ঝিনাইদহে সম্ভাব্য প্রার্থীরা মাঠে নেমে গেছেন

ঝিনাইদহ জেলাতে আগামী সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীরা মাঠে নেমে গেছেন। রমজান মাস জুড়ে তারা ইফতার পার্টির মাধ্যমে গণসংযোগ চালান। চলে মোটরসাইকেলে শো-ডাউন। সম্ভাব্য প্রার্থীরা ইফতারের আগে রাজনৈতিক বক্তব্য রাখেন। দেয়ালে দেয়ালে তাদের সুদৃশ্য পোস্টার ও বিলবোর্ড শোভা পায়। সকলেই নানাভাবে জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষও আলোচনা করছেন। এখন আলোচ্য বিষয় হলো- কারা হচ্ছেন বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থী। খুব স্বাভাবিকভাবেই বর্তমান ও সাবেক সংসদ সদস্যদের কর্মকাণ্ডও আলোচনায় স্থান পাচ্ছে। ঝিনাইদহ-১ আসনে (শৈলকুপা উপজেলা) বিএনপি ও আওয়ামী লীগে গ্রুপিং আছে। এ আসনে এবার আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা হচ্ছেন বর্তমান সংসদ সদস্য এবং মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী আব্দুল হাই, শৈলকুপা উপজেলা চেয়ারম্যান নায়েব আলি জোয়ার্দ্দার, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবেদ আলি ও সাবেক যুগ্ম সচিব মির শাহাবুদ্দিন। দলের ভিতর গ্রুপিং আছে। গ্রুপিংয়ের প্রভাব দলের তৃণমূল পর্যন্ত দৃশ্যমান। গত সাড়ে ৪ বছরে গ্রামে গ্রামে আওয়ামী লীগের সমর্থক সামাজিক দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন কর্মী নিহত এবং দুই শতাধিক আহত হয়েছে। একইভাবে বিএনপি’র মধ্যেও তীব্র গ্রুপিং আছে। দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা হচ্ছেন সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল ওহাব, এডভোকেট আসাদুজ্জামান আসাদ, জয়ন্ত কুমার কুন্ডু ও ওসমান আলি। তারা সবাই রমজান মাস জুড়ে গণসংযোগ চালান। প্রত্যেকেই সমর্থক নেতাকর্মীদের বোঝানোর চেষ্টা করছেন তিনিই দলের মনোনয়ন পাবেন। জাতীয় পার্টির (এরশাদ) সম্ভাব্য প্রার্থী মনিকা আলম। এ আসনে ১৯৭৩ সালে ডা. কাজী খাদেমুল ইসলাম (আওয়ামী লীগ), ১৯৭৯ সালে গোলাম মোস্তাফা (জাসদ), ১৯৮৬ সালে অধ্যক্ষ মো. কামরুজ্জামান (আওয়ামী লীগ), ১৯৮৮ সালে দবিরউদ্দিন জোয়ার্দ্দার (জাসদ), ১৯৯১ সালে ও ১৯৯৬ সালে আব্দুল ওহাব (বিএনপি), ২০০১ সালে ও ২০০৮ সালে আব্দুল হাই (আওয়ামী লীগ) নির্বাচিত হন। ঝিনাইদহ-২ আসনেও (ঝিনাইদহ সদর ও হরিণাকুন্ডু উপজেলা) ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপি’র মনোনয়ন প্রত্যাশীরা তত্পরতা শুরু করেছেন। এবার মনোনয়ন নিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যে তীব্র গ্রুপিং চলছে। এ পর্যন্ত ছয়জন মনোনয়ন প্রত্যাশীর নাম জানা গেছে। তারা হচ্ছেন বর্তমান সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম অপু, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট আজিজুর রহমান, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান কনক কান্তি দাস, ঝিনাইদহ পৌর মেয়র সাইদুল করিম মিন্টু, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নাসের শাহরিয়ার জাহেদী মহুল ও এডভোকেট আব্দুর রশিদ। বর্তমানে সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম অপু ও উপজেলা চেয়ারম্যান কনক কান্তি দাসের মধ্যে তীব্র গ্রুপিং চলছে। পৌর মেয়র সাইদুল করিম মিন্টুর সঙ্গেও উপজেলা চেয়ারম্যানের সম্পর্ক শীতল। সকলেই নিজের মতো করে মনোনয়ন লাভের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে সামগ্রিকভাবে দলের সাংগঠনিক তত্পরতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ২০০৫ সালে জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয়। আট বছর দলের কাউন্সিল হয় না। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার সম্মেলনও ১৪ বছর হয় না বলে জানা গেছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দলের এই বিভক্তি ইউনিয়ন হয়ে গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। তৃণমূল পর্যায়ে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। দলের কর্মীদের মাঝে ক্ষোভ ও অভিমানের সৃষ্টি হচ্ছে। হরিণাকুন্ডু উপজেলা আওয়ামী লীগও দুই শিবিরে বিভক্ত। এক গ্রুপে আছেন উপজেলা আহবায়ক মশিউর রহমান জোয়ার্দ্দার। তার প্রতিদ্বন্দি গ্রুপে আছেন যুগ্ম আহবায়ক আফজাল হোসেন। সাবেক ছাত্র নেতা বিশিষ্ট শিল্পপতি নুরে আলম সিদ্দিকীর বড় ছেলে তাহজীব আলম সিদ্দিকী সমি ঝিনাইদহের রাজনীতিতে নামার চেষ্টা করছেন। খেলাধুলা ও অন্যান্য কর্মসূচির মাধ্যমে লাইম লাইটে আসতে তত্পর তিনি। আগামী নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় তার নামও শোনা যাচ্ছে। ঝিনাইদহ-২ আসনে এখন পর্যন্ত সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপি’র মসিউর রহমান দলের একক সম্ভাব্য প্রার্থী। এ আসনে দলের মধ্যে তিনি প্রকাশ্য কোন গ্রুপিং সৃষ্টি হতে দেননি। বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনগুলো বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে চলেছে। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার পশ্চিমাংশে ও হরিণাকুন্ডু উপজেলায় জামায়াতের শক্ত অবস্থান আছে। তারাও ১৮ দলীয় জোটের কাছে এ আসনে মনোনয়ন চাইতে পারে বলে জানা যায়। জাতীয় পার্টির (এরশাদ) প্রার্থী এক রকম ঠিক হয়ে গেছে। কিছু দিন আগে দলের মহাসচির রুহুল আমিন হাওলাদার ঝিনাইদহ সফর কালে এনজিও সৃজনী বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. হারুন অর রশিদের নাম ঘোষণা করে যান। এ আসনে ১৯৭৩ সালে নূরে আলম সিদ্দিকী (আওয়ামী লীগ), ১৯৭৯ সালে মাওলানা নুরুন্নবী সামদানী (আইডিএল), ১৯৮৬ সালে আনোয়ার জাহিদ (জাতীয় পার্টি), ১৯৮৮ সালে আশরাফুল আবেদীন আশা (জাতীয় পার্টি), ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে মশিউর রহমান (বিএনপি) এবং ২০০৮ সালে শফিকুল ইসলাম অপু (আওয়ামী লীগ) নির্বাচিত হন। ঝিনাইদহ-৩ আসনে (মহেশপুর ও কোটচাঁদপুর উপজেলা) আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র মধ্যে গ্রুপিং রয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দল দুটির তৃণমূল পর্যন্ত। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হচ্ছেন বর্তমান এমপি শফিকুল আজম খান চঞ্চল, সাজ্জাতুজ জুম্মা, অধ্যক্ষ নবী নেওয়াজ ও মহেশপুর উপজেলা চেয়ারম্যান ময়েজ উদ্দিন হামিদ। এ আসনে বিএনপি’র গ্রুপিং বড় বেশি দৃশ্যমান। দলের উপজেলা সভাপতি শহিদুল ইসলাম মাস্টার সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিনকে নির্বাচনের সময় পর্যন্ত বহিষ্কার করেছেন। বিএনপি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হচ্ছেন শহিদুল ইসলাম মাস্টার, জাসাস নেতা মনির খান ও মহিলা দল নেত্রী শেলী সুলতানা জামান। তারা সকলেই মনোনয়ন পেতে তত্পরতা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে। জাতীয় পার্টির (এরশাদ) আব্দুর রহমান মনোনয়ন প্রত্যাশী বলে জানা গেছে। জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী হচ্ছেন অধ্যাপক মতিয়ার রহমান। এ আসনে ১৯৭৩ সালে ময়েজ উদ্দিন মিয়াজী (আওয়ামী লীগ), ১৯৭৯ সালে মাওলানা মোজাম্মেল হক (আইডিএল), ১৯৮৬ সালে মাওলানা মোজাম্মেল হক (জামায়াত), ১৯৮৮ সালে শামসুল হুদা খান (জাতীয় পার্টি), ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে শহিদুল ইসলাম মাস্টার (বিএনপি) এবং ২০০৮ সালে শফিকুল আজম খান চঞ্চল (আওয়ামী লীগ) নির্বাচিত হন। ঝিনাইদহ-৪ আসনে (কালীগঞ্জ উপজেলা ও ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ৪টি ইউনিয়ন) আওয়ামী লীগ ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপি’র মধ্যে তীব্র অভ্যন্তরীণ কোন্দল চলছে। কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সংসদ সদস্য আব্দুল মান্নানের সঙ্গে কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক উপজেলা চেয়ারম্যান আনোয়ারুল আজিম আনারের সম্পর্ক ভাল নয়। তাদের দ্বন্দ্ব তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষ চলছে। গত চার মাসে চারজন দলীয় কর্মী দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেরে খুন হয়েছে। আহতও হয়েছে অনেক। এই আসনে আওয়ামী লীগের মনোয়ন প্রত্যাশীরা হচ্ছেন বর্তমান সংসদ সদস্য আব্দুল মান্নান, উপজেলা চেয়ারম্যান আনোয়ারুল আজিম আনার ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম ঠান্ডু। এ আসনে বিএনপি’র মধ্যেও তীব্র গ্রুপিং চলছে। দু’গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। বিএনপি’র সম্ভাব্য প্রার্থী হচ্ছেন সাবেক সংসদ সদস্য শহিদুজ্জামান বেল্টু, কালীগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র মাহবুবুর রহমান ও আব্দুল হামিদ। এ আসনে জাতীয় পার্টির (এরশাদ) প্রার্থী আব্দুল কাদের। ১৯৭৩ সালে জেকেএমএ আজিজ (আওয়ামী লীগ), ১৯৭৯ সালে এবাদত হোসেন মন্ডল (বিএনপি), ১৯৮৬ সালে আব্দুস সাত্তার (জাতীয় পার্টি), ১৯৮৮ সালে মুক্তিযোদ্ধা মো. নুরুদ্দিন, ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে শহিদুজ্জামান বেল্টু (বিএনপি) ও ২০০৮ সালে আব্দুল মান্নান (আওয়ামী লীগ) এ আসনে নির্বাচিত হন।