‘আমাদের সময় ফিক্সিং ছিল না’

নিজে এক সময় ক্রিকেট খেলেছেন। ক্রীড়া সংগঠক হিসেবেও এক সময় কাজ করেছেন। ফলে ক্রিকেট খেলাটির ওপর একটা ভালোবাসার টান তাঁর আছেই। সেই আবেগের জায়গা ক্রিকেটের কালিমামুক্তির দায়িত্ব নিয়েই এবার কাজ শুরু করতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের গঠন হতে যাওয়া ডিসিপ্লিনারি প্যানেলের চেয়ারম্যান মাহমুদুল আমিন চৌধুরী। গতকাল বিকালে এই ফিক্সিং কেলেঙ্কারির প্রসঙ্গ আলোচনায় আসতে একটু ব্যথিত হয়েই নিজের খেলোয়াড়ী জীবন ও সংগঠক জীবনের কথা মনে করলেন দেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় এই সাবেক বিচারক। এখনকার এসব ফিক্সিং কাণ্ডের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘আমাদের সময় এসব ফিক্সিং ছিল না। ম্যাচ পাতানোর ঘটনাও সেভাবে ছিল না। ফলে এই ফিক্সিং জাতীয় ঘটনাগুলো আমার জন্য একেবারে নতুন।’ আসলে শুধু মাহমুদুল আমিন চৌধুরীর জন্য নয়; সারা দুনিয়ায়ই এই এক নতুন সংকটের সামনে পড়েছে। ম্যাচ ফিক্সিং ক্রিকেটে বেশ কিছুদিন ধরেই শিকড় গাড়লেও এই স্পট ফিক্সিং, ব্র্যাকেট ফিক্সিং; একটার পর একটা নিত্যনতুন অপরাধ এসে খেলাটাকে গ্রাস করতে শুরু করেছে। ফলে বাংলাদেশসহ ক্রিকেট খেলুড়ে প্রতিটি দেশই পড়েছে এক আইনের সংকটে। প্রচলিত আইনে এসব অপরাধের সুনির্দিষ্ট বিচারের বিধান এখনও নেই। ফলে প্রায় প্রত্যেকটি টেস্ট খেলুড়ে দেশ এখন এ বিষয়ক নতুন ফৌজদারি আইন করার পথে হাঁটছে; ইতিমধ্যে ভারতের আইন মন্ত্রণলায় ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় একটি খসড়া আইন প্রণয়নের দুয়ারে পৌঁছে গেছে। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগকে কাঁপিয়ে দেয়া ফিক্সিং কেলেঙ্কারির বিচারের চূড়ান্ত দায়িত্ব নিয়ে গঠন হতে যাওয়া প্যানেলের চেয়ারম্যান মাহমুদুল আমিন চৌধুরীও মানছেন, নতুন আইন প্রণয়নের আসলে সময় হয়ে গেছে। তিনি বলছিলেন, ‘এটা তো একটু নতুন ফেনোমেনা। আমি যতোদূর জানি, বাংলাদেশেও এই ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট আইন নেই। হয়তো নতুন কিছু আইন-কানুন করতে হবে। তবে এখন তো আইসিসি এটা দেখছে।’ হ্যাঁ, আপাতত এই বিপিএলে এই ফিক্সিং কেলেঙ্কারির বিচার বিসিবির দুর্নীতি বিরোধী আইন ও আইসিসির আইন-কানুন অনুসরণ করেই হবে। বিসিবি’র দুর্নীতি বিরোধী আইন বলছে, আকসুর এই তদন্ত শেষে অভিযুক্তদের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে বিসিবি প্রথমে ডিসিপ্লিনারি প্যানেলের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেবে। ইতিমধ্যে সেই চেয়ারম্যান হিসেবে মাহমুদুল আমিন চৌধুরীর সঙ্গে প্রাথমিক কথাবার্তা সম্পন্ন করেছে বিসিবি। সাবেক এই প্রধান বিচারপতিও সম্মত হয়েছেন দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে। এখন আইন অনুযায়ী তাকেই প্যানেলের ন্যূনতম আরও ১০ জন সদস্যকে নিয়োগ দিতে হবে। প্যানেলের সদস্যরা কারা হচ্ছেন, এ নিয়ে আগ্রহের কোনো কমতি নেই। তবে প্যানেল চেয়ারম্যান বলছেন, সদস্যদের ব্যাপারে তিনি কোনো সিদ্ধান্ত এখনও নেননি, ‘আমিই প্যানেল নিয়োগ দেব, তবে সদস্যদের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তে আমি পৌঁছাইনি। কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাবও দেইনি।’ তবে গতকাল ঢাকার একটি ইংরেজী দৈনিকে ছাপা হয়েছে যে, মাহমুদুল আমিন চৌধুরী ইতিমধ্যে প্যানেলের কয়েকজন সদস্যের নাম ভেবে ফেলেছেন। বিসিবির একটি সূত্র জানালো, তারাও বেশ কিছু নাম হয়তো প্যানেল চেয়ারম্যানের কাছে প্রস্তাব করবেন। এর মধ্যে প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল হক, হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি সৈয়দ আমিরুল ইসলাম, প্রফেসর জামিলুর রেজা চৌধুরী, ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি, সাবেক জাতীয় দলের অধিনায়ক রকিবুল হাসান এবং সাবেক ক্রিকেটার ইশতিয়াক আহমেদের নাম জোরেশোরেই শোনা যাচ্ছে। এই প্যানেলই তিন সদস্যের ট্রাইবুনাল নিয়োগ দেবেন বিপিএলের দ্বিতীয় আসরে ঘটে যাওয়া ফিক্সিং কাণ্ডে যারা অভিযুক্ত তাদের বিচারের জন্য। এ ক্ষেত্রে বিসিবির দুর্নীতি বিরোধী আইনে একাধিক ট্রাইবুনাল নিয়োগের সুযোগও আছে। যেহেতু অভিযুক্ত সংখ্যা নয়জন, তাই বিসিবির একজন কর্মকর্তা ধারণা দিলেন, একাধিক ট্রাইবুনাল গঠন করে দ্রুত বিচার শেষ করার সম্ভাবনাই বেশি। প্যানেল চেয়ারম্যান হিসেবে মাহমুদুল আমিন চৌধুরীর সুযোগ আছে যে কোনো একটি ট্রাইবুনালের চেয়ারম্যান হওয়ার। কিন্তু পত্রিকান্তরে তিনি পরিষ্কার বলেছেন, যেহেতু এ বিষয়ে আপিলের নিষ্পত্তিও তাকে করতে হবে, তাই তিনি ট্রাইবুনালে থাকতে চান না। শেষ পর্যন্ত ট্রাইবুনাল কয়টি হবে, চেয়ারম্যান কে বা কারা হবে এবং প্যানেলের সদস্য কারা হচ্ছেন; এগুলো জানতে আরও একটু অপেক্ষা করতে হবে। তবে একটা ব্যাপার এখনই বলা যায়, এই প্যানেল ক্রিকেটকে শুদ্ধ করতে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে একটা উদাহরণ তৈরি করতে চান। অন্তত খেলাটির প্রতি প্যানেল চেয়ারম্যানের ভালোবাসা সেই ইঙ্গিতই দেয়, ‘আমি নিজে এক সময় খেলেছি। সিলেটে ক্রীড়া সংস্থার সঙ্গেও ছিলাম অনেক বছর। ফলে ক্রিকেট নিয়ে আমার একটা আবেগের জায়গা আছে।’