‘দেহঘড়ির মিস্তরির’ সন্ধানকারী রহমান বয়াতি আর নেই
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০১৩, ২২:৪৮
আজীবন দেহঘড়ির মিস্তরির সন্ধানকারী জনপ্রিয় লোকসঙ্গীত শিল্পী আবদুর রহমন বয়াতি আর নেই। ৭৮ বছর বয়সে তিনি গতকাল ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহে....রাজেউন)। তিনি কোটি কোটি মানুসের হূদয় ছুঁয়েছিলেন গান গেয়ে। অসম্ভব জনপ্রিয় তার গানগুলোর মধ্যে ছিল:‘মন আমার দেহঘড়ি সন্ধান করি, কোন মিস্তরি বানাইয়াছে’..... ‘এই পৃথিবী যেমন আছে তেমনি ঠিক রবে, সুন্দর এ পৃথিবী ছেড়ে একদিন চলে যেতে হবে.....’। সত্যি সত্যিই তিনি এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন।
মাত্র ১০ বছর বয়সে সঙ্গীতের টানে ঘর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া শিশুটি এক সময় পরিণত হন কিংবদন্তি শিল্পীতে। সুরের ভেলায় চড়ে শুধু দেশই নয়, ঘুরে বেড়িয়েছেন পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তর। দীর্ঘ রোগ ভোগের পর গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ৭টায় তিনি জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তিনি রেখে গেছেন স্ত্রী খাতুন জারা, তিন ছেলে মো. মহিউদ্দিন, মো. আলম ও মো. আজিম; তিন মেয়ে শুকতারা, নূরজাহান ও রুনা বেগম। তিনি রেখে গেছেন অসংখ্য ভক্ত, অনুরাগী ও গুণগ্রাহী।
তার মৃত্যুতে সংস্কৃতি অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেত্রী, সংস্কৃতি মন্ত্রী, জাতীয় পাটি (জেপি)সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে।
আবদুর রহমান বয়াতির মেজো ছেলে আলম বয়াতি ইত্তেফাককে বলেন, ‘দীর্ঘদিন যাবত্ আব্বা ফুসফুসের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি জটিলতাসহ নানা বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন। গত জুলাই মাসের ১৮ তারিখে তাকে হাসপাতাল ভর্তি করা হয়। তখন থেকেই তাকে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। গতকাল সকাল সাড়ে ৭টায় তার লাইফ সাপোর্ট খুলে দেয়া হয়।’ আবদুর রহমান বয়াতি হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. এ কে এম শফিকুর রহমানের অধীনে চিকিত্সাধীন ছিলেন।
সকালে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন
আলম বয়াতি জানান, আব্বার মরদেহ বারডেম হাসপাতালের হিমাগারে রাখা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার সকাল ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য মরদেহ রাখা হবে। বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর নিয়ে যাওয়া হবে মাতুয়াইল মৃধাবাড়িতে এলাকায়। সেখানে একটি ভাড়া বাড়িতে তিনি থাকতেন। তৃতীয় জানাযা হবে দয়াগঞ্জ নতুন রাস্তা বেগমগঞ্জ নূরে মসজিদে বয়াতির শেষ ইচ্ছানুযায়ী দয়াগঞ্জ পঞ্চায়েত কবরস্থানে বাবা-মায়ের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হবে।
সকালে মৃত্যু খবর ছড়িয়ে পড়লে শোকের ছায়া নেমে আসে দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে। দুপুর পর্যন্ত মরদেহ থাকে জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে। এ সময় আবদুর রহমান বয়াতিকে দেখতে আসেন আব্দুল কুদ্দুছ বয়াতি, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে দলের যুগ্ম-মহাসচিব আমানউল্লাহ আমান, সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক গাজী মাজহারুল আনোয়ার ও জাসাস নেতা চিত্রনায়ক উজ্জল।
ক্ষোভ প্রকাশ করে বয়াতির মেজো ছেলে আলম বয়াতি বলেন, ‘আব্বা সারাজীবন শুধু দিয়েই গেছেন। জীবনের ৬৭টি বছর তিনি গানের জন্য নিজেকে উত্সর্গ করেছেন। সেই আব্বাকে দেখতে কেউ আসল না। আব্বা সরকারের পক্ষ থেকেও কখনো কোন সম্মাননা পাননি।’ তিনি সরকারের সহযোগিতা কামনা করে বলেন, ‘আমাদের নিজেদের থাকারও কোন জায়গা নেই। এ অবস্থায় আমরা আমাদের পরিবারের ভবিষ্যত্ নিয়েও শঙ্কিত। একই সঙ্গে তাদের প্রচুর ঋণও আছে।
আবদুর রহমান বয়াতিকে শেষবারের মতো দেখতে এসে আব্দুল কুদ্দুছ বয়াতি বলেন, ‘১৯৭৮ সালে আমি প্রথমবারের মতো ঢাকায় এসে তার বাড়িতেই উঠি। তিনি আমাকে নিজের ছোট ভাইয়ের মতো দেখতেন। তার আশীর্বাদ ও সহযোগিতার কারণেই আমি আজকের এই অবস্থানে। তাকে নিয়ে অনেক আনন্দ-বেদনার স্মৃতি রয়েছে, যা বলে শেষ করা যাবে না।’
কিছুটা ক্ষোভ নিয়ে তিনি সরকার ও শিল্পী সমাজের কাছে অনুরোধ রেখে বলেন, ‘এভাবে একজন শিল্পীকে চলে যেতে দেবেন না। কি নিদারুণ কষ্টে, অনাদরে চলে গেলেন তিনি। এভাবে যেন আর কোন শিল্পীকে চলে যেতে না হয়। বিষয়টি সবার লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন।’
বাউল গান নিয়ে সমগ্র দেশ-বিদেশ চষে বেড়িয়েছেন তিনি। ১৯৮২ সালে আবদুর রহমান বয়াতি নিজ নামে গড়ে তোলেন বাউল দল। তিনি দোতরা, হারমোনিয়াম, খঞ্জনি ও ভায়োলিন বাজাতেন চমত্কার। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, কানাডা, চীন, সাবেক সোভিয়েট ইউনিয়নসহ ভ্রমণ করেছেন অনেক দেশ। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারের বিশেষ গ্রেডের শিল্পী ছিলেন তিনি। ‘কসাই’, ‘অসতী’ ও ‘হূদয় থেকে হূদয়’ নামে তিনটি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন তিনি। ঐ তিনটি ছাড়াও কণ্ঠ দিয়েছেন ‘গুনাহগার’ ও ‘শঙ্খনীল কারাগার’ চলচ্চিত্রে। ‘পরানের গহীনে’ নামের একটি নাটক ও খান আতাউর রহমানের পরিচালনায় ‘ফারাক্কা’ নামের একটি ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্রেও তিনি অভিনয় করেন।
১৯৩৯ সালের পহেলা জানুয়ারি ঢাকার সূত্রাপুর থানার দয়াগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন আবদুর রহমান বয়াতি। বাবা তোতা মিয়া, মা আজমেরী বেগম। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। মাত্র দশ বছর বয়সেই সুরের নেশায় ঘর ছেড়ে পালিয়ে যান বয়াতি। ফলে অষ্টম শ্রেণির পর আর পড়ালেখা হয়নি তার। কিন্তু জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি রচনা করে গেছেন একের পর এক জীবনমুখী গান। তার গানের গুরু ছিলেন কবি আলাউদ্দিন বয়াতি। তার পাঁচশটিরও বেশি অডিও গানের অ্যালবাম রয়েছে। এছাড়া পাঁচটি মিক্সড অ্যালবাম ও তিনটি ভিডিও অ্যালবাম রয়েছে। ‘মন আমার দেহঘড়ি সন্ধান করি’ ছাড়াও তার অসংখ্য জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে— ‘মরণের কথা কেন স্মরণ করো না’, ‘মা আমেনার কোলে ফুটল ফুল’, ‘দিন গেলে আর দিন পাবি না’, ‘ঘুড্ডি হয় তিনতলা’, ‘হাটের মাঝে ভাঙল হাঁড়ি’, ‘পিরিতে কইরাছে কাঙালি’, ‘একদিন চিঠি দিয়ে, ‘আমার মাটির ঘরে’, ‘এত সুন্দর রংমহল ঘর’, ‘আমি মরলে কেন’, ‘আমার এত সাধের রংমহল ঘর ইঁদুরে কেটে বিনাশ করতেছে’, ‘আমার মাটির ঘরে ইঁদুর ঢুকেছে’ ইত্যাদি।
১৯৯৫ সালে ফিডব্যাকের সঙ্গে বের হয় ‘দেহঘড়ি’ নামে একটি অ্যালবাম। শুধু একটি গান দিয়ে অ্যালবামটি সাজানো হয়েছিল। এটি বাংলাদেশের বাউল সঙ্গীত অ্যালবাম প্রকাশের একটি মাইলফলক হিসেবে এখনো পরিচিত।
মাটি ও মানুষকে উপজীব্য করেই বেশিরভাগ গান বেঁধেছেন আবদুর রহমান বয়াতি। স্বকীয় গায়কীর কারণে দেশে ও বিদেশে অগণিত শ্রোতা রয়েছে তার। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের আমন্ত্রণে একবার হোয়াইট হাউসে আয়োজিত জাঁকালো অনুষ্ঠানেও গান গেয়ে মুগ্ধ করেছিলেন শ্রোতাদের।
আবদুর রহমান বয়াতি শুধু গান গেয়েই নয়, বিজ্ঞাপনচিত্রে অভিনয় করেও মানুষকে সচেতন করেছেন। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য বিজ্ঞাপনচিত্রের মধ্যে রয়েছে—হাঁস-মুরগির খামার, নিরক্ষরতা, শিশুশিক্ষা, পঞ্চম জাতীয় পোলিও টিকা দিবস, বনের শোভা পশু- পাখি, ধূমপানবিরোধী বিজ্ঞাপন, নির্বাচনী প্রচারণা, খরার সময়ে বৃষ্টির প্রয়োজন, পরিবার পরিকল্পনা ইত্যাদি বিষয়ে।
তিনি রাষ্ট্রীয় কোন পদক বা সম্মান না পেলেও ৬৭ বছরের বর্ণাঢ্য সঙ্গীত জীবনে পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। এর মধ্যে রয়েছে—সিটিসেল চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড, সোলস অ্যাওয়ার্ড, শিল্পকলা একাডেমী গুণীজন সংবর্ধনা, নজরুল একাডেমী সম্মাননা, স্বদেশ ও সংস্কৃতি স্বর্ণপদক, বাংলাদেশ সোসাইটি অব নিউ জার্সি, জাগরিণী শিল্পীগোষ্ঠী (আমেরিকা) ইত্যাদি।
২০০৩ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ টেলিভিশনে একটি অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশনের সময় অসুস্থবোধ করেন আবদুর রহমান বয়াতি। এরপর জীবনে আর কোনো অনুষ্ঠানে গান গাইতে পারেননি তিনি।
শোক প্রকাশ
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লোকসঙ্গীত শিল্পী আবদুর রহমান বয়াতির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। শোকবার্তায় তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গীত ভুবনে বিশেষ করে বাউল গানে আবদুর রহমান বয়াতির অবদানের কথা অনস্বীকার্য। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতের অপূরণীয় ক্ষতি হলো। জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। শোকবাণীতে স্পিকার বলেন, বাউল সম্রাট আবদুর রহমান বয়াতি ছিলেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি লোকজ সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র।
বিএনপি চেয়ারপারসন, জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া তার শোকবার্তায় আব্দুর রহমান বয়াতিকে মহান সঙ্গীত সাধক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তার গান এদেশের মানুষের হূদয় স্পর্শ করেছিল। জারি-সারি-বাউল-ভাটিয়ালীসহ আবহমান বাংলাদেশের লোকজ সঙ্গীত ছিল তার সাধনা। সঙ্গীতে তিনি ছিলেন উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার মৃত্যুতে দেশ হারালো একজন বরেণ্য গুণী শিল্পীকে, যার অভাব সহজে পূরণ হবার নয়।
ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী শোকবাণীতে বলেন, তার মৃত্যুতে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। এ ক্ষতি কোনভাবেই পূরণ হবার নয়।
আব্দুর রহমান বয়াতির মৃত্যুতে জাতীয় পার্টি-জেপি’র মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। এক বিবৃতিতে জেপি মহাসচিব বলেন, আব্দুর রহমান বয়াতি একজন জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী ছিলেন। তার মৃত্যুতে দেশের লোকসঙ্গীতের এক অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হলো এবং দেশবাসী একজন পথিতযশা সঙ্গীত শিল্পীকে হারালো। বিবৃতিতে তিনি মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।
তার মৃত্যুতে আরো যারা শোক প্রকাশ করেছেন তাদের মধ্যে আছেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় গীতিকবি পরিষদ ও জিয়া সাংস্কৃতিক সংগঠন (জাসাস)।