋণ বিতরণের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে ব্যাংক খাতের জন্য কৃষি ঋণ বিতরণ হয়েছে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। আর গত অর্থবছরে এ খাতে ঋণ দেয়া হয়েছে ১৪ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা। কৃষকদের জন্য ১০ টাকায় অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ দিয়ে তাদেরকে ভর্তুকি দেয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। এসবের ফলে দেশের গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কৃষি উত্পাদনে বড় ধরনের সফলতা দেখা গেছে। ফলে এখন আর চাল আমদানি করতে হচ্ছে না। চার বছর আগের তুলনায় বর্তমানে খাদ্য উত্পাদন প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে ৩ কোটি ৬১ লাখ মেট্রিক টন হয়েছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য মজুদ করাও সম্ভব হয়েছে। তবে অনেক ফসলেই কৃষকরা সঠিকভাবে দাম না পাওয়ায় কিছুটা দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে। এদিকে কৃষি উত্পাদনের ফলে গ্রামীণ চাহিদা বেড়েছে এবং সে কারণে অকৃষি খাতেও যথেষ্ট উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সার্বিকভাবে বিশ্বব্যাপী মন্দা সত্ত্বেও গত চার অর্থবছরে (অর্থবছর ১০ থেকে ১৩) দেশে গড়ে ৬ দশমিক ২৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষিত ফলাফল দারিদ্র্য নিরসনের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব রাখতে পেরেছে। এদিকে বিশ্বব্যাপী মন্দা সত্ত্বেও দেশের রফতানি আয় বেড়েছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যে দেখা গেছে, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশের রফতানি আয় ছিল ১৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার, যা গত অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ২৭ বিলিয়ন ডলারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, দেশে চলমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সত্ত্বেও ধারাবাহিকভাবেই বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী গত সোমবার পর্যন্ত রিজার্ভের পরিমাণ সাড়ে ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৯-১০ অর্থবছরে যাত্রা শুরু হয় ১০ দশমিক ৭৪৯ বিলিয়ন ডলার দিয়ে।