ঐশীর রঙিন দুনিয়ার বাধা ছিল বাবা-মা
প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০১৩, ২৩:২৭
ডিজে পার্টির বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা, নিয়মিত ইয়াবা ছাড়াও গাঁজা সেবন, একাধিক বয় ফ্রেন্ডের সঙ্গে সময় কাটিয়ে রঙিন দুনিয়ায় চলাফেরা ছিল ঐশী রহমানের। আর এই রঙিন দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় তার বাবা-মা। তাই খুব ঠান্ডা মাথায় এই বাধা দূর করেছে ঐশী। ডিজে পার্টির বন্ধু রনি, জনিসহ আরো অনেকেই তাকে হত্যাকাণ্ডে উত্সাহিত করেছে। রনি গ্রেফতার হলেও জনিসহ দুইজনকে পুলিশ এখন খুঁজছে। তবে ঐশীর প্রেমিক পারভেজ সম্পর্কে গোয়েন্দাদের কাছে কোন নেতিবাচক তথ্য নেই। পারভেজের পরামর্শেই পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে ঐশী। আর বাসা থেকে নিয়ে আসা স্বর্ণালংকার ও টাকার লোভে রনি-জনিরা ঐশীকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল। তার আগেই সে পুলিশের কাছে ধরা দেয়। ঐশীর বন্ধু জনিকে পাওয়া গেলে আরো অনেক তথ্যই জানা যাবে।
গতকাল ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এই নৃশংসতার বর্ণনা করেছে ঐশী। হত্যা মামলায় ঐশী রহমান, তার বয়ফ্রেন্ড মিজানুর রহমান রনি ও বাসার কাজের মেয়ে সুমিকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে ৫দিনের রিমাণ্ডে নিয়েছে পুলিশ। গতকাল মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর মুখ্য হাকিম আদালতে তাদের হাজির করে ১০ দিনের রিমাণ্ড আবেদন করেন। রিমাণ্ডের বিরোধিতা করেন আসামি পক্ষের আইনজীবীরা। পরে উভয় পক্ষের শুনানি শেষে মহানগর হাকিম মিজানুর রহমান ৫ দিনের রিমাণ্ড মঞ্জুর করেন। পল্টন থানার এসআই শহীদুল্লাহ প্রধান রিমাণ্ড আবেদনে বলেন, ঐশী মাদকাসক্ত ছিল। মাদকাসক্ত বন্ধু-বান্ধবের পরামর্শেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। তাদের সবার পরিচয় জানতে ও হত্যার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের জন্য এই তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে ঐশীর পক্ষে তার আইনজীবী মাহাবুব হাসান রানা, চৌধুরী মোহাম্মদ গালিব রাকিব ও রেজাউর রহমান টিংকু রিমাণ্ডের বিরোধিতা করে জামিন আবেদন করেন। রনির পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মন্টু রঞ্জন দাস। মাহাবুব হাসান রানা বলেন, অপ্রাপ্তবয়স্ক ঐশীকে রিমাণ্ডে নেয়ার প্রশ্নই আসে না। এই শুনানি স্থগিত রেখে তাকে কিশোর আদালতে নেয়া হোক। আর জিজ্ঞাসাদের প্রয়োজন হলে তা কারাফটকেই করা উচিত। আইনজীবী মাহাবুব রানা আরো বলেন, যে পরিবার ও যে সমাজ ঐশীদের তৈরি করে তাদের বিচার হওয়া দরকার।
শুনানি শুরুর আগে কালো বোরখা ও মেরুন চাদর পরিহিত ঐশী এজলাসে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘মা-বাবার জন্য আমার কষ্ট হচ্ছে। আমার হাঁপানি আছে।’ এ সময় তার হাতে একটি ইনহেলারও দেখা যায়।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (গোয়েন্দা) মনিরুল ইসলাম বলেন, পুলিশের অনুসন্ধান ও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে পুলিশ দম্পতি হত্যাকাণ্ডে ঐশী, সুমি ও রনির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এই তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া গেছে- এই হত্যাকাণ্ড পরিকল্পিত। এখন রিমাণ্ডে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে হত্যার মোটিভ সম্পর্কে পরিষ্কার হওয়া যাবে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি-না তা জানা যাবে। মনিরুল ইসলাম আরও বলেন, নিহত দম্পতির বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া ছুরি ও বটির মধ্যে ছুরিটিই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করা হয়েছে। আর ঐশীর মায়ের কোমরে থাকা আলমারির চাবির গোছা কাটার জন্য রান্নাঘর থেকে বটি আনা হয়েছিল। তিনি বলেন, আসলে মেয়েটি অনেক বন্ধু মেইনটেইন করতো। যাদের সঙ্গ দোষে বখাটে হয়ে গিয়েছিল। এই বখাটেপনা থেকে ফিরিয়ে আনতে তাকে বাসা থেকে বের হতে দিত না তার মা-বাবা। এ কারণেই মায়ের প্রতি বেশি ক্ষোভ ছিলো ঐশীর। তাই মাকেই বেশি কোপ দিয়েছে।
তদন্ত সূত্র মতে, ঐশীর শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলে। সেখানকার ধর্মীয় রীতিনীতি ও নিয়ন্ত্রিত জীবন-যাপন তার ভাল লাগেনি। ছেলেদের টুপি ও মেয়েদের স্কার্ফ পরা অসহ্য মনে হয়েছে তার কাছে। তখন থেকেই তার ধারণা জন্মে-ওই স্কুলে পড়াশোনা করলে পার্থিব জীবনের সকল সৌন্দর্য উপভোগের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। অদেখাই রয়ে যাবে সৃষ্টির আসল সৌন্দর্য। এ ধারণা থেকে স্কুল বদল করতে বাবা-মাকে চাপ দিতে থাকে। বায়না ধরে ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ড স্কুলে ভর্তির। ঐশী ছিল বাবা-মার বড় মেয়ে। তাই তার সকল আবদার পূরণ করার চেষ্টা করতেন বাবা-মা। যা চাইতো তাই দেয়ার চেষ্টা করতেন। এরই একপর্যায়ে ২০১১ সালে ঐশীকে ধানমন্ডির অক্সফোর্ড স্কুলে ভর্তি করে দেন বাবা-মা। ভর্তির পর স্কুলের গাড়িতেই যাতায়াত করতো ঐশী। মাঝে-মধ্যে রিকশা নিয়ে যেতো। পর্যাপ্ত টাকাও দেয়া হতো তাকে।
ঐশীর পারিবারিক সূত্র জানায়, অক্সফোর্ড স্কুলে ভর্তির পরই ঐশীর আচরণ ও জীবন-যাপনে দ্রুত পরিবর্তন ঘটতে থাকে। সেলোয়ার কামিজ ও স্কার্ফ ছেড়ে পাশ্চাত্য ঢংয়ের পোশাক পরা শুরু করে। স্বল্প বসনায় ছেলে বন্ধু ও প্রেমিকের সঙ্গে ঘুরে বেড়াত। সংক্ষিপ্ত পোশাক পরার কারণে কখনো কখনো তার মা বকা-ঝকা করতো। স্কুলের কথা বলে সকালে বাসা থেকে বেরিয়ে কখনো রাত ১০টা, কখনো ১১টায় ফিরতো। স্কুল ফাঁকি দিয়ে আড্ডা দিতো ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে। অংশ নিতো ইয়াবা ও গাঁজার আসরে। যেতো ডিজে ও ড্যান্স পার্টিতে। শুধু তাই নয়, পার্টিতে অংশ নেয়া বন্ধু মহলের যাকে ভাল লাগতো, তার সঙ্গেই অন্তরঙ্গ সময় কাটাতো।
সূত্র জানায়, এসব পার্টি ও আড্ডার আসরেই পরিচয় হয় পুরান ঢাকার ডিজে জনির সঙ্গে। তার সঙ্গে কিছুদিন মেলামেশার পর তারই বন্ধু রনির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। এই রনি ও জনির মাধ্যমেই মূলত নেশার জগতে প্রবেশ করে ঐশী। সূত্র মতে, ঐশীর ডজনখানেক বয়ফ্রেন্ড রয়েছে। যাদের সঙ্গে নিয়মিত বিভিন্ন পার্টিতে অংশ নিতো। এর বাইরে তার আরো একজন প্রেমিক আছে। তার নাম পারভেজ। মূলত এই পারভেজের নির্দেশনা মোতাবেক ঐশী পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ঐশী জানায়, গত ৩১ জুলাই তার ব্যবহূত মোবাইল ফোন কেড়ে নেয় মা। তারপর থেকে বন্ধু মহলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে। তখন তার কাছে নিজের পিতা-মাতাকেই প্রধান শত্রু বলে মনে হয়েছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, বিকৃত যৌনাচার ও মাদক সেবনে অভ্যস্ত হওয়ায় ঐশী মানসিকভাবে অসুস্থ হয়েছিল। যার ফলে নিজের পিতা-মাতার মতো সবচেয়ে কাছের মানুষকে এতো নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করতে পেরেছে।
প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার সন্ধ্যায় চামেলীবাগের একটি ফ্ল্যাট থেকে মাহফুজ ও স্বপ্নার ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। দুই সন্তান ঐশী ও ঐহী এবং গৃহকর্মী সুমিকে নিয়ে ওই ফ্ল্যাটে থাকতেন তারা। ঐশী বৃহস্পতিবার সকালে তার সাত বছর বয়সী ছোট ভাই ঐহী ও গৃহকর্মী সুমিকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। দুদিন নিখোঁজ থাকার পর শনিবার নিজেই পুলিশের কাছে ধরা দেয়। এরপর তাকে নিয়ে অভিযান চালিয়ে সুমি, রনিসহ মোট পাঁচজনকে আটক করে পুলিশ। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ জানান, নিহত পুলিশ কর্মকর্তার দেহে ছুরিকাঘাতের তিনটি এবং তার স্ত্রীর দেহে ১১টি চিহ্ন পাওয়া গেছে। হত্যার আগে পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজ ও তার স্ত্রীকে ঘুমের ওষুধ খাইয়েছিল ঐশী।
গ্রামের বাড়িতে জানাজা ও লাশ দাফন
হালুয়াঘাট (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা জানান, হালুয়াঘাটের গ্রামের বাড়িতে ঢাকায় নিহত এসবি ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমানের লাশ রবিবার সকাল সাড়ে ১০টায় নিজ বাড়িতে জানাজা শেষে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়।
গত শনিবার ঢাকা থেকে নিহতের ছোটভাই মশিহুর রহমান লাশ নিয়ে রাত সাড়ে ১১টায় হালুয়াঘাটে পৌঁছলে শোকাহত মানুষের ভিড় জমতে থাকে। জানাজায় হালুয়াঘাট উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আলী আজগর, হালুয়াঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ আবু মোহাম্মদ ফজলুল করিমসহ পুলিশ কর্মকর্তাসহ উপজেলার সর্বস্তরের মানুষ উপস্থিত ছিলেন।