সহিংস হয়ে উঠছে জামায়াত
প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০১৩, ২৩:২৯
মহাজোট সরকারের মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসে ক্রমেই সহিংস হয়ে উঠছে প্রধান বিরোধী জোটের অন্যতম শরিক দল জামায়াতে ইসলামী। গতকাল রবিবার বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনকালে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতায় লিপ্ত হয় দলটির নেতাকর্মীরা। সকালে সাতক্ষীরার কলারোয়ার ফিল্মি স্টাইলে একটি পুলিশ ফাঁড়িতে বোমা ও ককটেল হামলা চালিয়েছে তারা। ফাঁড়ির সব পুলিশকে অস্ত্রের মুখে জিন্মি করে ছিনিয়ে নিয়েছে দলের আটক এক স্থানীয় নেতাকে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় ওই এলাকায় দুই প্লাটুন পুলিশ মোতায়েন করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
একই দিন চট্টগ্রামের বাদুরতলায় দলটির নেতাকর্মীরা পুলিশের পিকআপ ভ্যান লক্ষ্য করে ককটেল ছুঁড়ে মারলে দুই পুলিশ সদস্য আহত হন। এ সময় তারা বেশ কয়েকটি যানবাহন ও একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের ক্যামরা ভাংচুর করে। পুলিশ আত্মরক্ষার্থে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোঁড়ে। পরে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের দুটি ছাত্রাবাসে অভিযান চালিয়ে জামায়াত-শিবির সন্দেহে ৫৮ জনকে আটক করে পুলিশ।
এদিকে শনিবার রাতে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে নাশকতা সৃষ্টির জন্য বোমা বানাতে গিয়ে দলের এক কর্মী নিহত ও ১০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি ও কলারোয়া সংবাদদাতা জানান, সকালে কলারোয়ার সরসকাটি পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা চালিয়ে জামায়াত নেতা আলতাফ হোসেনকে ছিনিয়ে নিয়েছে দলের নেতাকর্মীরা। পুলিশ ও প্রত্যক্ষ্যদর্শীরা জানান, উপজেলার জয়নগর ইউনিয়ন জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক আলতাফ হোসেন সকাল ৯ টার দিকে স্থানীয় সরসকাটি বাজারে বসে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে নাশকতা সৃষ্টির পরিকল্পনা করছিল। এসময় সরসকাটি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই লিয়াকত আলী তাকে গ্রেফতার করে ফাঁড়িতে নিয়ে আসেন। এ খবর জানতে পেরে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা স্থানীয় সড়কের বিভিন্ন স্থানে গাছ ফেলে রাস্তা অবরোধ করে রাখে। পরে তারা সংঘটিত হয়ে সরসকাটি পুলিশ ফাঁড়ি ঘেরাও করে। একপর্যায়ে তারা আটক নেতাকে ছেড়ে দেয়ার জন্য শ্লোগান দিতে দিতে হাতবোমা ও ককটেল ছুঁড়তে ছুঁড়তে ফাঁড়ির ভিতরে প্রবেশ করে।
এসময় তারা ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই লেয়াকত আলীর মাথায় ও গলায় ধারালো অস্ত্র ধরে জিম্মি করে সব পুলিশ সদস্যকে ব্যারাকে আশ্রয় নিতে বাধ্য করে। পরে ফাঁড়ির হাজতখানার চাবি ছিনিয়ে নিয়ে আলতাফ হোসেনকে মুক্ত করে তারা শ্লোগান দিতে দিতে চলে যায়। পথে বাজার করতে আসা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক উত্তর ক্ষেত্রপাড়া গ্রামের মৃত জিয়ামোদ্দীন খাঁর ছেলে আব্দুল মোতালেবকে সামনে পেয়ে ধারলো অস্ত্র দিয়ে তাকে কুপিয়ে জখম করে। পরে তারা সরসকাটি বাজারের আওয়ামী সমর্থকদের ৮ টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাংচুর করে।
বাজারের ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান, জয়দেব সাহা, মশিয়ার মোড়ল, আতিয়ার রহমানসহ আরো অনেকে হামলার সত্যতা স্বীকার করে জানান, জামায়াত-শিবিরের বোমারু সদস্যরা শুধু পুলিশ ক্যাম্প লক্ষ্য করে নয়, বাজারের বিভিন্ন পয়েন্টেও ১০ টি হাত বোমা ও ৩০ টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়।
তবে আসামি ছিনতাইয়ের ঘটনা সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন জেলা পুলিশ সুপার মোল্যা মো. জাহাঙ্গীর ও কলারোয়া থানার অফিসার ইনচার্জ শাহ দারা খান পিপিএম। তারা জানান, আসামি আলতাফ হোসেনকে গ্রেফতারের সাথে সাথে সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে তাকে জয়নগর ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান শেখ ফিরোজ আহম্মেদের জিম্মায় সাময়িক মুক্তি দেয়া হয়। এক প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, জামায়াত নেতা গ্রেফতারের খবরে তাদের দলের নেতাকর্মীরা জর্দার কৌটার মধ্যে করে বাজি ফুটিয়ে ও মিছিল করে এলাকায় আতংক সৃষ্টি করে। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে।
এদিকে পুলিশ দাবি করলেও জয়নগর ইউনিয়ন প্যানেল চেয়ারম্যান ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা শেখ ফিরোজ আহম্মেদ কোন আসামিকে জিম্মায় নেননি বলে দাবি করেছেন।
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, সকাল ১০টার দিকে বাদুরতলা জঙ্গী শাহ মাজার এলাকায় জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা পুলিশের গাড়ি লক্ষ্য করে ককটেল ছুঁড়ে মারে। এতে কনস্টেবল জুয়েল ও মো. হাশেম আহত হন। পুলিশ আত্মরক্ষার্থে কয়েক রাউন্ড গুলি ছুঁড়লে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে বিভিন্ন অলি-গলি দিয়ে পালিয়ে যায়। এ সময় ‘সময়’ টিভির ক্যামেরাম্যান আশরাফুল আলমের ক্যামেরা কেড়ে নিয়ে ভাংচুর করে শিবির কর্মীরা। পুলিশ আশপাশের এলাকায় অভিযান চালিয়ে শিবির সন্দেহে আরিফ ও ইমাম হোসেন নামে দু’জনকে আটক করে।
এদিকে বাদুরতলায় ঘটনার পর জামায়াত-শিবির অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের শেরেবাংলা ও সরওয়ার্দী হলে অভিযান চালিয়ে পুলিশ বিভিন্ন জেহাদি বই ও শিবির সন্দেহে ৫৮ জনকে আটক করেছে। হলের গেট বন্ধ করে বিকালে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে দু’টি হলে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়। এ প্রসঙ্গে নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (কোতোয়ালী) মির্জা আবু সায়েম মাহমুদ জানান, আটককৃতদের পরিচয় যাচাই-বাছাই করার পর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
কোম্পানীগঞ্জ (নোয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, শনিবার গভীর রাতে উপজেলার সিরাজপুর ইউনিয়নের শাহজাদপুর গ্রামের ৯নং ওয়ার্ডের এনু মিয়ার বাড়ির মোদ্দাসেরের ঘরে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা গোপনে বোমা তৈরির সময় হঠাত্ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। বোমা বিস্ফোরণে বিকট শব্দ শুনে এলাকাবাসী জোড়ো হলে শিবিরের কর্মীরা আহতদের নিয়ে পালিয়ে যায়। এ সময় জামায়াত কর্মী সুমন (২৮) গুরুতর আহত হন। পুলিশ খবর পেয়ে তাকে উদ্ধার করে নোয়াখালী জেনারেল হাসাপাতালে পাঠালে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সুমন স্থানীয় রিক্সা মিস্ত্রি আলী আহাম্মদের ছেলে। তিনি বসুরহাট ক্যাডেট মাদ্রাসার গাড়িচালক ছিলেন। চাকরির আড়ালে সুমন বোমা তৈরি করতো বলে এলাকার লোকজন জানিয়েছে।
এদিকে ওই বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় শিবিরের আরো ১০ নেতাকর্মী আহত হয় বলে জানা গেছে। পুলিশের মামলা ও গ্রেফতারের ভয়ে শিবিরের কর্মীরা আহতদের হাসপাতাল-ক্লিনিকে ভর্তি না করে গোপনে চিকিত্সা দিচ্ছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার এবং সামছুদ্দিন মানিক (২৯) ও জামাল উদ্দিন (২৮) নামে দুই শিবির কর্মীকে গ্রেফতার করেছে। আটকদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে ও হত্যার ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। নোয়াখালী পুলিশ সুপার আনিছুর রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
এ ব্যাপারে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাজেদুর রহমান (সাজিদ) জানান, এ ঘটনার সাথে স্থানীয় জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা জড়িত। তারা বড় ধরনের নাশকতা সৃষ্টির জন্য এ বোমা তৈরি করছিল। ঘরের মালিক মোদ্দাসের জামায়াতের একজন সক্রিয় কর্মী বলে আমরা জেনেছি।
তবে যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে তারা জামায়াত-শিবিরের কোন সদস্য নয় বলে দাবি করেছেন উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন।
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, কেন্দ্রিয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে দুপুুরে শহরে লাঠিসোটা নিয়ে ঝটিকা মিছিল করে জামায়াতে ইসলাম ও ছাত্র শিবির। ওই মিছিল থেকে সড়কে পেট্রোল ঢেলে ও টায়ারে আগুন দেয়া হয়। মিছিল থেকে পুলিশ ২ জনকে আটক করেছে।
এদিকে বরিশাল, ঝিনাইদহসহ বিভিন্ন জেলা সদর থেকে জামায়াতের বিক্ষোভ মিছিল হওয়ার খবর পাঠিয়েছেন ইত্তেফাক প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা। তবে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে জামায়াতের মিছিল পণ্ড করে দিয়েছে পুলিশ।