ভাঙ্গা ঘরে চাঁদের আলো

সংগ্রাম করে যশোরের তারিন জিপিএ-৫ অর্জন করলেও মসৃণ নয় উচ্চশিক্ষার পথ, ডোমারের মেধাবী ছাত্র পাপলুর আদর্শ শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন আদৌ পূরণ হবে কিনা তা নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা, গোবিন্দগঞ্জে ভিক্ষুকের পুত্র খোকন পেয়েছে জিপিএ-৫, দারিদ্র্যের কারণে কলাপাড়ার্ মেধাবী মিনারার উচ্চশিক্ষা অনিশ্চিত। এদিকে জিপিএ-৫ পেয়ে আঁধার ঘরে আলো জ্বালিয়েছে মিরসরাইয়ের শাহাদাত। এসব মেধাবী মুখের খবর তুলে ধরেছেন আমাদের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা। ডোমার (নীলফামারী): ডোমার উপজেলা থেকে একমাত্র জিপিএ-৫ পাওয়া পাপলু কোনদিনই তার বাবা-মায়ের আদর ভালোবাসা পায়নি। অভাব ছিল তার নিত্যসঙ্গী। মায়ের গর্ভে থাকাবস্থায় তার বাবা মা ও এক ভাই-বোনকে রেখে ঢাকায় চলে যায় এবং সেখানে গিয়ে আরেকটি বিয়ে করে নতুন সংসার পাতেন। পাপলুর মা সংসার চালাতে ঝিয়ের কাজ শুরু করেন। তখন থেকেই পাপলু থাকে তার নানীর কাছে। এভাবেই কষ্ট করে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় ডোমারে সে একমাত্র জিপিএ-৫ পেয়েছে। পাপলু জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে একজন আদর্শ শিক্ষক হয়ে দেশের শিক্ষা বিস্তারে কাজ করতে চাই। কিন্তু উচ্চশিক্ষা গ্রহণের খরচ আমার দরিদ্র মা, ভাই, গার্মেন্টস কর্মী বোন, বৃদ্ধা নানী কারোই পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। তাই সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি বা কোন প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসলে পাপলুর সে স্বপ্ন পূরণ হতে পারে। যশোর: দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন যশোরের মেধাবী শিক্ষার্থী রাবেয়া শারমিন তারিন। এসএসসির মতো এইচএসসিতেও কৃতিত্বপূর্ণ ফল অর্জন করতে পেরে গর্বিত তারিন আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়ে বিচারক হতে চান। যদিও তার এই উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পথ মসৃণ নয়, তারপরও সংগ্রাম করে সাফল্যের স্বর্ণশিখরে পৌঁছাতে চান তিনি। রাবেয়া শারমিন তারিন যশোর শহরের পুরাতন কসবা ঢাকা রোড এলাকার মৃত মিজানুর রহমান ও শাহিনারা বেগমের মেয়ে। তারিন এ বছর যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে মানবিক বিভাগে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছেন। তারিন জানান, বাবার অবর্তমানে মায়ের চাকরির সামান্য উপার্জনের উপর নির্ভরশীল তাদের তিন ভাইবোনের পরিবার। বড় বোন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিন্যান্সে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন। আর ছোট ভাই যশোর জিলা স্কুলের ছাত্র। এর মধ্যে তারিনকেও উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে মানুষের মতো মানুষ করে তোলার স্বপ্ন দেখেন তার মা। গোবিন্দগঞ্জ (গাইবান্ধা): গোবিন্দগঞ্জে অদম্য ইচ্ছা আর কঠোর পরিশ্রমে দারিদ্র্যকে জয় করে ভিক্ষুকের পুত্র খোকন চন্দ্র পেয়েছে জিপিএ-৫। তালুককানুপুর গ্রামের পঙ্গু ভিক্ষুক বাবা অনিল বর্মন শহরের দোকানে দোকানে ভিক্ষা করে যা পায় তাই দিয়ে সংসার চলে। মা সন্ধ্যা রানী অন্যের বাড়িতে কাজ করে। দারিদ্র্যের কারণে পিতামাতা ঠিকমত পড়াশুনার খরচ দিতে না পারায় খোকন পড়াশুনার পাশাপাশি অন্যের জমিতে কৃষি শ্রমিকের কাজ করতো। তাই জিপিএ-৫ পেয়ে সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে খোকন। তার ইচ্ছা পড়াশুনা শেষ করে ব্যাংকার হয়ে দেশের মানুষের সেবা করা। কলাপাড়া (পটুয়াখালী): সহপাঠীদের কাছ থেকে ধার করা বই এনে জিপিও-৫ পেয়েছে মিনার। প্রবল আগ্রহ ও মনোবল থাকা সত্ত্বেও দারিদ্র্যের কারণে তার উচ্চশিক্ষা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। উপজেলার আলহাজ্ব জালালউদ্দিন কলেজ থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এই সফলতা পেলেও মিনারার সফলতায় নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছে হতদরিদ্র এই পরিবারটি। তাদের একটাই চিন্তা যেখানে তিনবেলা খাবারই জোটে না সেখানে কি করে মিনারার উচ্চশিক্ষার খরচ যোগাবে। বর্তমানে সে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করতে চায়। কিন্তু কোথায় পাবে সেই টাকা। ফলে দেশের বিত্তশালীদের সহায়তা ছাড়া এই মেধাবীর উচ্চ শিক্ষা অনিশ্চিত। মিরসরাই (চট্টগ্রাম): বাবা আবুল বশর থেকেও নেই। ৫ বছর আগে অন্যত্র বিয়ে করে স্ত্রী ছেলে-সন্তানদের ফেলে চলে গেছে। সে থেকে মা নূরজাহান বেগম মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে এখন পাগলপ্রায়। বাসায় বাসায় টিউশনি করে পুরো সংসারের সবকিছুর যোগান তাকেই দিতে হয়। তারপরও শাহাদাত মিরসরাই ডিগ্রী কলেজ থেকে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে। এসএসসিতেও সে জিপিএ-৫ পেয়েছিল। শাহাদাত তার ভবিষ্যত্ সম্পর্কে জানান, দেশের ভাল কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করবো। পড়াশুনা শেষ করে একজন আদর্শ শিক্ষক হতে চাই।