জানুয়ারিতে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে ইসি

++ নভেম্বরে তফসিল ঘোষণার পরিকল্পনা ++ দলগুলোর সঙ্গে আবারো বৈঠক ++ আরপিও ৯১ই ধারা বহাল রাখার চিন্তা ++ সংসদ ভাঙ্গার পক্ষে কমিশন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী দলীয় সরকারের অধীনে আগামী দশম সংসদ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের। আর তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে চলতি বছরের নভেম্বরে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করারও চিন্তা আছে ইসির। নির্বাচনকালীন রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধি কি হবে তা নির্ধারণ করতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকেও বসার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিতর্ক এড়াতে প্রার্থিতা বাতিল সংক্রান্ত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯১ ই ধারা বহাল রাখা হতে পারে। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীল সূত্র ইত্তেফাককে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এদিকে সংসদ ভেঙ্গে নির্বাচন করার বিষয়ে দৃঢ় অবস্থানে কমিশন। সংসদ না ভাঙ্গলে সংসদ সদস্যরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হাফিজ। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, সংসদ বহাল থাকলে নির্বাচন আয়োজন কঠিন হবে। তাই সংসদ না ভাঙ্গলে তফসিল ঘোষণার পরপরই এমপিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার বিষয়ে কমিশন থেকে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হবে। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন সংসদ ভেঙ্গেই আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তিনি আরো বলেন, সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছে। নির্বাচনে সব দলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা হবে। আশা করি সবদলের অংশগ্রহণেই আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সংবিধানের ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদ অনুসারে সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান রয়েছে। নবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর। ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি সংসদ অধিবেশন শুরু হয়েছিল। সেই অনুযায়ী ২০১৩ সালের ২৬ অক্টোবর থেকে ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে কমিশনকে। প্রধান বিরোধী দল অভিযোগ করছে, বর্তমান সরকারের (মহাজোট সরকার) অধীনে ‘একতরফাভাবে’ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ বিষয়ে একাধিক নির্বাচন কমিশনার ইত্তেফাককে বলেছেন, ‘সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই কমিশনের। সংবিধানে নির্বাচনের যে নির্দেশনা দেয়া আছে সেই অনুযায়ী নির্বাচন আয়োজন করতে হচ্ছে। আগামী জানুয়ারিতেই নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। তফসিল ঘোষণা করতে হবে চলতি বছরের নভেম্বরের শেষদিকে। কোন দলকে সুবিধা বা বাইরে রাখার জন্য নির্বাচন আয়োজন করা হচ্ছে না। তবে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সৃষ্ট সংকট দ্রুত সমাধান হলে কমিশনের জন্য ততই মঙ্গল বলে মত দেন তারা।’ ইসির সংশ্লিষ্টদের মতে, সময় কাছাকাছি চলে আসায় আসন্ন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য কমিশনের নতুন আচরণ বিধি প্রণয়ন করতে হচ্ছে। এজন্য ভারতসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের নির্বাচনকালীন আচরণ বিধি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠানে বর্তমান গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) সঙ্গে সংবিধানের যে অসামঞ্জস্য রয়েছে তাতে সংশোধন আনতে এরই মধ্যে সংশোধনী প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে কমিশন। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) সংশোধনী সংসদের আগামী অধিবেশনে পাস হলে তারপরই আচরণ বিধি ঠিক করা হবে। আর আচরণবিধি প্রণয়ন করতে পুনরায় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা করা হয়েছে। নির্বাচনকালীন প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রী প্রটোকল না প্রটেকশন পাবেন তা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকে নির্ধারণের চিন্তা রয়েছে। এ বিষয়ে গতকাল নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ সাংবাদিকদের বলেন, আগামী সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে প্রয়োজন হলে আচরণবিধিতে পরিবর্তন আনা হবে। আর পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী আচরণ বিধিতে সংশোধনী আনা হলে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করে তা করা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিতর্ক এড়াতে ইসির প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও (৯১ (ই) ধারা) বাদ দেয়ার যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল তা থেকে সরে আসছে কমিশন। এর আগে গত মাসে ৯১ ই ধারা বাদ দেয়ার সুপারিশ করেছিল কমিশন। কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিভিন্ন মহলের বিতর্কের কারণে ওই প্রস্তাব এখনই আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হচ্ছে না। গতকাল প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য কমিশনাররা এ বিষয়ে প্রাথমিক আলাপ-আলোচনা করেছে। আগামী দশম সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সীমানা নির্ধারণ, ভোটার তালিকা প্রণয়ন, ভোটারের সিডি প্রস্তুত, নির্বাচনী মালামাল ক্রয়, বাজেট প্রণয়ন, ভোট কেন্দ্র ও কক্ষ নির্ধারণসহ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী অন্তর্বতী বা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার লক্ষ্যে বেশকিছু আইন ও বিধিমালায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। অন্যান্য নির্বাচনের মতো এবারও সরকারি কর্মকর্তাদের নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে। রিটার্নিং কর্মকর্তা নিযুক্ত হচ্ছেন জেলা প্রশাসকরা (ডিসি)। নবম সংসদ নির্বাচনের চেয়ে এবার ভোটার ও ভোটকেন্দ্রের সংখ্যাও বাড়ছে। তবে দলীয় সরকারের পাশাপাশি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতিও রয়েছে কমিশনের। সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ বলেন, নানা বাস্তবতার কারণে আমাদের দু’ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হচ্ছে। সংসদ নির্বাচনের জন্য কমিশন সর্বদা প্রস্তুত। আগামী নির্বাচনের সম্ভাব্য খরচ ধরা হয়েছে ৫০০ কোটি টাকা। এবারে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ব্যাপক প্রশিক্ষণ দেয়ার পরিকল্পনা হয়েছে। প্রস্তুতির অংশ হিসাবে ইতিমধ্যে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে সাজাপ্রাপ্তরা আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। পাশাপাশি ভোটার তালিকা থেকেও তাদের নাম বাদ দেয়া হচ্ছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের সংশোধনী এনে প্রার্থী বাছাই ও মনোনয়নে রাজনৈতিক দলের ক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। একই দলের একাধিক প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করলে দল কর্তৃক মনোনীত ব্যক্তি বাদে অন্যদের মনোনয়নপত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিলের বিধান রাখা হচ্ছে। এছাড়া নির্বাচনী ব্যয় ১৫ লাখ থেকে বাড়িয়ে ২০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হচ্ছে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ১৯ জেলার ৫৩টি সংসদীয় আসনের সীমানায় পরিবর্তন এনেছে কমিশন।