অভাব-অনটনে দিন কাটে জজ মিয়ার

২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট বহুল আলোচিত গ্রেনেড হামলা মামলার ঘটনায় বিনা অপরাধে গ্রেফতার হওয়া আলোচিত সেই দিনমজুর জজ মিয়া এখন অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করে জীবন পার করছেন। দেশ টিভির কল্যাণে পাওয়া গাড়িচালকের চাকরি থেকে মাত্র সাত হাজার টাকায় কোন মতে চলে তার চার সদস্যের সংসার। কেউই তার খোঁজ নেয় না। অথচ তাকে আসামি বানানো নাটকের রূপকাররা এখনও রয়ে গেছেন বহাল তবিয়তে। সিআইডির সাজানো নাটকে তার জীবন থেকে চারটি বছর (কারাগারে বন্দি) হারিয়ে গেছে। সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে তার পরিবার। তাই অন্তত সামনের দিনগুলোতে ভালভাবে জীবন-যাপন করতে জজ মিয়া ও তার পরিবারকে সামাজিকভাবে পুনর্বাসনের দাবি উঠেছে। একটি সরকারি চাকরি ও বাসস্থানের দাবি জানিয়েছে তার পরিবার। ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর ঘটনা ভিন্নখাকে প্রবাহিত করার জন্য ২০০৫ সালের ৯ জুন নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার গ্রাম থেকে দিনমজুর সহজ-সরল জজ মিয়াকে গ্রেফতার করে সিআইডি। সাজানো হয় আলোচিত ‘জজ মিয়া নাটক’। এ মামলায় দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী বানিয়ে সিআইডির তত্কালীন তিন কর্মকর্তা (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) জজ মিয়াকে দিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও আদায় করে নেন। বিনিময়ে তার মাকে প্রতি মাসে সংসার খরচের জন্য দুই হাজার টাকা করে নিয়মিত প্রদান করেন তারা। জজ মিয়াকে গ্রেফতার করে আনার সময় তার মা জোবেদা খাতুনকে সিআইডির সে সময়ের বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, সহকারি পুলিশ সুপার মুন্সি আতিক ও আব্দুর রশীদ বলেছিলেন, ‘আপনার ছেলেকে ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছি। তাকে ভাল চাকরি দিব, আপনারা সুখে থাকবেন।’ অশিক্ষিত জোবেদা খাতুন সুখে থাকার আশ্বাসে সরল বিশ্বাসে তা মেনে নেন। কিন্তু এক পর্যায়ে আসল ঘটনা ফাঁস হয়ে যাওয়ায় কর্মকর্তারা টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেন। সেই সময় এ নিয়ে দেশব্যাপি সমালোচনার ঝড় উঠে। পরে ২০০৯ সালের ২৬ জুলাই জেলহাজত থেকে ছাড়া পান জজ মিয়া। বিনা অপরাধে তার জীবন থেকে হারিয়ে যায় মূল্যবান চারটি বছর। এদিকে জজ মিয়া গ্রেফতারের পর তার সংসারে নেমে আসে চরম অর্থকষ্ট। অর্ধাহার-অনাহারে জীবন কাটে তার বৃদ্ধা মা, এক বোন ও ভাইয়ের। জোবেদা খাতুন গ্রামের বাড়ি ছেড়ে বাঁচার তাগিদে ঢাকায় চলে আসেন। গতকাল মঙ্গলবার ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপ কালে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি জানান, ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ হয়েছে। আমার ছেলে নির্দোষ হিসেবে বের হয়ে এসেছে। কিন্তু ছেলের অনুপস্থিতিতে আমার সংসার ছাড়খার হয়ে গেল। সেই অপূরণীয় ক্ষতি আজও পূরণ হয়নি। অভাব তাদের পিছু ছাড়ছে না। জজ মিয়া বলেন, ২১শে আগস্ট আসলে আপনারা আমাকে স্মরণ করেন। কিন্তু একমাত্র দেশটিভি ছাড়া আমার পাশে কেউ এসে দাঁড়ায়নি। বর্তমান সরকার একটু সুনজর দিলে আমার পরিবার একটা মাথা গোঁজার ঠাই পেতো। তিনি আরো বলেন, গরীবের জন্য আল্লাহ ছাড়া কেউ নেই। তিনিই এখন একমাত্র ভরসা। সামাজিকভাবে পুনর্বাসনের জন্য তাকে একটি বাসস্থান ও একটি সরকারি চাকরি দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি বিনীত আবেদন জানিয়েছেন জজ মিয়া। এদিকে জজ মিয়া নাটকের রুপকারদের সম্পর্কে সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ সুপার কাজী রওনাকুল হাসান বলেন, আলোচিত গ্রেনেড হামলার ঘটনা ভিন্নখাতে প্রভাবিত করার জন্য সিআইডির সাবেক ওই তিন কর্মকর্তা ‘জজ মিয়া নাটক’ সাজান- ওটা তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট প্রদান করা হয়েছে। তবে তারা বর্তমানে জামিনে রয়েছেন বলে তিনি জানান। অভিযুক্ত তিন সিআইডি অফিসারের শাস্তি দেখে যেতে চান জজ মিয়ার মা সেনবাগ (নোয়াখালী) সংবাদদাতা খোরশেদ আলম জানান, জজ মিয়ার বর্তমান দূরবস্থা নিয়ে তার গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার বীরকোর্ট গ্রামের লোকজনও হতাশ। অভাব-অনটনের কারণে বীরকোর্ট গ্রামের বাড়ি বিক্রি করে দিয়েছে জজ মিয়ার পরিবার। গত দুই বছর ধরে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সে নারায়ণগঞ্জের চিটাগাং রোড এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকে। মাত্র ৭ হাজার টাকা মাসিক বেতনে জজ মিয়া ‘দেশ টিভি’ অফিসের মাইক্রোবাস চালক হিসেবে চাকরি করছেন। কিন্তু এই টাকায় তার সংসার চলে না। ভাবছেন অন্য কোথাও একটি ভাল বেতনে চাকরি পেলে দেশ টিভির চাকরি ছেড়ে দেবেন। জজ মিয়া বর্তমান সরকার প্রধানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই প্রতিনিধিকে বলেন, টাকা-পয়সা ও বাড়িঘর না থাকার কারণে নিজে বিয়েও করতে পারেননি। ছোট বোনের বিয়েও দিতে পারেননি। জজ মিয়ার মা জোবেদা খাতুন বলেন, যেই সিআইডি অফিসাররা তার নির্দোষ ছেলেকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে ফকির বানিয়েছে, তিনি বেঁচে থাকতে যেন তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেখে যেতে পারেন।