ইমামুরার তুলিতে ভারতবর্ষের জাহাজঘাটা

ইমামুরা শিকোও (১৮৮০.১২.১৬-১৯১৬.২.২৮) প্রকৃত নাম ইমামুরা জুসাবুরোও, বেঁচে ছিলেন মাত্র ৩৫ বছর (মতান্তরে ৩৭)। কিন্তু মেইজি যুগের (১৮৬৮-১৯১২) শেষ এবং তাইশোও (১৯১২-২৬) যুগের প্রারম্ভে দারুণ একটা নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছিল তাঁর শিল্পকর্ম। জাপানের আধুনিক মেইজি, তাইশোও ও শোওয়া যুগের (১৯২৬-৮৯) কালজয়ী নিগোনগা চিত্রশিল্পী যথাক্রমে য়োকোয়ামা তাইকান, কানজান শিমোমুরা, শুনসোও হিশিদা, কিমুরা বুজান, কাওয়াই গিয়োকুদোও, তাকেউচি সেইহোও, উয়েমুরা শোওনেন, কাম্পো আরাই, তাকেহিসা ইউমেজি প্রমুখের সমসাময়িক হওয়া সত্ত্বেও তাঁর নাম অজানাই থেকেছে দীর্ঘকাল। সম্প্রতি কয়েকটি গ্রন্থ তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। যে কারণে নতুন করে তাঁর চিত্রকর্ম নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। অবশ্য তাঁর অঙ্কিত একাধিক ছবি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সাংস্কৃতিক সম্পত্তি হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন জাদুঘরে। কাজ তাঁর খুবই কম তথাপি একাধিক পুরস্কারও অর্জন করেছিলেন সেই সময়। তাঁর প্রধান চিত্রকর্মগুলোর মধ্যে হিরাশিননোও (হেইয়ান যুগের প্রভাবশালী সামুরাই তাইরা নো মাসাকাদো’র প্রতিকৃতি), তোকিমুনে (কামাকুরা যুগের শক্তিশালী সামুরাই হোজো তোকিমুনে’র প্রতিকৃতি), দাতা মাসামুনে (ছেনগোকু যুগের শক্তিশালী সামুরাইয়ের প্রতিকৃতি), ফুউজিন রাইজিন (বায়ুদেবতা ও বিজলিদেবতা), উজি নো ইয়ামাজি (উজি অঞ্চলের পাহাড়ি পথ), ওওমি হাক্কেই (ওমিকুনি=হিগা-জেলার প্রাচীন নাম, সেখানকার আটটি বিখ্যাত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত স্থান), ড্রাগন এবং টাইগার, নেক্কোকু নো মাকি (গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশের পেঁচানো বা পাকানো চিত্র=স্ক্রল পেইন্টিং), নান ফুউ (দক্ষিণী বায়ু), হাজে (জাপানি গোবি মাছ), সাইউ (ঝিরঝিরে বৃষ্টি), সোওশুন (বসন্তের প্রারম্ভ) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। কিন্তু যে কারণে তিনি আলোচনার শীর্ষবিন্দু হয়েছেন তার মূলে রয়েছে নেক্কোকু নো মাকি চিত্রগুলো। ঐতিহ্যবাহী নিহোনগা হিসেবে এই চিত্রগুলো ছিল ব্যতিক্রম। এই প্রথাবিরোধী ধারা ভেঙে নতুন ধারা প্রবর্তনের জন্য বিপ্লব সংঘটিত করতে চেয়েছিলেন তিনি। প্রায়শ তাঁর বন্ধু ও শিষ্যদের বলতেন যে, ‘নিহোনগা চিত্র যদি এমন স্থবির হয়ে যায় তাহলে আর কী করা যাবে! ধ্বংস করতে হবে! একবার যেটা গড়ে উঠেছে সেটাকে ভেঙেচুরে দিতে হবে। কেউ তো আবার গড়বে। আমি ভাঙবো, তোমরা আমাকে অনুসরণ করো। তোকুগাওয়া (সামুরাই) যুগের পর চিত্রকর্ম অধঃপতনে চলে গেছে। যত কিছুই বলি, নতুন করে শুরুর আগে দরকার ধ্বংস। মুক্তমনে ছবি আঁক্! শিল্পে কোনো তত্ত্বটত্ত্ব নেই। কোনো প্রকার বন্ধনে আবদ্ধ না হয়ে মুক্তচিত্তে নিজের খেয়ালখুশিমতো ছবি এঁকে যা!’ এভাবে উদ্বুদ্ধ করতে চেষ্টা করেছেন ইমামুরা। কিন্তু তিনি সফল হতে পারেননি, তার আগেই অকালে ঝরে গেছেন। মৃত্যুর কারণ অতিরিক্ত মাদকাসক্তির ফলে যকৃত্ এবং মস্তিষ্ক দুটোরই চরম অবনতি ঘটেছিল। ২. ‘নেক্কোকু নো মাকি’ চিত্র তাঁর একটি দুর্লভ দুঃসাহসিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফসল হিসেবে ধরা যায়। মৃত্যুর পর তখনকার খ্যাতিমান নিহোনগা শিল্পী এবং ইমামুরার বন্ধু ইয়াসুদা ইউকিহিকো শিল্পীর চরিত্র সম্পর্কে তাত্পর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন, ‘তুমি প্রবল ইচ্ছাশক্তির অধিকারী ছিলে। সত্যিই মেধাসম্পন্ন মাথা তোমার ছিল। এ রকম প্রজ্জ্বলিত চেতনাবোধ অন্যদিকে সূক্ষ্ম বুদ্ধিমত্তাদ্বারা সচরাচর শান্তসুষ্ঠু বিচারবিবেচনা এবং আত্মবিশ্লেষণ তুমিই করতে পারতে।’ শিল্পী হায়ামি গিয়োচুও বলেছিলেন, ‘তুমি শত্রু না, বন্ধুও হয় না, এমন মানুষকে ঘৃণা করতে। আরও বলা যায়, অনুভবের দিক দিয়ে তুমি ছিলে উষ্ণহূদয় এবং নীতিবান।’ এই রকম চারিত্রিক গুণাগুণের প্রতিচ্ছবি কি ইমামুরার চিত্রকর্মে বিদ্যমান ছিল? শতবর্ষের ব্যবধানে বলা যায় তখনকার চিত্রশিল্পের জগতে চমকে ওঠার মতো ঘটনাই ছিল। নিহোনগা জন্মলগ্ন থেকেই শত শত বছরের মধ্যে প্রকৃতি, লোকাচার, দেবদেবী, নারী, ধর্মীয় আচার, যুদ্ধবিগ্রহ, সামুরাই শাসকদের প্রতিকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে মেইজি যুগের শেষভাগ পর্যন্ত। তবে মেইজি যুগের শেষ দিক থেকে তাইশোও যুগ পর্যন্ত নিহোনগা’র ক্ষেত্রে একটা বৈচিত্র্য এনেছিলেন এই ঘরানার কতিপয় শিল্পী ভারত ভ্রমণ করে। বিভিন্ন সময় এঁরা বিভিন্নভাবে শিল্পাচার্য ওকাকুরা তেনশিন এবং শিল্পকলার তত্কালীন খ্যাতিমান পৃষ্ঠপোষক রেশমবণিক হারা তোমিতারো’র নেতৃত্বে ও তত্ত্বাবধানে ভারতে গিয়ে অভিজ্ঞতা লাভ করেন আবার পাশাপাশি কলকাতার চিত্রশিল্পী বিশেষ করে শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ, নন্দলাল বসু, মুকুল দে, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় প্রমুখের সঙ্গে মতবিনিময়ও করেন। এই ধারাবাহিকতার শুরু ১৯০২ সালে যখন ওকাকুরা কলকাতায় যান এবং বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখের সঙ্গে। বুদ্ধগয়া, ইলোরা, অজন্তা প্রভৃতি পরিদর্শন করে প্রবল আগ্রহ অনুভব করেন ভারতের বৌদ্ধ ও হিন্দুধর্মীয় চিত্রকলার প্রতি। ফিরে এসে কলকাতায় পাঠান তাঁর দুজন প্রিয় শিষ্য য়োকোয়ামা তাইকান ও হিশিদা শুনসোওকে। এরপর যান চিত্রশিল্পী কাত্সুতা শৌকিন, কাম্পো আরাই, নাম্পু কাতায়ামা, কোসেত্সু নোসু, কোয়ো ইশিজুকা, ছেনরিন কিরিয়া প্রমুখ। তাঁরা যে সকল চিত্র আঁকেন অবশ্যই সেগুলো অধিকাংশই হিন্দু-বৌদ্ধ দেবদেবী বা ভারতীয় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নিয়ে কিন্তু সেগুলোতে ছিল নতুনত্ব বিশেষ করে মুখাবয়ব, দৈহিক গঠন, বস্ত্র, রং, আবহ, ভঙ্গিমা, গতিময়তা ইত্যাদি। এইসব কাজ ইমামুরা দেখেছিলেন কিন্তু এগুলো এতবেশি কল্পিত এবং আদর্শায়িত ছিল যে তিনি মনে হয় খুব একটা আকৃষ্ট হননি। রোমান্টিক বলে বিবেচিত হয়নি তাঁর কাছে। এঁদের সঙ্গে ইমামুরার অঙ্কিত ভারতীয় জীবনযাত্রার চিত্রটি একেবারেই ভিন্ন এবং সম্পূর্ণ বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি যে কারণে প্রথাবিরোধিতার গুঞ্জন উঠেছিল। কিন্তু কী কারণ তাঁর এই প্রথাবিরোধিতার অন্তরালে আগুন জ্বেলেছিল তা বোঝা কঠিন। ৩. ইমামুরা শিকোও জন্মগ্রহণ করেছিলেন ইউকোহামা বন্দরনগরের প্রাণকেন্দ্র নাকা-ওয়ার্ডের বাশামিচি (ঘোড়ার গাড়ির রাস্তা) নামক মহল্লায়। তাঁর পিতা ছিলেন চৌচিনইয়া বা ঐতিহ্যবাহী কাগজের বাতি ব্যবসায়ী। ছেলেবেলা থেকেই সাহসী ও নতুনত্বের অনুসন্ধানী ছিলেন তিনি। ১৮৯৫ সালে যখন তাঁর মাত্র ১৫ বছর বয়স সেই কৈশোরেই স্থানীয় পাশ্চাত্যধারার ছাপশিল্পী ইয়ামাদা বাশুকের কাছে চিত্রাঙ্কনের হাতেখড়ি লাভ করেন। বিশেষ করে এই মাস্টার তাঁকে ইউরোপীয় শিল্পকলা সম্পর্কে প্রথম ধারণা দেন। সেখানে তিনি ইংল্যান্ডের জাতীয় শিল্পী যোসেফ ম্যালোর্ড ইউলিয়াম টার্নার (১৭৭৫-১৮৫১) এর জলরংয়ে আঁকা চিত্রকর্ম দেখার অভিজ্ঞতা লাভ করেন। টার্নার ছিলেন ১৮-১৯ শতকের বিখ্যাত রোমাঞ্চবাদী শিল্পী। তাঁর কাজের ধরণ শিক্ষা নেন ইমামুরা। এই সময় চীন দেশীয় জ্যোতিষবিদ্যায় আগ্রহী হয়ে ‘রিউসুকে’ ছদ্মনাম ধারণ করেন। ১৮৯৭ সালে অগ্রজ ইয়াসুনোসুকে এবং নিহোনগা মাস্টার মাত্সুমোতো ফুওকো’র অধীনে কড়া অনুশাসনের মধ্যে চিত্রকলা শিক্ষালাভ করেন। ১৮৯৮ সালে জুসাবুরোও’র পরিবর্তে ছদ্মনাম ধারণ করেন ‘শিকোও’ নামে। এই বছরের অক্টোবর মাসে নিহোন বিজুত্সু কিয়োকাই তথা জাপান শিল্পকলা সমিতির সদস্য হন। ১৯০০ সালে বন্ধু ইয়াসুদা ইউকিহিকো’র সংগঠন ‘কোওজিকাইত্’-এর সদস্যপদ লাভ করে নিহোনগা চিত্রকলার একজন গবেষণা পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯০৭ সালে তাঁর জীবনে এক ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে। জাপানে নমস্য পণ্ডিত শিল্পাচার্য ওকাকুরা তেনশিনের সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে যান ইবারাকি-জেলার ইজুরা নামক স্থানে ওকাকুরার বাসভবনে। ওকাকুরা তাঁর মেধার পরিচয় পেয়ে খুব খুশি হন। তাঁর চিত্রকর্মের প্রশংসা করেন। ওকাকুরা মৃত্যু পর্যন্ত তাঁকে নানাভাবে সহযোগিতা করে গেছেন। ওকাকুরাও উকোহামাতে জন্মে ছিলেন বলে তাঁর প্রতি একটা প্রচ্ছন্ন সহানুভূতি ছিল বলে মনে হয়। ৩১ বছর বয়সে ইমামুরা শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষক ধনী ব্যবসায়ী হারা সানকেই তথা হারা তোমিতারো’র সহযোগিতালাভে সক্ষম হন। হারার সুবিখ্যাত বাগানবাড়ি ‘সানকেইএন’-এ অবস্থিত শিল্পকলা জাদুঘরে প্রতি মাসে জাপানি ও চীনা চিত্রকর্মের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত এবং মূল্যায়ন করা হতো। সেখানে চীনা মিং এবং কুইং বংশের চিত্রকলা এবং মেইজি ও তাইশোও যুগের বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব-চিত্রশিল্পী-কনফুশিয়ান পণ্ডিত তোমিওকা তেস্সাই সম্পর্কে গবেষণার কাজ লাভ করেন। পরের বছর এই প্রদশর্নীতে তাঁর নিজের অঙ্কিত চিত্রকর্ম ‘ওওমি হাক্কেই’ দ্বিতীয় পুরস্কারে ভূষিত হয়। এই চিত্রকর্মের মাধ্যমে ‘দাইওয়াএ’ তথা ‘জাপানি চিত্রকলা’র ঐতিহ্য বহন করত চীনা দক্ষিণাঞ্চলীয় চিত্রকলার গবেষণায় মনোযোগী হন। এই সময় পোস্ট-ইম্প্রেশনিজমের ঢংয়ে অঙ্কন ও রংয়ের তুলনামূলক সংমিশ্রণ ঘটিয়ে নিজস্ব একটা স্টাইল বা রীতি প্রতিষ্ঠা করেন। ৪. ১৯১৪ সালের দিকে তিনি ভারত ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। যদিও তখন তিনি বেশ অসুস্থ মাদকাসক্তিজনিত কারণে। তবে যখন তিনি ছবি আঁকতেন, নিবিষ্ট মনে আঁকতেন, আপনজন এলেও কোনো কথা বলতেন না, এমনকি মদের গ্লাসও স্পর্শ করতেন না। ছবি আঁকা শেষ হলে পরে মদ নিয়ে বসতেন এবং দিশাহীন না-হওয়া পর্যন্ত অনবরত মদ টেনে চলতেন। এই অতিরিক্ত মদ পানের কারণে তাঁর যকৃতে ও মস্তিষ্কে দূরারোগ্য ব্যাধি বাসা বাঁধে। ফলে ওকাকুরার আহ্বানে ‘শিনিনহোনগা উনদোও’ বা ‘নতুন জাপানি শিল্পকলা আন্দোলনে’ অংশগ্রহণ করে কর্মতত্পরতা চালিয়ে যাওয়া তাঁর পক্ষে আদৌ সহজ কাজ ছিল না। একদিকে মাদকাসক্তি অন্যদিকে কঠোর পরিশ্রম তাঁর শরীরকে ক্রমেই দুর্বল করে তুলেছিল। ছবি অঙ্কনও তাঁর জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছিল। অসুস্থ অবস্থায় থেকে ওকাকুরা, তাইকান, শুনসোও, কানজান শিমোমুরা এঁরা প্রাচ্য শিল্পকলার উত্স ও ঐতিহ্যকে লক্ষ্যবস্তু করে ভারতে গিয়ে অভিজ্ঞতা লাভ করে জাপানে ফিরে নতুন নতুন কাজ করছেন দেখে অস্বস্তিবোধ করেন। চিন্তা করেন তাঁকেও তাঁদেরকে অনুসরণ করতে হবে। ইউকোহামার মতো পাশ্চাত্য-সংস্কৃতিশাসিত মহানগরে জন্ম ও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হলেও ইমামুরা আদৌ পাশ্চাত্যমুখী ছিলেন না। ছিলেন প্রাচ্যমুখী। তাই তিনিও সিদ্ধান্ত নিলেন ভারতে যাওয়ার। ৫ বহির্বিশ্বে যাওয়া মানে প্রচুর খরচ। শিল্পী, সাহিত্যিক আর শিক্ষাব্রতীদের জন্য উদার ছিলেন তখন অনেক জাপানি ধনী ব্যক্তি। তেমনি একজন হারা তোমিতারোও’র কাছ থেকে এক বছরের জন্য অর্থ ঋণ নিয়ে আর বাকি অর্থ নিজের চিত্রকর্ম বিক্রি করে এক বন্ধুর মালবাহী জাহাজে চড়ে ১৯১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ইউকোহামা বন্দর ছাড়েন কোবে বন্দরের উদ্দেশে। সেখান থেকে ভারতের দিকে যাত্রা করেন ঠিকই কিন্তু ভিসা নেননি খেয়ালের বশে। মার্চ মাসের ২০ তারিখে তত্কালীন বার্মার রেঙ্গুন বন্দরে পৌঁছান। তারপর সেখান থেকে কলকাতায় পৌঁছে ১৫ দিন ছিলেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, ভিসা না থাকার কারণে বন্দরে তাঁকে নামতে দেওয়া হয়নি। মনে হয়, তিনি জাহাজের মধ্যেই ছিলেন আর জাহাজঘাটা থেকে যতখানি দৃষ্টি গেছে সেখানে যা লক্ষগোচর হয়েছে তা-ই ফিরে এসে ঐতিহ্যবাহী বিশাল স্ক্রল পেইন্টিং বা পাকানো চিত্র হিসেবে এঁকেছেন। চিত্রগুলোতে সমুদ্রতীরবর্তী মানুষের জীবনযাপন চমত্কারভাবে উঠে এসেছে। পাকানো চিত্র যথাক্রমে দুটি পর্বে অঙ্কিত একটি ‘আসা নো মাকি’ বা ‘সকালের চিত্র’ অন্যটি ‘ইউ নো মাকি’ বা ‘সন্ধেবেলার চিত্র’। সকালের চিত্রে ফুটে উঠেছে সিঙ্গাপুর ও পেনাঙের সমুদ্রতীরবর্তী জলজীবনের দৃশ্যাদি আর সন্ধেবেলার চিত্র কলকাতার গঙ্গানদী বন্দরসংলগ্ন জীবন ও প্রকৃতির। নৌকা, জলের ওপর বাড়িঘর, কর্মরত নরনারী, গবাদি পশু, সুপুরি বাগান, খেজুর গাছের সারি, গরুর গাড়ি ইত্যাদি খুবই সাধারণ আঙ্গিক নিয়ে দৃশ্যায়িত হয়েছে। দেখলে মনে হয় যেন ক্যামেরায় ধারণকৃত আলোকচিত্র, মুক্ত-স্বাধীনব্যাপ্তি নিয়ে উদ্ভাসিত এবং খুব সাধারণ মোটিফে অঙ্কিত সেখানে কোনো জটিলতা, তত্ত্ব বা সংজ্ঞার কোনো ধার ধারেননি শিল্পী। যা দৃষ্টির আয়তনে ধরা পড়েছে তা-ই মুক্তচিত্তে এঁকে গেছেন। রংয়ের মধ্যে সাদা, টকটকে হলুদ রংয়ের প্রাধান্যই বেশি কারণ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চল বলে। সূর্যালোকই যেখানে জীবন ও কর্মের গতি। একটা সময়কে এই চিত্রগুলোতে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ধারণ করা হয়েছে। এর বাইরে আরও দুটি চিত্র তিনি এঁকেছিলেন মাথায় কলসীবাহী এক নারী এবং গরু পাল। এ দুটি চিত্র ব্যক্তিগতভাবে সংরক্ষিত। সম্ভবত সংগ্রাহক অধিক মূল্যে ক্রয় করে নিয়েছিলেন। ওকাকুরা প্রতিষ্ঠিত ‘নিহোন বিজুত্সুইন’ বা ‘জাপান চারুকলা ইনস্টিটিউট’-এর পুনঃসংস্কারের সময় প্রথম ‘নেক্কোকু নো মাকি’সহ উল্লেখিত চিত্র দুটিও প্রদর্শিত হয়। এগুলো ইমামুরা শিকোরও’র জীবনে সবচে মূল্যবান চিত্র বলে বিবেচিত। ‘নিহোনগা’র বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী রিনপা ঘরানা, ইমপ্রেশনিজম কিংবা চীনা দক্ষিণাঞ্চলীয় চিত্রকলার ইতিহাসে ইমামুরা অঙ্কিত রীতি এক নতুন ধারার প্রবর্তন করেছে বললে ভুল হবে না। যার উজ্জ্বল প্রভাব পড়েছে, পরবর্তীকালে যে সকল জাপানি নিহোনগা চিত্রশিল্পী ভারতের জনজীবন, জীবজন্তু, ধর্ম, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং প্রকৃতি নিয়ে চিত্র এঁকেছেন, সেসবের ওপর। বস্তুত অন্যান্য উল্লেখযোগ্য চিত্রকর্ম থাকা সত্ত্বেও ইমামুরা শিকোও’র ‘নেক্কোকু নো মাকি’ চিত্রাবলীর কারণে আজকে তিনি অনন্য খ্যাতিসম্পন্ন। যদি তিনি কলকাতা বন্দরে প্রবেশের অনুমতি পেতেন, তাহলে বাঙালি জীবন যে আরও ব্যাপক বৈচিত্র্যময়তায় বিস্তৃতাকারে ধরা পড়ত তাঁর ক্যানভাসে সে কথা আর না বললেও চলে।