সিরাজগঞ্জে দুই দলেরই সম্ভাব্য প্রার্থীরা মাঠে

আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে সিরাজগঞ্জে কমবেশি প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা নানা কৌশলে প্রচারণা চালাচ্ছেন। দুই দলেরই সম্ভাব্য প্রার্থীরা নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। ইফতার পার্টি, ফেসবুক, সভা-সমাবেশ, দান-খয়রাত, সংবাদ সম্মেলন ও মতবিনিময় সভার মাধ্যমে তারা প্রার্থিতার কথা জানান দেন। ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রার্থীরা নির্বাচনী এলাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ডিজিটাল ব্যানার স্থাপন ও পোস্টার লাগিয়েছেন। সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয় না নয় বছর। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে চলছে জেলা আওয়ামী লীগ। শিগগিরই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে-দলের নেতারা এমন কথা বললেও তার কোন আলামত দেখা যাচ্ছে না। গত সাড়ে চার বছরে তৃণমূল পর্যন্ত দলকে সুসংগঠিত করতে পারেনি আওয়ামী লীগ। নেতাদের মধ্যে কোন্দল আর কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির ঘটনায় সরকারের সম্পর্কে জনগণের ভেতর নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। অপরদিকে বিএনপিতেও রয়েছে ব্যাপক অন্ত:কোন্দল। আর কোন্দল নিরসনে বিএনপির হাইকমান্ডও কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। গত নির্বাচনে সিরাজগঞ্জের মোট ৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ৫টিতে আওয়ামী লীগ বিজয় লাভ করে। সিরাজগঞ্জ-১ (কাজীপুর উপজেলা): গত সংসদ নির্বাচনে মামলাজনিত কারণে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মো. নাসিম। তার পরিবর্তে নির্বাচন করেন তার ছেলে তানভীর শাকিল জয়। এক লাখ ৭৭ হাজার ৭৩৫ ভোট পেয়ে এমপি নির্বাচিত হন তিনি। বিএনপির প্রার্থী প্রয়াত আব্দুল মজিদ মিনু পেয়েছিলেন ৪০ হাজার ৮১৪ ভোট। তবে এইবার এই আসন থেকে নাসিম নির্বাচন করতে পারেন। সিরাজগঞ্জ-২ (সদর-কামারখান্দ): গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জান্নাত আরা তালুকদার হেনরী পরাজিত হন সাবেক বিদ্যুত্ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর স্ত্রী বেগম রোমানা মাহমুদের কাছে। দলীয় কোন্দল ও মহাজোটের অন্যতম শরীক জাতীয় পার্টির প্রার্থী থাকায় জান্নাতআরা হেনরী প্রায় দুই হাজার ভোটে হেরে যান রোমানা মাহমুদের কাছে। এবার এই আসন থেকে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু লড়বেন বলে শোনা যাচ্ছে। মোহাম্মদ নাসিম আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হওয়ায় সিরাজগঞ্জ-১ ও ২ আসনের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। এই আসনে আওয়ামী লীগের পক্ষে মোহাম্মদ নাসিম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে হারানো আসনটি পুনরুদ্ধার হবে বলে আশা করছেন নেতাকর্মীরা। অন্যদিকে সাধারণ ভোটাররা বলছেন, নাসিমকে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দিলে জেলা বিএনপির সভাপতি ও বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সঙ্গে লড়াই জমে উঠবে। তবে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সমন্বয়ক প্রফেসর ডা. হাবিবে মিল্লাত মুন্না এই আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেতে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। এছাড়া কেন্দ্রীয় মহিলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদিকা জান্নাত আরা তালুকদার হেনরীও মনোনয়ন চাইবেন। আওয়ামী লীগ থেকে হেলাল মোর্শেদ খানও (বীর বিক্রম) মনোনয়ন প্রত্যাশী। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট থেকে জামায়াত নেতা সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আব্দুল লতিফ, কেন্দ্রীয় তাঁতীদলের সভাপতি হুমায়ন ইসলাম খান, সিরাজগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র টি আর এম নুর-ই আলম হেলাল, কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য মেজর (অব.) মোহাম্মাদ হানিফ, মির্জা মোস্তফা জামান, সাইদুল ইসলাম মনোনয়ন প্রত্যাশী। জাতীয় পার্টি থেকে আমিনুল ইসলাম ঝন্টু মনোনয়ন চাইবেন বলে শোনা যাচ্ছে। সিরাজগঞ্জ-৩ (রায়গঞ্জ-তাড়াশ): এই আসনের এমপি আওয়ামী লীগের গাজী ইসহাক হোসেন তালুকদার। এলাকার উন্নয়নে তিনি অনেক কাজ করেছেন। তবে একাধিক নেতাকর্মী জানান, তিনি দলের প্রবীণ ও ত্যাগী নেতাদের তেমন গুরুত্ব না দিয়ে নব্য আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বেশি গুরুত্ব দেন এবং তাদের মাধ্যমে এলাকার সিংহভাগ উন্নয়ন কাজকর্ম পরিচালিত হয়ে আসছে। তার বিরুদ্ধে জামায়াত-বিএনপি নেতাদের পুনর্বাসন, দলীয় ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করাসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডও তার ওপর চরম নাখোশ। এসব কারণে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি দলের মনোনয়ন বঞ্চিত হতে পারেন বলে নির্ভরযোগ্যসূত্রে জানা গেছে। অপরদিকে এ আসন থেকে পর পর চারবার নির্বাচিত বিএনপির সাবেক এমপি আলহাজ্ব আব্দুল মান্নান তালুকদার এলাকায় রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট নির্মাণ ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক উন্নয়ন করে এলাকায় ব্যাপক সাফল্য অর্জন করে। সংসদ সদস্য ইসহাক হোসেন তালুকদার ছাড়াও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হলেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও পেট্রোবাংলা চেয়ারম্যান ড. হোসেন মনসুর, জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য লুত্ফর রহমান দিলু, তাড়াশ উপজেলা চেয়ারম্যান ম. ম আমজাদ হোসেন মিলন। লুত্ফুর রহমান দিলু দলীয় কর্মসূচিতে অর্থের যোগান দেন। অপরদিকে তাড়াশ উপজেলা চেয়ারম্যান গাজী ম. ম আমজাদ হোসেন মিলন দলীয় মনোনয়ন চাইলেও সমপ্রতি দলের উপজেলা কাউন্সিলে ভোটের মাধ্যমে তারই শিষ্যের কাছে পরাজয়ের কারণেও তার মনোভাব আগের মতো চাঙ্গা নেই। অধ্যাপক ড. হোসেন মনসুরকে নিয়ে তাড়াশবাসী গর্ব করলে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার তেমন যোগাযোগ নেই। এই আসনটি আওয়ামী লীগের আসন বলা হয়ে থাকে। কিন্তু আগামীতে দলীয় মনোনয়নের উপর নির্ভর করছে জয় ও পরাজয়। বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হলেন, কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা সাইফুল ইসলাম শিশির, তাড়াশ উপজেলা বিএনপি নেতা খন্দকার সেলিম জাহাঙ্গীর, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আলহাজ্ব দুলাল হোসেন খান ও রায়গঞ্জ থানা বিএনপির সভাপতি আতাউর রহমান তালুকদার। সিরাজগঞ্জ-৪ (উল্লাপাড়া): বর্তমান এমপি আওয়ামী লীগের শফিকুল ইসলাম শফি। তার সাথে উপজেলা চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম জাহিদ ও সাবেক পৌর চেয়ারম্যান মারুফ বিন হাবিবের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য রূপ লাভ করেছে। এবারের নির্বাচনে সাবেক এমপি আব্দুল লতিফ মির্জার মেয়ে মুক্তি মির্জা ও এ্যাড. মারুফ বিন হাবিব আওয়ামী লীগের মনোনয়নের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন। বিএনপির মনোনয়ন পেতে একাধিক প্রার্থী বিভিন্ন কৌশলে প্রচারণা চালাচ্ছেন। এদের মধ্যে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এম. আকবর আলী ও এ. ওয়াই কামাল উল্লেখযোগ্য। তবে জোটগত কারণে জামায়াত নেতা আলহাজ্ব রফিকুল ইসলাম খানের মনোনয়ন পাবার সম্ভাবনাই বেশি বলে জানা গেছে। তবে এদের বাইরে বিএনপির স্থায়ী সদস্য নজরুল ইসলাম খানের নামও উঠে আসছে। নজরুল ইসলাম খানের শ্বশুর বাড়ি এই উপজেলায় হওয়ায় তার পরিচিতিও কম নয়। সিরাজগঞ্জ-৫: বর্তমান এমপি মত্স্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাস। আগামী নির্বাচনেও তিনি আওয়ামী লীগের শক্তিশালী প্রার্থী। এখানে আওয়ামী লীগের তেমন গ্রুপিং দ্বন্দ্ব না থাকলেও স্থানীয় বিএনপি নেতাদের মধ্যে ব্যাপক গ্রুপিং রয়েছে। সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য কোন নেতাকে এই আসনে মনোনয়ন না দিলে বিএনপির পরাজয়ের সম্ভাবনা বেশি। গত নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়নের তালিকায় মেজর (অব.) মঞ্জুর কাদের এবং গোলাম মওলা খান বাবলুর নাম রাখা হয়। পরে দলীয় সিদ্ধান্তে মঞ্জুর কাদের মনোনয়ন পান। তবে তাঁত সমৃদ্ধ এই অঞ্চলে গোলাম মওলা খান বাবলুর ক্লিন ইমেজ থাকায় তার অবস্থানই সবচেয়ে ভালো। ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম খান আলীম ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী আনছার আলী সিদ্দিকীর ছেলে মেজর (অব.) মামুনের নাম শোনা যাচ্ছে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসাবে। আওয়ামী লীগ থেকে আরো মনোনয়ন চান জেলা পরিষদ প্রশাসক আব্দুল মজিদ মন্ডল, সাবেক এমপি অধ্যাপক শাহাজাহান, ডা. আবু বক্কার সিদ্দিক ও জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুর রহমান রানা, কেন্দ্রীয় যুবলীগের ক্রীড়া সম্পাদক মুশফিকুর রহমান মোহন। সিরাজগঞ্জ-৬ (শাহজাদপুর): বর্তমান এমপি আওয়ামী লীগের চয়ন ইসলাম। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে চয়ন ইসলাম ছাড়াও সাবেক উপ-মন্ত্রী ও বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান হাসিবুর রহমান স্বপন এবং জেলা পরিষদ প্রশাসক আব্দুল মজিদ মন্ডল মনোনয়ন চাইবেন। বিএনপি থেকে সাবেক এমপি কামরুদ্দিন এহিয়া খান মজলিশ ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি হোসেন শহীদ মোহাম্মদ গ্যাদন মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে।