রাজধানীতে বাসায় স্ত্রীসহ পুলিশ ইন্সপেক্টর খুন
প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০১৩, ২৩:০১
রাজধানীর চামেলীবাগের ভাড়া বাসায় পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমান (৪৯) ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমান (৪২) খুন হয়েছেন। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় পুলিশ বাসার তালা ভেঙ্গে তাদের লাশ উদ্ধার করে। ঘটনার পর থেকে ওই দম্পতির বড় মেয়ে ঐশি (১৭) ও গৃহকর্মী (১০) নিখোঁজ রয়েছেন। ঐশির কক্ষের বাথরুম থেকে চাদর দিয়ে প্যাঁচানো অবস্থায় লাশ দু’টি উদ্ধার করা হয়। দু’জনের শরীরেই উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতের চিহ্ন রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ২ নম্বর চামেলীবাগের বহুতল ভবনের ৬ষ্ঠ তলার বি-৫ নম্বর ফ্ল্যাটে এই দম্পতিকে খুন করা হয়। বুধবার গভীর রাতে যে কোন সময় এই খুনের ঘটনা ঘটতে পারে। ঘটনার পরদিন সকালে ছোট ভাই ঐহী (৭) ও গৃহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে ফ্লাট ছাড়েন দম্পতির একমাত্র মেয়ে ঐশি। ছোট ভাইকে বাসায় পাঠিয়ে দিলেও ঐশি নিখোঁজ রয়েছেন। পুলিশ এখন তাকে খুঁজছে। পুলিশের ধারণা হত্যাকান্ড নিয়ে ঐশি অবগত। পুলিশ দুই জন দারোয়ান ও একজন ম্যানেজারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে।
গতকাল শুক্রবার দুপুরে দম্পতির ছোট ছেলে ও মাহফুজুরের শ্যালক রবিউল ইসলাম বাসায় এসে দরোজা তালাবন্ধ দেখে পুলিশের খবর দেন। পরে পুলিশ গিয়ে দরোজা ভেঙে লাশ উদ্ধার করে। ঘটনার পর সিআইডি’র ক্রাইমসিন শাখার সদস্য হত্যার আলামত সংগ্রহ করেছে। এ ব্যাপারে পল্টন থানার ওসি গোলাম সারোয়ার জানান, উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করেই তাদের হত্যা করা হয়েছে। তবে কারা এবং কেন এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়েছে তা তদন্ত করা হচ্ছে।
ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমান ১৯৮৯ সালে সাব-ইন্সপেক্টর হিসাবে পুলিশে যোগদান করেন। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে তার বাড়ি। সর্বশেষ তিনি এসবি’র রাজনৈতিক শাখায় ইন্সপেক্টর হিসাবে কর্মরত ছিলেন। তার মেয়ে ঐশি রাজধানীর অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনালে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ও’ লেভেলের ছাত্রী। আর ছেলে ঐহি রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স স্কুল এন্ড কলেজের ২য় শ্রেণির ছাত্র।
পুলিশের বিশেষ শাখার উপ-মহাপরিদর্শক মোশারফ হোসেন ভূঁইয়া ইত্তেফাকে জানান, বুধবার রাত ১১ টার দিকে মাহফুজুর রহমান অফিস করে বাসায় ফেরেন। ওই রাতেই সম্ভবত এই ঘটনা ঘটে। পুলিশের এই কর্মকর্তা আরো জানান, ঘটনার পরদিন বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে ঐশি তার ছোট ও গৃহকর্মীকে নিয়ে ফ্লাট ত্যাগ করেন। এ সময় তিনি ছোট ভাইকে বলেন, বাবা-মা নিজেরা রাগারাগি করে বাসা থেকে চলে গেছে তাই আমরাও খালার বাসাই যাই।
ওই ভবনের সিকিউরিটি গার্ডদের ম্যানেজার আমজাদ হোসেন বলেন, দু’টি ব্যাগ, গৃহকর্মী ও ছোট ভাইকে নিয়ে ঐশি বের হওয়ার সময় গার্ড শাহিন তাকে যেতে বাঁধা দেয়। কারণ গত ৪ আগষ্ট ভাড়া দেয়ার সময় স্বপ্না তাকে বলেছিল, মেয়ের মতি-গতি ভালো লাগছে না, একা বাইরে যাওয়ার সময় যেন অবশ্যই তাকে (স্বপ্না) ফোন করা হয়। এ সময় স্বপ্না তার মোবাইল ফোন নাম্বারটি ম্যানেজারকে দেন। স্বপ্নার কথা অনুযায়ি দারোয়ান শাহিন তাদের আটকে ম্যানেজারকে জানায়। ম্যানেজার তখন স্বপ্নার মোবাইলে ফোন দেন। ফোনটি রিসিভ করার পর স্বপ্না তাদের যাওয়ার অনুমতি দেন। আসলে সেই ফোনটি স্বপ্না ধরেনি। ধরেছিল ঐশি নিজেই। আর কণ্ঠ পরিবর্তন করে মায়ের মতো করে সাইডে গিয়ে কথা বলে। বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর এই ফোন দিয়েই ঐশি বৃহস্পতিবার রাত ৩টায় তার খালুকে ফোন করেন।
পুলিশের বিশেষ শাখার উপ-মহাপরিদর্শক মোশারফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ঐশি তার খালুকে ফোন করে বলেন, বাবা-মা রাগ করে বাসা থেকে চলে গেছে, তাই ছোট ভাইকে নিয়ে তিনি তাদের বাড়িতে যাবেন। এরপর থেকে ওই মোবাইল ফোনটি বন্ধ ছিল। গতকাল শুক্রবার দুপুরে ঐশি কাকরাইল মোড় থেকে একটি সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া করে তার ছোট ভাই ঐহিকে নিজেদের বাসায় পাঠিয়ে দেয়। আগের রাতে তারা কোথায় ছিল সে কথা অবশ্য ঐহী বলতে পারেনি। তবে পুলিশ মোবাইল ফোন ট্রাকিং করে জানতে পেরেছে তারা গেন্ডারিয়া এলাকায় অবস্থান করেছে। ঐশির ফোন পাওয়ার পর গতকাল সকালে তার খালু মামা রবিউলকে বিষয়টি জানিয়ে খোঁজ নিতে বলেন। রবিউল দুপুরে মাহফুজুরের বাসার নিচে গিয়ে দেখেন ঐহী বসে আছে। সে মামাকে জানায়, আপু তাকে একটি সিএনজিতে করে পাঠিয়ে দিয়েছে। বাসা তালাবন্ধ থাকায় কেউ তখন বাসায় ঢুকতে পারেনি। পরে এসবিতে খবর দেন রবিউল। এরপর থানা পুলিশকে জানিয়ে সন্ধ্যায় বাসার তালা ভাঙার পর ঐশির রুমের বাথরুমে দু’জনের লাশ পাওয়া যায়।
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, ওই ফ্ল্যাটে তিনটি কক্ষ। একটিতে মাহফুজ দম্পতি, একটিতে মেয়ে ঐশি ও অন্যটিতে ঐহি থাকতেন। মাহফুজুর দম্পতির ঘরের মেঝে ও বিছানা রক্তে ভেসে আছে। সম্ভবত বিছানার ওপর তাদের খুন করে লাশে চাদর দিয়ে পেঁচিয়ে টেনে ঐশির ঘরের বাথরুমে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে মাহফুজ দম্পতির ঘরের জিনিসপত্র তছনছ করা হলেও ঐশির ঘরের জিনিসপত্র অক্ষত রয়েছে।
হত্যার ধরন দেখে পুলিশ কর্মকর্তারা ধারনা করছেন, হত্যাকান্ডে একধিক লোক অংশ নেয়। ফলে খুনিরা কীভাবে সুরক্ষিত অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকলো তা নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। অ্যাপার্টমেন্টের নিরাপত্তাকর্মীরা বলছেন, গত ৮ আগষ্টের পর থেকে পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমানের ফ্ল্যাটে কোনো অতিথি আসেননি। ঘটনাস্থলে ডিবি পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, পুরো বিষয়টিই পুলিশ তদন্ত করছে। খুব শিগগিরই হত্যাকারীরা গ্রেফতার হবে বলে আশাবাদি তিনি।