রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে চ্যালেঞ্জের মুখে অর্থনীতি
প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০১৩, ২৩:০৩
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি এই মুহূর্তে অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। অবকাঠামোগত নিম্নমান বিশেষত সড়ক যোগাযোগ ও অনিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ সরবরাহ, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যের অভাব এবং কর্মসংস্থানের জন্য কৃষির উপর অধিক নির্ভরশীলতা আসছে দিনগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ হায়ে দাঁড়াবে। নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর অসন্তোষও দেশের অর্থনীতির জন্য অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে অধিক পরিমাণে অদক্ষ শ্রমশক্তি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে স্বল্প বরাদ্দের ফলে দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য সেবা নিম্নমানে রয়েছে। দেশে ব্যবসা করার জন্য অতিরিক্ত ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নের সীমিত সুযোগকে বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নয়নে সবার আগে যা দরকার তা হচ্ছে সকল রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে অর্থনীতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পারস্পরিক বিশ্বাস ও সম্পর্কের আস্থা স্থাপন।
দেশের অর্থনীতি নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) এক মূল্যায়নে প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। শেষ হওয়া ২০১২-১৩ অর্থবছরের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সমপ্রতি প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এতে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে ৭টি বিষয়কে তুলে ধরা হয়েছে।
উল্লেখিত ৫টি চ্যালেঞ্জ ছাড়াও দেশের বন্দর ও সমুদ্র পরিবহনের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা ও বিপুল জনসংখ্যার কারণে দেশের অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঋণাত্মক প্রভাব ফেলে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. শামসুল আলম ইত্তেফাককে বলেন, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি অন্য যে কোন সময়ের চাইতে সমৃদ্ধ, স্থিতিশীল এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মুক্ত। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে ভালো এবং অতীতের সমস্ত অর্জনকে তা ছাড়িয়ে গেছে। দেশের বর্তমান গতিশীল অর্থনীতিকে ধরে রাখার জন্য বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রতিবেদনে মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ও খাতওয়ারি অবদানের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ বিগত চার বছরের গড় বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিলো ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু ২০১১-২০১২ অর্থবছর থেকে এটি নিম্নমুখী প্রবণতা প্রদর্শন করছে এবং ২০১২-২০১৩ অর্থবছরের সাময়িক হিসেবে প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্ধারিত প্রবৃদ্ধির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রাসমূহ এখনও অর্জিত হয়নি। এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, কৃষি ও সেবা খাতের অবদান কমে যাওয়া। বিগত ৪ বছরে গড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হারে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি হলেও ২০১২-১৩ অর্থবছরে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ। তবে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি অনেক উত্সাহব্যঞ্জক। বিগত ৪ বছরে ৮ দশমিক ১ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হলেও ২০১২-১৩ অর্থবছরে এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৯ শতাংশ।
অন্যদিকে গত চার বছর ধরে সঞ্চয়ের সাথে সাথে মোট দেশজ আয়ের (জিডিপি) অনুপাত প্রকৃতপক্ষে স্থবির ছিলো। জাতীয় সঞ্চয় ২৯ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খেয়েছে। আর দেশজ সঞ্চয় গত তিন বছর ধরে ১৯ দশমিক ৩ শতাংশে স্থবির ছিলো। দেশের সার্বিক বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে সঞ্চয়ের মতই একই চিত্র বিরাজ করছে। বিনিয়োগের প্রধান উত্স বেসরকারি খাত ২০১১-১২ অর্থবছরে ২০ শতাংশের তুলনায় ২০১২-১৩ অর্থবছরে কম (১৯%) অবদান রেখেছে।
তবে এই সময়ে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অর্জনও কম নয়। দেশের মূল্যস্ফীতির হার ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে বাড়তে শুরু করে এবং ২০১০-১১ অর্থবছরে এটি সর্বোচ্চ ১০ শতাংশের উপরে চলে গেলেও ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে এ হার কমতে শুরু করে যা অব্যাহত রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত চার বছরে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধির হিসেবে ৬০ লাখেরও বেশি কর্মসংস্থান হয়েছে। এই সময়ে প্রায় ২০ লাখ মানুষ কাজের উদ্দেশে বিদেশে গিয়েছে। এই হার অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় বেশি। এই সময়ে দেশের কর এবং কর বহির্ভূত রাজস্ব আদায়ের হার ছিলো সন্তোষজনক। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী (এডিপি) বাস্তবায়ন হারও বেড়েছে। সর্বশেষ বিদায়ী ২০১২-১৩ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়ন হার ৯৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
বিগত চার বছর ধরে ভারসাম্যপূর্ণ রাজস্ব ও মুদ্রা নীতির কারণে ব্যাংক ব্যবস্থা এবং বহিঃ উত্স থেকে গৃহীত সরকারি ঋণ কম-বেশি নিয়ন্ত্রণে ছিলো। এর পরেও অভ্যন্তরীণ ও বহিঃ উত্স থেকে প্রাপ্তির উঠানামা লক্ষ্য করা যায়। জনসাধারণের কাছ থেকে, ব্যাংক থেকে ব্যাংক বহির্ভূত ঋণের মাধ্যমে অর্থায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ এটি কম ঝুঁকিপূর্ণ এবং সুষম অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সহায়ক। এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা, প্রবাসী আয়ের উর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত থাকা, চলতি হিসেবে উদ্বৃত্ত, বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছে জিইডি।
তবে সামগ্রিক উন্নয়নের স্বার্থে দেশের বন্দর ও সমুদ্র পরিবহন উন্নীত করার জন্য প্রতিবেদনে তাগিদ দেয়া হয়েছে। মংলা সমুদ্রবন্দরের সংস্কার ও পুনর্জীবন এবং গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ হতে পারে এ সমস্যার সমাধান। অন্যদিকে গত একদশক বা তার বেশি সময় ধরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির বার্ষিক হার যদিও ১.৩৪ শতাংশে স্থির ছিল। ঠাসাঠাসি ও অতিরিক্ত ভীড় গ্রামীণ বাজার থেকে শুরু করে বড় শহর পর্যন্ত সব জায়গাতেই পণ্যদ্রব্য, মানুষজন ও প্রয়োজনীয় ইউটিলিটি সেবার অবাধ গতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। সর্বত্র জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপের কারণে জমির সংস্থান কমে যাচ্ছে যা প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাধার সৃষ্টি করছে। অবশ্য বাংলাদেশ এখন একটি সুবিধাজনক জনমিতিক পরিস্থিতি অতিক্রম করছে যা সঠিক ব্যবহার করা প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।