চলে যাওয়া
দেহঘড়ি ছেড়ে গেলেন
প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০১৩, ১৯:৪৫
আব্দুর রহমান বয়াতি বাংলাদেশের একজন প্রসিদ্ধ লোকসংগীত শিল্পী। তিনি একাধারে অসংখ্য জনপ্রিয় লোকগানের শিল্পী, অসংখ্য বাউল গানের স্রষ্টা, গীতিকার, সুরকার এবং সংগীত পরিচালক। ১৯৩৯ সালে তিনি ব্রিটিশ ভারতের ঢাকার সূত্রাপুর থানার দয়াগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। দয়াগঞ্জ বাজারে তার বাবা তোতা মিয়ার একটি হোটেল ছিল। সেখানে মাঝেমধ্যে অনেক গুণী বাউল শিল্পীর আসর বসত। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে তার ভেতর গানের প্রতি ভালোবাসার সূত্রপাত। এ ছাড়া ছোটবেলা থেকেই বাউল গানের প্রতি ছিল তার অদম্য আকর্ষণ। প্রখ্যাত বাউল শিল্পী আলাউদ্দিন বয়াতী, মারফত আলী বয়াতী, খালেক দেওয়ান, হালিম বয়াতী, রজ্জব আলী দেওয়ান, আলেক দেওয়ান, দলিল উদ্দিন বয়াতীসহ বহু শিল্পী প্রায়ই আসতেন গানের অনুষ্ঠান করতে। বাবার অনুপস্থিতিতে কোনো কোনো দিন মনভরে বাংলার বাউল গান শুনতেন এবং নিজেও রপ্ত করে ফেলতেন। এ পর্যন্ত তার প্রায় পাঁচশ একক গানের অ্যালবাম বের হয়েছে। পাশাপাশি তিনটি মিশ্র অ্যালবামে গান গেয়েছেন তিনি। ছোটবেলা থেকে গান করলেও ১৯৫৬ সাল থেকে পেশাগতভাবে গান শুরু করেন তিনি। দেশীয় ফোক গানের মাধ্যমেই তিনি সর্বমহলে পরিচিতি লাভ করেন। শিল্পী হিসেবে বয়াতি অসংখ্য ফোক গান শ্রোতাদের উপহার দিয়েছেন। ১৯৮২ সালে নিজ নামে আবদুর রহমান বয়াতি আট সদস্যবিশিষ্ট একটি সংগীতের দল গঠন করেন। একক ছাড়াও এই দলের সঙ্গে বয়াতি বাংলাদেশের সর্বস্থানেই স্টেজ শোতে অংশ নিয়েছেন। এ ছাড়া লন্ডন, আমেরিকা, চীন, জাপান, কানাডা, ভারত, অস্ট্রেলিয়াসহ ৪২টি দেশে তিনি ফোক গান পারফর্ম করেছেন। নিজের দীর্ঘ সংগীত ক্যারিয়ারে বয়াতির ৫০০টি একক এবং ২০০টি মিক্সড অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়াও বয়াতি বাংলাদেশ রেডিও, বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ দেশের প্রত্যেকটি বেসরকারি চ্যানেলেই সংগীত পরিবেশন করেছেন নিয়মিত। বিশেষ করে তার গাওয়া ‘মন আমার দেহঘড়ি সন্ধান করি বানায়াছেন কোন মিস্তরি’ গানটি সারাদেশসহ বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ১৯৯৫ সালে তিনি জনপ্রিয় ব্যান্ড ফিডব্যাকের ‘দেহঘড়ি’ নামক অ্যালবামে লোকসংগীতকে ব্যান্ড স্টাইলে তুলে ধরে সর্বমহলে প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। এটি ছিল বাংলাদেশের প্রথম ফোক-ফিউশন অ্যালবাম। বাংলাদেশের একমাত্র শিল্পী হিসেবে আবদুর রহমান বয়াতি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বুশ (সিনিয়র)-এর ডিনার পার্টি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পারফর্মেন্সের জন্য অতিথি হিসেবে হোয়াইট হাউসের আমন্ত্রণ পান এবং তাতে অংশগ্রহণ করেন। সংগীতে অনবদ্য অবদানের জন্য বরেণ্য এ মানুষটি প্রেসিডেন্সিসহ ছয়টি জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন। এ ছাড়া আন্তর্জাতিভাবেও বেশ কিছু পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছেন প্রখ্যাত এই লোকসংগীত শিল্পী। তার উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে রয়েছে ‘মন আমার দেহঘড়ি সন্ধান করি কোন মিস্তরি বানাইয়াছে’, ‘আমি ভুলি ভুলি মনে করি প্রাণে ধৈর্য মানে না’, ‘আমার মাটির ঘরে ইঁদুর ঢুকেছে’, ‘মরণেরই কথা কেন স্মরণ কর না’, ‘মা আমেনার কোলে ফুটল ফুল’, ‘ছেড়ে দে নৌকা মাঝি যাবো নদীয়া’ প্রভৃতি। গত ১৯ আগস্ট সোমবার সকাল সোয়া ৮টার দিকে রাজধানীর ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোডের জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। লোকসংগীতে অসামাণ্য অবদানের জন্য পেয়েছেন, সিটিসেল চ্যানেল আই অ্যাওয়ার্ড, সোলস অ্যাওয়ার্ড, টেলিভিশন দর্শক ফোরাম কর্তৃক লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড, ২০০৬ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির গুণীজন সংবর্ধনা, নজরুল একাডেমি সম্মাননা ২০০৪, সমর দাস স্মৃতি সংসদ অ্যাওয়ার্ড, বাংলাদেশ বাউল সমিতি আজীবন সম্মাননা অ্যাওয়ার্ড, মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুর সমিতি আজীবন সম্মাননা অ্যাওয়ার্ড, ইউএসএ জাগরনী শিল্পীগোষ্ঠী অ্যাওয়ার্ড, স্বরবীথি থিয়েটার বাংলা নববর্ষ ১৪১২ উপলক্ষে সংবর্ধনা ও সম্মাননা, কায়কোবাদ সংসদ আজীবন সম্মাননা, স্পেল বাউন্ড বিশেষ সম্মাননা, বাংলাদেশ বাউল সংগঠনের গুণীজন সম্মাননা পদক, বিক্রমপুর সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী পদক, জাতীয় যুব সাংস্কৃতিক সংস্থার সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতি স্বর্ণ পদক ও আজীবন সম্মাননা-২০০৫, সিটি কালচারাল সেন্টার কর্তৃক গুণীজন সম্মাননা পদক, বাউল একাডেমি পদক, একতা অ্যাওয়ার্ড, লোকসংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য স্বীকৃতি স্বরূপ লোকজ বাউলমেলা পদক ২০০৪ ও ওস্তাদ মোমতাজ আলী খান সংগীত একাডেমি সম্মাননা পদক ২০০৬ ও শ্রেষ্ঠ বাউলশিল্পী অডিও ক্যাসেট পুরস্কার। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ সিনিয়র- এর আমন্ত্রণে হোয়াইট হাউসের এক জমকালো অনুষ্ঠানেও গান পরিবেশন করে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান তিনি।