লোক দেখানো শোকে আমি বিশ্বাসী নই

সাঁইদের মৃত্যু নেই

সকাল থেকে ফোন, বিবিসি, সিএনএন, এনডিটিভি থেকে শুরু করে বাংলাদেশের প্রায় সব কটি চ্যানেল ও মিডিয়া কর্মীর ফোন, আব্দুর রহমান বয়াতীকে নিয়ে আমার মূল্যায়ন তারা প্রচার করতে চায়। আমি তার মৃত্যু সংবাদে ব্যথিত সংকুচিত। এই মানুষটার সাথে আমার হাজার স্মৃতির কারবার। এর ভেতর কোনো স্বার্থ নেই, ছিল না কোনোদিন। কিন্তু আমিই এত বড় বয়াতীর জন্য কীইবা করেছি, তাকে নিয়ে মূল্যায়নের প্রধান মানুষ হিসেবে সবাই ভেবে নিচ্ছেন। সত্যিই কথা িবলতে কী, সারাটাদিন আমার গুমোট মনে নিয়ে কাটাতে হয়েছে। উনি তো ২০০১ থেকে অসুস্থ। সেই অসুস্থ হওয়ার আগে আগে তার জন্য চ্যারিটি কনসার্টের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। দুঃখের সাথে জানাতে আমার আপত্তি নেই যে, তখন অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যান্ড আমার কথায় অগ্রাহ্য করেছেন। একজন বাউলের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে গাইতে চাননি। এ দেশে আমি যখন মিউজিকের কিছুই বুঝি না, সেদিন থেকেই তিনি কিংবদন্তি। এরপরও একার উদ্যোগে সেই কনসার্টে সফল হয়েছিলাম। আমার প্রাণের বড় ভাই রহমান বয়াতীকে কিছু টাকাও তুলে দিতে পেরেছিলাম। বিটিভির মোস্তাফিজুর রহমান ভাইয়ের একটি আইডিয়া থেকেই আমাদের বয়াতী ও মাকসুদের মিলন হয়, তৈরি হয় মিলন মেলা। তখন শুভেচ্ছা অনুষ্ঠানে দুজনার ফিউশন গানের একটি এক্সপেরিমেন্টে আমাদের এই নীরিক্ষাধর্মী এই গান তৈরি হয়। পরবর্তীতে সাউন্ডটেকের ব্যানারে আমাদের দুজনার সিঙ্গেলস ‘বাউলিয়ানা’ তো বিশ্বের কাছে অন্যতম একটি উদাহরণ যে, একটি গান ৬০ মিনিট ধরে শুনেছে এবং বাজারে সুপারহিট হয়েছে। এখানে তবুও আমি আমর কোনো কৃতিত্ব দিই না। সব কৃতিত্ব আমার প্রিয় এই বাউলটার। বরং আজও আমি ‘মন আমার দেহঘড়ি’র কারিগর রহমান ভাইয়ের এই গানটি নিয়ে গবেষণা করি। খুঁজতে থাকি এর ভেতরের অর্থ—কী তিনি আসলে বলতে চেয়েছেন। আজও যেন পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা আমার কাছে জানা নেই। কাজে অকাজে তিনি আমার বাসায় অফিসে আসতেন। বলতেন, ‘একলগে ভাত খামু, আড্ডা দিমু, তোর কথা মনে হইল তাই চইলা আইলাম।’ এরপর সেই আড্ডা চলত সুফিবাদ নিয়ে। আহা, কই, পাব আজ তারে। দীর্ঘ রোগ শোকে তিনি যেন মুক্ত হলেন আমাদের এই জরাজীর্ণ মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি থেকে। বারবার আক্ষেপ করে বলতেন, ‘এই মিউজিক কারখানার কি কোনো উন্নতি হইব নারে?’ তার কোনো জবাব আমি দিতে পারিনি। আজও যেমন আমার কাছে এর কোনো সদুত্তর নেই। শুধু সকল মিউজিশিয়ানের প্রতি আমার আকুল অনুরোধ, তার এই ৭০০ বা তারও অধিক অ্যালবামের অগণিত গানের যেন পরিচর্যা আমরা প্রত্যেকে করি। অযথা তার পরিবারের অনুমতি ছাড়া যেন গান ব্যবহার না করি। তাহলেই আমাদের এই সাধক বাউলের আত্মার শান্তি মিলবে।