সর্বনাশা নেশার ছোবল

মাদক আগ্রাসন যুবসমাজকে কোন পথে নিয়ে যাচ্ছে সে প্রশ্ন এখন প্রবল। মাদকের কুপ্রভাব যেভাবে বিস্তৃত হয়ে পড়ছে তাতে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না। এ সর্বনাশা নেশা বিশেষভাবে ছড়িয়ে পড়েছে ধনাঢ্য পরিবারের সন্তানদের মাঝে। ইদানীং এ নেশা মধ্যবিত্ত এমনকি দরিদ্র পরিবারেও বিস্তার লাভ করেছে। নেশার জন্য অনেকে দুর্বৃত্তপনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়। নেশার টাকা জোগাড় করতে হাইজ্যাকসহ দস্যুপনার সঙ্গেও জড়িত হচ্ছে। ফেন্সিডিল, ইয়াবা, ভায়াগ্রার জীবনবিনাশী আগ্রাসনের শিকার হয়ে দেশের যুবসমাজ নৈতিক ও শারীরিক ভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। দেশের সীমান্তরক্ষীদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে মাদকের গডফাদাররা সীমান্তের পেশাদার, দাগী চোরাকারবারিদের মাধ্যমে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার মাদক দেশের ভেতরে নিয়ে আসছে আর আমাদের যুবসমাজ ক্রমাগতভাবে মাদকের ভয়াবহ ছোবলে ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। সরকারের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের আইনানুগ মনিটরিংয়ের অভাবে মাদকের দেশি-বিদেশি সিন্ডিকেট সারাদেশেই অতি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে সারাদেশে এনার্জি ড্রিংকসের নামে নানা ধরনের নানা নামের নেশা জাতীয় তরল মাদক দ্রব্যের উত্পাদন ও বিপণন দিন দিন বেড়েই চলেছে। পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, দেশের উত্তরাঞ্চলের অন্তত ১৬টি জেলায় অবাধে বিক্রি হচ্ছে এসব ড্রিংকস। জেলা-উপজেলা সদর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মুদি দোকানেও ছড়িয়ে পড়েছে এসব যৌন উত্তেজক পানীয়। বাজারে প্রচলিত অন্যান্য এনার্জি ড্রিংকসের পুরনো বোতলের ওপরে নানা রকমের নজরকাড়া ও মনোলোভা লেবেলে বাহারি সব নাম দিয়ে অবাধে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা মূল্য ৪০ থেকে ১০০ টাকা। উঠতি বয়সের তরুণরাই এর প্রধান টার্গেট ও ক্রেতা। বেনামি কোম্পানির অসাধু মালিকরা এসব এনার্জি ড্রিংকসকে ‘ফুড সাপ্লিমেন্ট ’ বলে দাবি করলেও এগুলো মূলত যৌন উত্তেজক ওষুধ এবং কেমিক্যাল মিশিয়ে বানানো নেশাদ্রব্য। রাজশাহী, নওগাঁ, দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া, নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জসহ উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতেই শুধু নয়, রাজধানী ঢাকা মহানগর থেকে শুরু করে কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা ও বরিশালসহ সারাদেশেই নানা নামে ছড়িয়ে পড়েছে অবৈধ মাদক ও যৌন উত্তেজক সামগ্রীর রমরমা বাণিজ্য। ইতিপূর্বে এনার্জি ড্রিংকসের অবৈধ ব্যবসা ও আগ্রাসন নিয়ে পত্র-পত্রিকায় অনেক লেখালেখি ও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। অবৈধ মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের পক্ষ থেকে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণের খবর প্রকাশিত হলেও আজ পর্যন্ত এ বিষয়ে তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। বরং লাগামহীন প্রচারণার কারণে তরুণ-যুবকরা সহজেই আকৃষ্ট ও আসক্ত হয়ে পড়ছে এসব পানীয়ের প্রতি। সাময়িক উত্তেজনার জন্য এসব যৌন উত্তেজক পানীয় পান করলেই এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে খুব অল্পদিনের মধ্যেই যুবকরা স্বাভাবিক যৌনশক্তি হারিয়ে ফেলছে এবং কিডনি ও লিভারসহ নানাবিধ জটিল স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে বলে চিকিত্সক ও বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। আমাদের যুবসমাজের প্রাণশক্তি ও উদ্দীপনা দেশ ও জাতির অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য। তারুণ্যের শক্তি যেমন দেশ ও জাতিকে উন্নয়ন ও অগ্রগতির উচ্চ শিখরে নিয়ে যেতে পারে, ঠিক তেমনি এর উলটোটি দেশ ও জাতির অপূরণীয় ক্ষতির কারণও হতে পারে। যে কোনো নেশাজাতীয় দ্রব্যের প্রতি যুবসমাজের আসক্তি তার প্রাণশক্তিকে অকালে নষ্ট করার পাশাপাশি তাকে অসামাজিক ও ধর্মবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে তাড়িত করে এবং ক্রমে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করায়। তরুণ সমাজের একটি অংশ যৌন উত্তেজক ওষুধ ও নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণের পাশাপাশি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল, ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোনের অপব্যবহারের মাধ্যমে পর্ণোগ্রাফিতেও আসক্ত হয়ে পড়ছে। এর ফল হিসেবে দিনকে দিন ইভটিজিং, অপহরণ, ধর্ষণ, খুন, গুম ও অপমৃত্যুর হার বেড়ে চলেছে। নেশার ছোবলে যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয় এবং সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয় দেশ ও জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে ব্যাহত করছে। রাজধানী ঢাকাসহ মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে হেরোইন, ইয়াবা ও ফেন্সিডিলসহ সব ধরনের নেশাদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এনার্জি ড্রিংকস ও ফুড সাপ্লিমেন্টের নামে মানবজীবন বিনাশী ড্রিংকস তৈরি ও বিপণন বন্ধে সরকার, সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহ কেন ব্যর্থ হবে? দেশের যুবসমাজকে সর্বনাশা নেশার ছোবল থেকে রক্ষায় সরকার ও সংশ্লিষ্টদের কি কোনো দায়-দায়িত্ব নেই? আমরা দেশের যুবসমাজকে নেশার ছোবল থেকে সুরক্ষায় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা চাই। ঢাকা