গোলাম আযমের বিচার ত্রুটিপূর্ণ ও পক্ষপাতদুষ্ট

জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর গোলাম আযমের মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে ত্রুটিপূর্ণ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নয় বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।মানবাধিকার সংস্থাটির অনলাইনে ‘বাংলাদেশ:আযম কনভিকশন বেইজড অন ফ্লড প্রসিডিংস’ শিরোনামের এক বিবৃতিতে এ কথা বলা হয়। এ মামলার রায়ে পাঁচ ত্রুটির বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এইচআরডব্লিউ। ২০১০ সালের মার্চে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংগঠনে ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা, উস্কানি, সহযোগিতা এবং হত্যা ও নির্যাতনের পাঁচটি অভিযোগ গঠন করে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গত ১৫ জুলাই এ মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে গোলাম আযমকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। রায়ে বলা হয়, অপরাধের তীব্রতা ও বিস্তার বিবেচনায় তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হয় তবে বয়স ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়নি। গত ১২ মে তার মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানিয়ে আপিল করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। এইচআরডব্লিউ’র এশীয় অঞ্চলের পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বিবৃতিতে বলেন, ১৯৭১ সালের নৃশংসতার স্বচ্ছ বিচারের বিষয়ে আমাদের সমর্থন রয়েছে। তবে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে যে আইনে বিচার হচ্ছে তার ত্রুটিগুলো আমরা ধরিয়ে দিতে চাইলেও সরকার তা আমলে নেয়নি। সরকার যে রায় চেয়েছিল তা তারা পেয়েছে। কিন্তু সবার জন্য সুবিচার নিশ্চিত করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। তবে গোলাম আযম দোষী হলে যারা অপরাধের শিকার হয়েছেন এবং তাদের স্বজনদের অবশ্যই ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। গোলাম আযমের বিচারের পাঁচ ত্রুটির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এইচআরডব্লিউ। তারা বলছে, বিচারকরা অযথার্থভাবে রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে একটি তদন্ত করেছে, আইনজীবী-বিচারকদের মধ্যে গোপন সহযোগিতা ও পক্ষপাতিত্ব ছিল, আসামির সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে, বিচারক প্যানেলে পরিবর্তন এবং গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণে তথ্য-প্রমাণের অভাব ছিল। বিবৃতিতে বলা হয়, সবচেয়ে গুরুতর সমস্যাটি হলো, গোলাম আযমের মামলায় বিচারকরা রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য-প্রমাণের ঘাটতি পূরণে একটি তদন্ত করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের বিচারকদের শুধু তাদের সামনে উপস্থাপিত উভয়পক্ষের সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। আর এ তদন্তের বিষয়ে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা কিছু জানতেন না। যার ফলে বিচারকদের বিবেচনায় আনা তথ্য-প্রমাণকে তারা চ্যালেঞ্জ করতে পারেননি। এ তদন্ত আদালতের নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। এছাড়া এ ধরনের তদন্ত ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন সিভিল এন্ড পলিটিক্যাল রাইটসের ১৪ অনুচ্ছেদের গুরুতর লঙ্ঘন। আর বাংলাদেশ এ আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের একটি পক্ষও। বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ইকোনমিস্টসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিচারকের স্কাইপ কথোপকথন নিয়ে যে বিচারিক পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছে, তার কোনো ব্যাখ্যা ট্রাইব্যুনাল দেয়নি। এ কথোপকথনের বেশিরভাগ অংশ ছিলো গোলাম আযমের মামলা কেন্দ্রিক। এসব কথোপকথনে দেখা যায়, গোলাম আযমের মামলা উপস্থাপনে রাষ্ট্রপক্ষকে বিভিন্ন সময় বিচারকরা পরামর্শ ও নির্দেশনা দিয়েছেন। এছাড়া গোলাম আযমসহ কয়েকটি মামলায় আসামিপক্ষের সাক্ষীদের ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে, আইনজীবীদের কার্যালয়ে হানা দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। আসামিপক্ষ নিরাপত্তার বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের কাছে উদ্বেগ জানালেও ট্রাইব্যুনাল কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বিবৃতির শেষাংশে অ্যাডামস আরো বলেন, গোলাম আযমের বিচারের ক্ষেত্রে সমস্যা বহুমুখী। তবে সবগুলো বিষয় বিবেচনা করলে একটি উপসংহারেই আসা যায়, আর তা হলো রাষ্ট্রপক্ষের প্রতি অনেক বেশি বিচারিক পক্ষপাতদুষ্টতা। বিচার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের মর্যাদাহানির ঘটনা ঘটেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের শিকার ব্যক্তির পরিবারের অবশ্যই ন্যায়বিচার এবং সঠিক উত্তর পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তা একমাত্র স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব।