মূল ফিচার

ভালোবাসার গল্পে তারা...

একজন অভিনয়শিল্পীকে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে যতটা কষ্ট করতে হয় তার চেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয় সেই জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে। জনপ্রিয় একজন শিল্পীর কাছে দর্শকদের প্রত্যাশার মাত্রা দিনকে দিন বাড়তে থাকে—কথাটি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন তিশা। নিজের অর্জিত অবস্থানকে ধরে রাখার পাশাপাশি তা আরও সমৃদ্ধ করতে তিনি এখন নিজের ভাবনা ও কাজের ধারা পাল্টে ফেলেছেন। প্রথমেই মুখ খুললেন তিশা। মৃদু হেসে তিনি বলেন, ‘অভিনয়শিল্পীরা আসলে একটু লোভী প্রকৃতির হয়। একটি চরিত্রে কাজ করার পর মনে হয় ওই চরিত্রে যদি কাজ করতে পারতাম। চরিত্র চুজিংয়ের কোনো শেষ নেই। এই হিসেবে আমরা অনেকটা নিডি টাইপের। আমি এখন ভিন্ন চরিত্র কাজ করতে আগ্রহী। আনকমন, অফট্র্যাকের কিছু স্ক্রিপ্ট আমি খুঁজছি। যে স্ক্রিপ্টে ইমোশন আছে, ট্র্যাজেডি, রোমান্স, বেসিক্যালি রিয়েলিটি আছে—এ ধরনের কাজ খুঁজছি। দু’জন ছেলেমেয়ে কাছাকাছি হলো... একে অপরকে ফুল দিল... তাদের প্রেম হলো—এ ধারার কাজের প্রতি আমি আর আগ্রহী নই। আমার দর্শকরাও নিশ্চয়ই আমার কাছে এখন ভিন্নধর্মী কাজ আশা করেন।’ এবার নিশোর বলার পালা। তিনি বলেন, ‘আমি বরাবরই চরিত্রের ব্যাপারে একটু চুজি। অভিনয়ের জায়গা আছে, এমন চরিত্রে কাজ করতে ভালো লাগে। একটি চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে যতটা শ্রম দিতে হয় তাই দিতে চেষ্টা করি। কোনো চরিত্রে অভিনয় করে যদি নিজেই সন্তুষ্ট হওয়া না যায়, তবে তা কখনও দর্শকের মন জয় করতে পারে না।’ তিশার শুরুটা হয়েছিল বিটিভির ‘নতুন কুঁড়ি’ দিয়ে। একসময় গায়িকা হওয়ার ইচ্ছে থাকলেও সময়ের প্রেক্ষাপটে আজ তিনি এ প্রজন্মের শীর্ষ অভিনেত্রীদের মাঝে একজন। নতুন শতাব্দীর শুরুতে বন্ধুদের নিয়ে গানের দল গড়লেও খুব একটা এগিয়ে যেতে পারেননি তিনি। তবে গানের ভালোবাসাটা এখনও রয়ে গেছে। তার আগে অবশ্য হঠাত্ করেই মেরিল লিপজেলের টিভিসির মাধ্যমে মডেল তিশার আত্মপ্রকাশ ঘটে। দর্শকনন্দিত এই বিজ্ঞাপনটির পর কেয়া কসমেটিকসের কয়েকটি টিভিসি, বিশেষ করে নোবেলের সাথে পারফর্ম করার পর তারকা মডেল হওয়ার খ্যাতিটাও হাতের মুঠোয় বন্দী করেন তিনি। এ কথা বললে বোধ করি কোনো অত্যুক্তি হবে না যে, এমন কিছু বিজ্ঞাপনই তিশার ক্যারিয়ারকে করেছিল আলোকোজ্জ্বল। ৯৭-তে অনন্ত হীরার রচনা ও আহসান হাবীবের প্রযোজনায় ‘সাতপৌরে কাব্য’ নামক টিভি নাটকে অভিনেত্রী তিশার অভিষেক ঘটার পর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। নিজের মেধা ও অধ্যবসায়ের মেলবন্ধনে একে একে করে গেছেন দর্শকপ্রিয় অসংখ্য নাটক। সময়টা এখন এমনি হয়েছে যে, পর্দায় তিশার উপস্থিতি দেখেই দর্শক টিভি সেটের সামনে বসেন। তাই তো কাজের প্রতি বেশ সচেতন হালের জনপ্রিয় এই অভিনেত্রী। নাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি এই জনপ্রিয় দুই অভিনেতা-অভিনেত্রী চলচ্চিত্রেও নিজেদের অভিনয়ের মুগ্ধতা ছড়িয়ে দেন। অপরদিকে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ ছবিতে কাজ করে তিশা দর্শকদের ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেন। ছবিটি এশিয়ার অন্যতম দুটি চলচ্চিত্র উত্সব—পুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সব ও আবুধাবির মিডল ইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শিত হয়েছে। এরপর তিনি মোস্তফা সরয়ার ফারুকী পরিচালিত ‘টেলিভিশন’ ছবিতে অভিনয় করেন। তিশা একটি কথা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন। তা হলো—কোনো শিল্পী যদি তার কাজটাকে অবহেলা করেন, কিংবা গুরুত্ব দিয়ে না করেন, তাহলে একসময় কাজও তাকে অবহেলা করে দূরে চলে যায়। আর এ কারণেই তারা যখন অভিনয় করেন, তখন সেখানে নিজের মনপ্রাণ সঁপে দেন। অন্যদিকে ছোটবেলা থেকে শোবিজ মিডিয়ার প্রতি তার কোনো আগ্রহ ছিল না। ২০০৩ সালে হঠাত্ করেই র্যাম্পে মডেল হিসেবে কাজ শুরু করেন। টানা তিন বছর র্যাম্পে কাজ করার পর নিজের স্বপ্নকে আরও প্রসারিত করতে বিজ্ঞাপনচিত্রে মডেল হিসেবে পারফর্ম করেন। তার উল্লেখযোগ্য বিজ্ঞাপনচিত্রগুলো হলো—মেরিল পাউডার, ডাবল কোলা, একটেলের টেন সেকেন্ড পালস, গুন গুন, আরবান, গোল্ডেন কয়েন, ক্লোজআপ ক্রিস্টাল, সোহাগ পরিবহন, সিলন টি, বসুন্ধরা টিস্যু, অনিক টেলিকম, জুুঁই, মোবাইল ওয়ান, সানসিল্ক, কুল ডিওডোরেন্ট, তিব্বত পাউডার, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, জুঁই কোকোনাট অয়েল, ম্যাক্স ফেয়ারনেস বাইক অফার, তিব্বত পাউডার প্রভৃতি। মডেলিং ছাড়াও নিশো অভিনয়ে নাম লিখিয়েছেন অনেক আগেই। তার উল্লেখযোগ্য নাটকগুলো হলো—ধারাবাহিক কায়সার আহমেদের ‘উত্তরাধিকার’ ও ‘ফ্যামিলি অ্যাফেয়ার’, এজাজ মুন্নার ‘নিউ জেনারেশন’, অম্লান বিশ্বাসের ‘নো প্রবলেম’, মুরাদ পারভেজের ‘মানবজমিন’ ও ‘রেস্টুরেন্ট ২১’, গোলাম সোহরাব দোদুলের ‘সবুজ নক্ষত্র’, এম আর মিজানের ‘রান’, বিপুল রায়হানের ‘নীলার হোটেল’ ও ‘পকেট ভর্তি জীবন’, অরুণ চৌধুরীর ‘রুমালি’ এবং এক খণ্ডের মধ্যে রয়েছে ‘অন্ধ তীরন্দাজ’, ‘ফুটওভার ব্রিজ’, ‘মোহ’, ‘আবার আসিব ফিরে’ প্রভৃতি। চলচ্চিত্রে কাজ করার ইচ্ছা আছে কি না জানতে চাইলে নিশো বলেন, ‘এখন পর্যন্ত অনেক অফার পেয়েছি। তবে মনের মতো পাইনি। চলচ্চিত্র অনেক বড় মাধ্যম। তাই বুঝে শুনে সেখানে নিজেকে জড়াতে চাই। জীবনে একটা ছবি করলেও তা যেন মনের মতো হয়। তাই মনের মতো কাজ পেলে অবশ্যই চলচ্চিত্রে অভিনয় করব। নিজেকেও সেভাবেই তৈরি করছি।’ সাহিত্যে প্রেমের চিরায়ত প্রতীকী কিছু চরিত্র লাইলী-মজনু, রোমিও-জুলিয়েট, দেবদাস-পার্বতী। এ চরিত্রগুলো যদি এই সময়ের আলো-বাতাসে এনে ছেড়ে দেওয়া হয়, কী করবে তারা? কেমন হবে তাদের আচরণ? এসব নিয়ে ‘নীল রঙের গল্প’ নামের ধারাবাহিক নির্মাণ করছেন কৌশিক শংকর দাশ। নাটকে দেবদাস-পার্বতী হয়েছেন নিশো ও তিশা। আর নাটকটি রচনা করেছেন জাকারিয়া সৌখিন। নাটকে চরিত্রগুলো বর্তমান প্রেক্ষাপটে আধুনিক ঢঙে একটি গল্পে এসে একত্রিত হয়েছে। যেখানে দেখা যাবে, দেবদাস-মজনু-রোমিও একই ইউনিভার্সিটির ছাত্র। আর তিনজনের মধ্যে বন্ধুত্বও চরম। তাদের জীবনে প্রেম আসে। ধীরে ধীরে পূর্ণতা পায় দেবদাস-পার্বতী, লাইলি-মজনু এবং রোমিও-জুলিয়েটের প্রেম। ‘নীল রঙের গল্প’ ধারাবাহিকটি গত ২১ আগস্ট থেকে এনটিভিতে প্রচার শুরু হয়েছে। পার্বতী চরিত্রে অভিনয় প্রসঙ্গে তিশা বলেন, ‘নাটকের কনসেপ্টটি অসাধারণ। একেবারে আধুনিকভাবে নাটকটি নির্মিত হচ্ছে। আমি এ নাটকের একটি অংশ। আমার ধারণা নাটকটি দর্শকের পছন্দের তালিকায় থাকবে।’ দেবদাস চরিত্রে অভিনয় প্রসঙ্গে নিশো বলেন, ‘অভিনয়শিল্পীদের জীবনে কিছু স্বপ্নের চরিত্র থাকে। রোমিও তেমন একটি চরিত্র। এমন একটি চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে আমি উচ্ছ্বসিত।’ পরিচালক কৌশিক শংকর দাশ বলেন, ‘এটাই আমার প্রথম ধারাবাহিক নাটক। আর প্রথম ধারাবাহিক নির্মাণ করার জন্য আমি অনেকদিন অপেক্ষা করেছি। কারণ আমি নতুন ধরনের কোনো কনসেপ্ট খুঁজছিলাম। এই কনসেপ্টটি একেবারেই নতুন স্বাদের। দর্শকদেরও নতুন কিছু দেওয়ার জন্য আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। এখন দর্শকের ভালো লাগলে আমার পরিশ্রম সার্থক হবে।’