খুনের পর মায়ের কানের দুল ছিঁড়ে নেয় ঐশী

বাবা-মাকে হত্যার পর মায়ের কান থেকে দুল ছিঁড়ে নিয়েছিল ঐশী। লাশের সুরতহাল রিপোর্টেও স্বপ্না রহমানের কানের লতি ছেঁড়া ছিল। আর হাতের চুড়ি, গলার চেইনও সে খুলে নিয়েছে। ওই বাসা থেকে বের হওয়ার সময় ঐশী কত ভরি স্বর্ণালংকার ও কত টাকা নিয়ে বের হয়েছে তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে তার ব্যাগ থেকে ১০ ভরির মত স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়েছে। সেখানে কিছু খালি বাক্সও পাওয়া গেছে। গোয়েন্দারা ধারণা করছে কিছু স্বর্ণালংকার খোয়া গেছে। কিন্তু এই স্বর্ণালংকার খোয়া গেল কিভাবে? তার উত্তর মিলছে না। পুলিশ দম্পতি হত্যাকাণ্ডের তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। তদন্তকারীরা বলছেন, বুধবার রাতে হত্যাকাণ্ডের পর বৃহস্পতিবার সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার পর ওই দিন রাতে বান্ধবী তৃষার বাসায় ছিল ঐশী। ব্যাগও তার সঙ্গে ছিল। পরদিন শুক্রবার রাতে ছিল বন্ধু জনির আরেক বান্ধবী আইরিনের বাড্ডার বাসায়। শনিবার সকালে ওই বাসায় ব্যাগ রেখেই ঐশী বের হয়ে খালার বাসায় যায়। দুপুরে সেখান থেকে পল্টন থানায় আত্মসমর্পণ করে। পরে পুলিশ ঐশীর দুটি ব্যাগ আইরিনের বাসা থেকে উদ্ধার করে। ওই দুটি ব্যাগের একটিতে ১০ ভরির মত স্বর্ণালংকার পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে আরো কিছু স্বর্ণালংকার খোয়া গেছে। মায়ের কত ভরি স্বর্ণালংকার ছিল তা ঐশী নিজেও ঠিকমত বলতে পারছে না। এছাড়া কিছু বিদেশি মুদ্রাও পাওয়া গেছে ঐশীর ব্যাগ থেকে। ব্যাগে আর কি কি ছিল তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য এখন আইরিনকে প্রয়োজন। কিন্তু শনিবার সকাল থেকেই আইরিন পলাতক। তাই আইরিনকে খুঁজছে পুলিশ। এদিকে বাবা-মাকে হত্যা করার অভিযোগে রিমান্ডে থাকা ঐশী রহমানের বয়স পরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ। নানামুখী বিতর্কের পর গত মঙ্গলবার আদালত থেকে বয়স পরীক্ষার অনুমতি পায় পুলিশ। গতকাল বুধবার দুপুরের পর ঐশী ও তাদের বাসার গৃহকর্মী সুমিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে তাদের ৫টি প্যাথলোজিক্যাল পরীক্ষা করা হয়। এই পরীক্ষা থেকেই সঠিক বয়স পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন চিকিত্সকরা। ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান ইত্তেফাককে এই তথ্য জানিয়ে বলেন, অনেকে ভিন্ন কথা বললেও ঐশী পূর্ণবয়স্ক একজন মানুষ। ১৯৭৪ সালের শিশু অধিকার আইন অনুযায়ী ১৬ বছর পর্যন্ত শিশু। আর ঐশীর বয়স ১৬ বছরের বেশি। আর নতুন করা শিশু অধিকার আইন বাস্তবায়ন হয়েছে গতকাল বুধবার (২১ আগস্ট ২০১৩) থেকে। তাই এর আগে যত ঘটনা ঘটেছে তা আগের আইনের আওতায়ই পড়বে। ফলে ঐশীর বয়স ১৬ বছরের বেশি হলেই তাকে আর শিশু বলার কোন সুযোগ নেই। ঐশীর বয়স নির্ধারণ পরীক্ষা শেষে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, বয়স পরীক্ষার জন্য দুপুরে ঐশীকে নিয়ে আসে গোয়েন্দা পুলিশ। প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় জানিয়ে এই চিকিত্সক বলেন, ‘দ্রুত’ এই ফলাফল জানা যাবে। ঐশীর বাবা পুলিশ পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান এবং মা স্বপ্না বেগমের লাশের ময়না তদন্তও করেছিলেন ডা. সোহেল। জানা গেছে, দুপুর সোয়া ৩টার দিকে ঢাকা মেডিক্যালে নেয়া হয় ঐশী ও সুমিকে। পৌনে ৪টার মধ্যে ৫টি প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা শেষে তাদের আবার একটি মাইক্রোবাসে করে ডিবিতে ফিরিয়ে আনা হয়। সূত্র মতে, সেখানে ঐশী ও সুমির কোমর, হাত, কব্জি, হাঁটু ও গোড়ালির হাড়ের প্যাথলোজিক্যাল পরীক্ষা করা হয়। এই পরীক্ষার রিপোর্ট থেকেই ঐশী ও সুমির সঠিক বয়স পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন চিকিত্সকরা। ঐশীকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদকারী একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ঐশী তার অবস্থান পরিবর্তন করেনি। এখনো সে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছে। কখনো বলছে সে একাই খুন করেছে, আবার কখনো বলছে তার সঙ্গে দুই বন্ধু ছিল। তবে পালিয়ে থাকা ঐশীর বন্ধু জনি এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত সবকিছুই জানতো এটা মোটামুটি নিশ্চিত হয়েছেন গোয়েন্দারা। এখন জনিসহ আরেক বন্ধু সাইদুল ইসলামকে গ্রেফতারের সর্বাত্মক চেষ্টা করছে গোয়েন্দা পুলিশ। পাশাপাশি র্যাবের একাধিক টিমও জনিকে গ্রেফতার করতে মাঠে নেমেছে। তদন্তকারীরা বলছেন, জনি ও সাইদুলকে পাওয়া গেলে এই হত্যাকাণ্ডের গোটা রহস্যই উন্মোচন হবে। জিজ্ঞাসাবাদকারীরা বলেন, রনি এই হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে তেমন কোন তথ্য দিতে পারেনি। সে আসলে একজন মাদক ব্যবসায়ী এবং ডিজে পার্টি করে বেড়ায়। এই মাদক ব্যবসা ও ডিজে পার্টির সুবাদে ঐশীর সঙ্গে তার পরিচয়। ফলে হত্যাকাণ্ড নিয়ে তেমন তথ্য দিতে পারেনি রনি। সে যে তথ্য দিয়েছে তাতে ঐশীর ব্যক্তিগত রঙিন জীবনের কিছু খণ্ড চিত্র পাওয়া গেছে। আর গৃহকর্মী সুমি বলছে, সে ঐশী আপুর সঙ্গে বেডশিট ধরে লাশ বাথরুমে নিয়ে গেছে। এর আগে খুনের দৃশ্য সে দেখেনি। বাসার মধ্যে অন্য কোন মানুষের উপস্থিতি সে দেখেনি। ফলে খুন ঐশী একা করেছে না বন্ধুরা ছিল তা সে বলতে পারে না। সুমি রাতে শুধু ঐশী ও ঐহীকেই বাসায় দেখেছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেন, ঐশী খুবই চতুর। নানাভাবে গোয়েন্দাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে সে। মাঝে মধ্যে খুবই আবেগ মিশিয়ে গোয়েন্দাদের বলছে স্যার আমি ভুল করে ফেলেছি। আমি অন্যায় করেছি। কিন্তু আমার একমাত্র ভাই ঐহী তো কোন অপরাধ করেনি। তাই আমার কিছু হলে ওকে কে দেখবে? আমি নিজে বখে গেলেও ছোট ভাইকে মানুষের মতো মানুষ করতে চাই। অন্তত ছোট ভাইয়ের জন্য হলেও একবার সংশোধনের সুযোগ চাই। এই ধরনের আবেগ মেশানো বক্তব্যের সময় ঐশী বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে গোয়েন্দাদের বোকা বানাতে চাইছে। গতকাল বুধবার ছিল ঐশী, সুমি ও রনির ৫ দিনের রিমান্ডের তৃতীয় দিন। প্রসঙ্গত শুক্রবার রাতে রাজধানীর চামেলিবাগের ‘চামেলি ম্যানশনের’ ছয় তলার বি-৫ নম্বর ফ্ল্যাটের তালা ভেঙে পুলিশ দম্পতির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঐশীর কক্ষের বাথরুম থেকে চাদর দিয়ে প্যাঁচানো অবস্থায় লাশ দুটি উদ্ধার করা হয়। দুজনের শরীরেই ছিল উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতের চিহ্ন। ঘটনার পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে ছোট ভাই ওহি (৭) ও গৃহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে ফ্ল্যাট ছাড়ে দম্পতির একমাত্র মেয়ে ঐশী। ছোট ভাইকে বাসায় পাঠিয়ে দিলেও ঐশী পলাতক ছিল। শনিবার দুপুরে পল্টন থানায় গিয়ে ধরা দেয় ঐশী।