হাওর অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পরিস্থিতি
প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০১৩, ২১:২০
দেশে স্বাস্থ্যসেবা পরিকাঠামোর ব্যাপারে প্রসার ঘটিলেও হাওর অঞ্চলের লক্ষ লক্ষ মানুষ আধুনিক ও মানসম্মত চিকিত্সা সুবিধা পান না বলিলেই চলে। অন্যান্য এলাকার ন্যায় হাওর বাঁওড় পরিবেষ্টিত উপজেলাসমূহেও অনেক ক্ষেত্রে গড়িয়া তোলা হইয়াছে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও হাসপাতাল। ইউনিয়ন পর্যায়ে আছে স্বাস্থ্যকেন্দ্র। উপজেলা হাসপাতালে আধুনিক অনেক চিকিত্সা সরঞ্জমাদিও আছে। নাই কেবল চিকিত্সক। হাওর অঞ্চলে চিকিত্সকদের পোস্টিং দেওয়া হইলেও তাহারা কর্মস্থলে থাকেন না। কালেভদ্রে গিয়া হাজিরা দিয়া আসেন মাত্র। রোগী দেখিবার তাহাদের ফুরসত্ হয় না। ডাক্তারগণের মধ্যে যাহারা একটুখানি চালাক-চতুর তাহারা উপরের কর্তাদের ধরিয়া শীঘ্রই ডেপুটেশন লইয়া জেলাসদরে কিংবা ঢাকায় চলিয়া আসেন। ইহার অর্থ পোস্টিং তাহাদের হাওর এলাকার কোনো উপজেলায় হইলেও ‘বৈধ’ পন্থায় অন্যত্র অবস্থান করেন। এই নিয়া কাহার কী বলিবার থাকিতে পারে। সম্প্রতি এতদ্বিষয়ে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত হইয়াছে একটি নাতিদীর্ঘ রিপোর্ট। উল্লেখিত প্রতিবেদন হইতে জানা যায়, কিশোরগঞ্জ জেলাধীন হাওর এলাকার ৪টি উপজেলায় চিকিত্সকের পদ রহিয়াছে ৬৫টি। ইহার মধ্যে ৪৬টিই শূন্য। ইউনিয়ন পর্যায়ের চিকিত্সা কেন্দ্রসমূহেও ডাক্তার নেই। ইটনা, নিকলি, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলার ১২ লক্ষ মানুষ অসুখ-বিসুখে সরকারি হাসপাতালের চিকিত্সকদের সেবা পাইয়া থাকেন কমই। হাসপাতালে যেইসব যন্ত্রপাতি আছে সেইগুলিরও ব্যবহার নাই। এই ক্ষেত্রে অভাব আছে টেকনিশিয়ানেরও। ইহা লইয়া স্বাস্থ্য বিভাগের জেলা বা আরও উপরের কর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন করা হইলে তাহাদের চটজলদি জবাব হাওর এলাকায় ডাক্তারগণ যাইতে চাহেন না। পোস্টিং দিলেও থাকিতে চাহেন না।
হাওর অঞ্চলের লক্ষ লক্ষ মানুষ যুগ-যুগ ধরিয়া আধুনিক চিকিত্সার ন্যূনতম সেবা হইতে বঞ্চিত থাকিয়া যাইবেন, ইহা কোনো কাজের কথা হইতে পারে না। এই সমস্যার কোনো সমাধান নাই, তাহাও মানিয়া নেওয়া যায় না। যদি চিকিত্সকই না দেওয়া যাইবে, তাহা হইলে হাওর অঞ্চলের উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন করিবারইবা কী মানে থাকিতে পারে! বাংলাদেশের বেশিরভাগটাই গ্রাম। এই দেশের এক বিরাট এলাকা হাওর পরিবেষ্টিত। বৃহত্তর সিলেট ও ময়মনসিংহ জেলায় কম করিয়া হইলেও ৪৭টি বৃহত্ হাওর রহিয়াছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বৃহদাংশ খাল-নদী পরিবেষ্টিত। এক সময় ছিল খুবই দুর্গম। এখন যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হইয়াছে। বিল, বাঁওড়, খাল-নদী পরিবেষ্টিত এলাকাসমূহেও রাস্তাঘাট হইয়াছে। যাতায়াতের অসুবিধা আগের মত নাই। অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুত্ও চলিয়া গিয়াছে। গড়িয়া উঠিয়াছে স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো। কিন্তু মন বদলায় নাই চিকিত্সকগণের। এই অবস্থার পরিবর্তন দরকার। আর পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন কঠোর নিয়ম নীতি। গ্রামাঞ্চলে এবং হাওর এলাকার দুর্গম পাহাড় জনপদের মানুষের ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করিবার জন্য নবীন চিকিত্সকদের ২ বত্সরের জন্য মফস্বল বা গ্রামাঞ্চলে থাকিবার নিয়ম আছে। সকল অবস্থায় সব পরিবেশে কর্তব্য পালনের শিক্ষা তাহাদের প্রয়োজন রহিয়াছে। এইরূপ বাধ্যবাধকতার নীতির কারণে চিকিত্সকগণের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারও সমৃদ্ধ হয়, আখেরে উহা তাহাদের নিজেদের এবং দেশের কাজে লাগে। যে চিকিত্সকদের গ্রামে বা হাওর এলাকায় পোস্টিং দেওয়া হয় তাহাদের মধ্যে কাহাকেও নানান ছলছুতায় ডেপুটেশনে শহরে নিয়া আসিবার রীতি অবশ্যই পরিহার করিতে হইবে। পাশাপাশি যেসব এনজিও স্বাস্থ্যসেবা খাতে কাজ করিয়া থাকে, তাহাদের উচিত দুর্গম হাওর অঞ্চলে চিকিত্সা সেবা কার্যক্রম সম্প্রসারিত করা। মোটকথা পল্লী এলাকা এবং হাওর বিল বাঁওড় ও নদী-খাল পরিবেষ্টিত অঞ্চলসমূহের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টির প্রতি কার্যকর মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। শহর ও গ্রাম এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য কমাইয়া আনিতে হইবে। রাতারাতি তাহা সম্ভব হইবে না, একথা সত্য। তাই বলিয়া যেমন চলিতেছে, তেমনই চলিতে দেওয়া যাইতে পারে না কিছুতেই।