বিরাজমান ইস্যু নিষ্পত্তি না হলে সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করতে দুদেশের গণমাধ্যমকে গঠনমূলক ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন ভারত-বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীরা। গতকাল ঢাকায় আয়োজিত এক মৈত্রী সংলাপে বক্তারা বলেন, ভারত-বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক দীর্ঘদিনের হলেও দুদেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দূরত্ব কমছে না। এ বিষয়ে শুধু দুদেশের সরকারের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নই নয়, দুটি দেশের মানুষের মাঝেও সম্পর্ক সৃষ্টিতে গণমাধ্যমকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। ফেলানি হত্যার বিচার, তিস্তা ও সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়া বাংলাদেশের মানুষের মাঝে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সংলাপে বলা হয়, যদি আমরা সম্পর্কের সেতুর বদলে প্রাচীর নির্মাণ করি, তাহলে আমরা একলা হয়ে পড়বো। এটা ভারতের জন্য যেমন সত্য তেমনি বাংলাদেশের জন্যও সত্য। শনিবার ঢাকায় ‘বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক জোরদারে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক এক মৈত্রী সংলাপে দু’ দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্রের সম্পাদক এবং সংবাদপত্র ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকবৃন্দ এই অভিমত ব্যক্ত করেন। ‘অতন্দ্র একাত্তর’ নামের একটি সংগঠনের সহযোগিতায় ‘ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ’ নামের একটি সংগঠন সংলাপের আয়োজন করে। এতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন সাংবাদিক মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডেইলি স্টারের নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ বদরুল আহসান এবং ভারতের পক্ষে চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব গৌতম ঘোষ। মৈত্রী সংলাপে বক্তারা আরো বলেন, বাংলাদেশের সংবাদ ভারতের গণমাধ্যমে উপেক্ষিত। আগামী নির্বাচনে ভারতের ভূমিকা বাংলাদেশের মানুষ সতর্কভাবে লক্ষ্য রাখবে। বর্তমান সরকার ভারতের সঙ্গে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিলো। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। অথচ ভারতের অভ্যন্তরীণ কারণে তিস্তা এবং সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন না হলে সেই সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে। বাংলাদেশের ন্যায্য দাবিগুলো নিয়ে ভারতের গণমাধ্যমকে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন বক্তারা। সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার বলেন, আগামী নির্বাচনে ভারতের ভূমিকা সতর্কভাবে লক্ষ্য রাখবে বাংলাদেশের মানুষ। বিশেষ করে তিস্তা ও সীমান্ত চুক্তির ভবিষ্যত্ বিশেষভাবে নজরে রাখা হবে। সীমান্ত চুক্তির লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধনী বিল ২১ আগস্ট ভারতের পার্লামেন্টে উত্থাপনে বিজেপি বিরোধিতা করবে না বটে। কিন্তু বিলটি পাস না হলে নির্বাচনের আগে সংবাদপত্রে নেতিবাচক সংবাদ হবে। সীমান্তে ফেলানি হত্যা নিয়ে বিচার শুরু হলেও শান্তির সীমান্ত কায়েম হচ্ছে না। সীমান্তে হত্যা হবে না বলে সকালে বৈঠক করে। সন্ধ্যায় খুন হয়ে যায়। এটাই হলো বৈরী বাস্তবতা। সাংবাদিক আবেদ খান বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সেতু নির্মাণের বদলে প্রাচীর নির্মাণ করা বিপর্যয় ডেকে আনবে। পানি নিয়ে দু’ দেশের মধ্যে যে সমস্যা রয়েছে, সেটাকে ক্ষুদ্র হিসাবে দেখলে আগামীতে এই সমস্যা আর ক্ষুদ্র থাকবে না। এই সমস্যার যৌথ সমাধান করতে হবে। কেননা ব্রহ্মপুত্রে বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে চীন যে বক্তব্য দেয়, বাংলাদেশের উজানে বাঁধ নির্মাণ নিয়ে ভারতও একই ধরনের বক্তব্য দেয়। তিনি আরও বলেন, কয়েক মাস পরেই নির্বাচন। সেখানে মৌলবাদ, জামায়াত, হেফাজতের উত্থান নিয়ে সবাই উত্কণ্ঠার মধ্যে আছি। ভারতের পত্রিকায় এই আলোচনা আসতে হবে। ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার হবে পরস্পরের স্বার্থে। বাংলাদেশ প্রতি বছর ভারত থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে। বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় এক হাজার ডলারে উন্নীত হলে এই আমদানি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সেটা ভেবে দেখা দরকার। ফলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে ভারতের স্বার্থ জড়িত রয়েছে। এটা ভারতের মিডিয়াকে বুঝতে হবে। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালে রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে ভারতের সঙ্গে চুক্তি করেছেন। এতে করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে সুযোগ সৃষ্টি হয়। কিন্তু সেই সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। ভারতের ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’র সহযোগী সম্পাদক শংকর রঘুরমন বলেন, বাংলাদেশ নামের সঙ্গেই ভারতের সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘অনুপ্রবেশ’ শব্দটি যুক্ত হয়ে আছে। অপরদিকে, বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভারত মানে হলো বড় ভাই। এই ধারণা পাল্টাতে গণমাধ্যমের ভূমিকা পালন করতে হবে। মিডিয়াকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে সমঝোতা সৃষ্টিতে ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি স্বীকার করেন, ভারতের মিডিয়ায় বাংলাদেশের সংবাদ কম আসে। কারণ ভারতের করপোরেট মালিকরা সংবাদের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব দেখেন। দিল্লীর ‘মেইনস্ট্রীম’ পত্রিকার সম্পাদক সুমিত চক্রবর্তী বলেন, ট্রানজিট, উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা, চট্টগ্রাম বন্দরকে ব্যবহারের মতো ইস্যু কাজে লাগাতে ভারতকে এগিয়ে আসতে হবে। সীমান্ত চুক্তি পার্লামেন্টে উত্থাপন করতে বিজেপি বাধা দেবে না বলে জানতে পেরেছি। মৌলবাদ, সন্ত্রাস দমনে শেখ হাসিনার সরকারের সহযোগিতার কথা আমরা জানি। দিল্লিতে প্রথম আলোর কনসাল্টিং এডিটর সৌম্য বন্দোপাধ্যায় বলেছেন, তিস্তা ও সীমান্ত চুক্তি সম্পর্কে ভারতের সরকারি পর্যায়ে জানতে চাইলে তারা বলেন, ভারতের আয়তন ও অগ্রাধিকার ভিন্ন। সেখানে তিস্তা ও সীমান্ত চুক্তি কোনও অগ্রাধিকার নয়। ভারতীয় ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা প্রসঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি সুজিত ঘোষ বলেন, গত ছয় মাসে যে সকল বাংলাদেশি সাংবাদিক এক বছরের মাল্টিপল ভিসা চেয়েছেন তাদের সবাই ভিসা পেয়েছেন। দু’ দেশের মধ্যে আরটিআই (রিভাইস ট্রাভেল অ্যারেঞ্জমেন্ট) সই হওয়ার পর এই ভিসা প্রক্রিয়া সহজতর হয়েছে। মূল প্রবন্ধে সৈয়দ বদরুল আহসান বলেন, দিল্লীর মিডিয়া দেখলে ঢাকাকে অনেক দূরে মনে হয়। গৌতম ঘোষ বলেন, আগামী ৫০ বছরে দু’ দেশের ভবিষ্যত্ প্রজন্মের কথা বিবেচনায় নিয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকা নির্ধারণ করতে হবে। সংলাপে আগরতলার দৈনিক দেশের কথার সম্পাদক গৌতম দাশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক আখতার সুলতানা, আসাম ট্রিবিউনের দিল্লী ব্যুরো চিফ কল্যাণ বড়ুয়া, বাসসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক হারুন হাবিব, টাইমস নাউয়ের দিল্লী ব্যুরো চিফ শান্তনু ঘোষ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌস ইত্তেফাকের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আশিস সৈকত প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।