উত্সবে নওয়াব পরিবারের নারীরা

ঐতিহ্যবাহী পরিবারের এই চার গৃহবধূ ছিলেন সদ্য প্রস্ফুটিত কোন গোলাপের মত। তাঁরা সকলেই ছিলেন অত্যন্ত মিষ্টভাষী, বিনয়ী, সত্ ও সুন্দর। রূপে-গুণে ছিলেন বিধাতার অপূর্ব সৃষ্টি। তাঁরা জন্মেছিলেন সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। রক্ষণশীল পরিবারে তাঁদের জন্ম হলেও পরিবারের মুরব্বিরা মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে ছিলেন সচেতন। শত কর্মব্যস্ততার মাঝেও মুরব্বিরা মেয়েদের পড়াশোনার খোঁজ নিতেন। মূলত মুরব্বিদের কাছ থেকেই সিরাজ পরিবারের গৃহবধূদের পড়াশুনার অনুপ্রেরণা। উক্ত সময়গুলোতে মুসলিম নারীদের বিদ্যার মাধ্যম ছিল আরবী ও ফার্সি। অন্য ভাষাতেও তাঁরা জ্ঞান ও দক্ষতা রাখতেন সমানভাবে। রন্ধন শিল্পে সিরাজ পরিবারের গৃহবধূরা যথেষ্ট পারদর্শী ছিলেন। তাঁরা জানতেন রান্নার বিশেষ উপকরণসমূহের সঠিক ব্যবহার এবং রন্ধন শৈলি। তাঁদের রন্ধন শিল্পের প্রশংসা আজও অব্যাহত আছে সিরাজ পরিবারের নবীনদের গল্পকথায়। সেই সময়ে পুরুষেরা শত ব্যস্ততার মাঝেও সিরাজ পরিবারের গৃহবধূদের সুন্দর নিয়ম নীতিতে একই সাথে পরিবারের সকল সদস্যদের নিয়ে সকালের নাস্তা এবং রাতের খাবার ঐতিহ্য নিয়মনীতি অনুযায়ী সম্পন্ন করতেন। তাঁদের ঘুম ভাঙত ফযরের আযানের সময়। মুখ-হাত ধুয়ে ওযু করে ফযরের নামায পড়তেন, নামায শেষে প্রার্থনা করতেন, পরিবারের সকল সদস্য ও বাংলার প্রতিটি ঘরের সকল মানুষের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘ আয়ু কামনা করতেন। প্রার্থনা শেষে পারিবারিক সুখ-শান্তি এবং বাংলার প্রকৃতির আনাচে কানাচে সুখ-শান্তির জন্য পবিত্র কোরআন পাঠ করতেন। তারপর পরিবারের সকলকে একে একে ঘুম থেকে উঠানো, নামায পড়তে যাওয়ার নির্দেশ, পরে পরিবারের ছোট সদস্যদের নিয়ে মুক্ত বাতাসে হাঁটাহাঁটি, ফুল-ফল, তরিতরকারি গাছের প্রয়োজনীয় পরিচর্যা। সুপ্রভাত সকালের প্রতিদিনের আপনজন মুক্ত পাখিদের, সুপ্রভাত জানিয়ে তাঁদের উড়া-উড়ির আনন্দ-উল্লাসে আপনজন হয়ে অংশগ্রহণ করা, পাখিদের সাথে মু্্্ক্ত বাতাসে কথা বলা, তাঁদের জন্য খাবার ছড়িয়ে স্বাগতম জানানো। সকালের নাস্তায় সিরাজ পরিবারে সকল সদস্যের জন্য প্রস্তুত করা হত বড় রকমের খানদানি রুটি। রুটির সাথে থাকত গাজরের হালুয়া, বিশেষ রকম কাবাব, মিহিদানা, ছানা, মাখন, তাজা সালাদ। এর প্রতিটি অংশে ঐতিহ্যের ছোঁয়া থাকত সিরাজ পরিবারের উক্ত গৃহবধূদের। সিরাজ পরিবারের গৃহবধূদের কাছে ঈদ হূদয়ের উত্সব ছিল। রমজান মাসের সীয়াম সাধনা শেষে চাঁদরাতে গৃহবধূরা হূদয়ের বন্ধনের প্রিয় পরিবার পরিজন নিয়ে মুক্ত আঙ্গিনায় চাঁদ দেখে আপনজনকে জানাতেন ঈদ মোবারক। চাঁদ দেখার পর্ব শেষে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন ঈদের বিশেষ অয়োজনে। বাড়ির মুরব্বি ও ছোটদের ঈদের বিশেষ পোশাক নির্ধারণ করা, ঘর সাজানো, আলোকসজ্জা ইত্যাদি। ঈদের সকালে আপনজনদের ঘুম ভাঙ্গিয়ে ফুলেল শুভেচ্ছা দেয়া। নামাযের আগে পেস্তা বাদামের বিশেষ হালুয়া ও পরটা দিয়ে তাঁদের মিষ্টিমুখ করানো। সারাদিন থাকে কর্মব্যস্ততা, অতিথিদের জন্য বিশেষ রাজকীয় ভোজের আয়োজন। এই আয়োজন থেকে বাদ পড়ে না দরিদ্র, ফকির মিসকিনরাও। তাঁরাও সমভাবে থাকে রাজকীয় ভোজের অংশিদার হয়ে। গৃহবধূরা অর্থ এবং নতুন জামা-কাপড় দিয়ে গরিব মিসকিনদের সাথে ঈদের আনন্দ সমভাবে উপভোগ করতেন। বিপদগ্রস্ত, সমস্যাগ্রস্ত বাংলার সকল মানুষের পাশে থাকতেন আপনজন হয়ে। নওয়াব পত্নী শরফুন্নিসা ও লুত্ফুন্নিসার সাথে রাণী ভবানীর সম্পর্ক ছিল মিষ্টিমধুর। তাই নওয়াব পরিবারের বিশেষ উত্সব আয়োজনে রাণী ভবানী ও তাঁর পরিবার থাকতেন কাছের মানুষ হয়ে, সবসময়। ছোটরা সালামের বিনিময়ে সিরাজ পরিবারের রূপসী এই বধূদের কাছ থেকে পেতেন ঈদের সেলামি, সেই সাথে আদর ও ভালবাসা। বিশেষ রান্না-বান্নায়, অতিথি আপ্যায়নে ঈদের সারাদিন কর্মব্যস্ততা শেষে তারা ঝলমলে চাঁদনী রাতে ফুলের সুভাসে প্রকৃতির মাঝে আপনজনদের নিয়ে সংগীত সন্ধ্যার বিশেষ আয়োজন হত। সংগীত সন্ধ্যার আয়োজক হতেন সিরাজ পরিবারের গৃহবধূরা। আর এই সংগীতের মূল আকর্ষণ ছিল নামিদামি গাইয়েদের শ্রুতিমধুর সংগীত। বিশেষ দিনগুলোতে সিরাজ পরিবারের উক্ত বধূরা হাতে-পায়ে আলপনা আঁঁকিয়ে মেহেদির রঙে রাঙ্গিয়ে নিতেন নিজেদের। ঐতিহ্যবাহী উক্ত নওয়াব পরিবারের চার গৃহবধূ শরফুন্নিসা বেগম, লুত্ফুন্নিসা বেগম, গুলশান আরা বেগম এবং সৈয়দা হোসনে আরা বেগমের চারু-কারু শিল্প, হাতে তৈরি বাহারি কারুকাজের নকশি পণ্য আজও সাক্ষ্য বহন করে, তাঁরা শুধু গৃহকর্মে নয়, বহু গুণের অধিকারিণী ছিলেন। সিরাজ পরিবারের বধূদের কাছে শাব-এ-বারাত একটি বিশেষ দিন হত। শাব-এ-বারাতের আয়োজনে থাকত চালের তৈরি রুটি, পেস্তা বাদাম-মেওয়ার তৈরি বাহারি নকশার রকমারি হালুয়া, বিরিয়ানি, কাবাব। এই দিনে বিশেষ তৈরিকৃত খাদ্যসামগ্রী আত্মীয় স্বজন এবং গরিব মিসকিনদের মাঝে বিতরণ করা হত। শাব-এ-বারাত এর সন্ধ্যায় রঙ-বেরঙের মোমবাতি দিয়ে বাড়ির ভিতরে ও বাহিরে আলোকিত করা হত। বিশ্বাস রাখতেন তাঁরা এ দিনে মৃত আপনজনরা আবার আপন হয়ে গৃহে প্রবেশ করেন। পাশাপাশি বাড়ির আপনজনদের সাথে উক্ত গৃহবধূরা মৃত আত্মীয়-স্বজনের কবর জিয়ারত করতে গিয়ে মোমবাতি-আগরবাতি জ্বালানো থেকে শুরু করে চারপাশে ফুল ছড়িয়ে মরহুম মরহুমার আত্মার শান্তির জন্য কোরআন পাঠ করতেন। মহরম মাস শোকের মাস, এ মাসে নবী পরিবারের আপনজনরা শহীদ হয়েছিলেন। তাই তিন মাস আমাদের প্রিয় নবীজির আপনজনদের স্মরণে নওয়াব আলিবর্দী ও সিরাজউদ্দৌলার সময় থেকেই এই পরিবারের গৃহবধূরা নওয়াব সাহেব ও তাঁর পরিবার পরিজন নিয়ে শোকের মাস মহরমের যাবতীয় অনুষ্ঠানাদি শোক ও ধর্মীয় শ্রদ্ধার সাথে পালন করতেন। ইরানে নতুন বছরকে নওরোজ বলা হয়। সিরাজ পরিবারের গৃহবধূরা পরিবারের সকলকে বিভিন্ন উপহার ও শুভেচ্ছা দিয়ে জাশনে নওরোজ-এ নতুন বছরের যাত্রা শুরু করতেন, নতুনভাবে ভালবাসার বন্ধনে।