গত বছরের চেয়ে এ বছর পিঁয়াজের উত্পাদন বেড়েছে
দাম অস্বাভাবিক চড়ার নেপথ্যে কারণ কি?
প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০১৩, ১৯:২৩
গতবছরের (২০১২) চেয়ে এ বছর পিঁয়াজের উত্পাদন বেশি হয়েছে। উত্পাদনের পর ৫ মাস না যেতেই বাজারে পিঁয়াজের ঝাঁঝে মানুষের নাভিশ্বাস শুরু হয়েছে। এর নেপথ্যে কারণ কি? পিঁয়াজের মত নিত্য প্রয়োজনীয় মশলা জাতীয় ফসল এখন বছরে একটি মৌসুমে চাষ করে দেশের চাহিদা মিটানো যাচ্ছে না। দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে পিঁয়াজের চাহিদাও প্রতিবছর বেড়ে চলেছে। পিঁয়াজের উত্পাদন ও চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ মশলা গবেষণা কেন্দ্র বেশ কয়েক বছর আগে বর্ষাকালে চাষযোগ্য পিঁয়াজের ৩টি জাত উদ্ভাবন করেছে। জাতগুলো হচ্ছে বারি পিঁয়াজ-২, বারি পিঁয়াজ-৩ ও বারি পিঁয়াজ-৫। এসব জাতের হেক্টর প্রতি ফলন ১০-১২ টন। কিন্তু এ জাতগুলোর চাষ সমপ্রসারণে কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগ নেই। রবি মৌসুমের পিঁয়াজের উপর নির্ভর করতে হয়।
বর্তমানে পিঁয়াজের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধির নেপথ্যে কি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের পিঁয়াজ উত্পাদনের তথ্যে গড়বড় থাকতে পারে। প্রকৃত উত্পাদনের চেয়ে কাগজ-কলমে বেশি উত্পাদন দেখানো হতে পারে। দ্বিতীয়ত ব্যবসায়ীরা অধিক লাভের আশায় পিঁয়াজ মজুত করে রাখতে পারে। অধিক মুনাফার আশায় এ স্পর্শকাতর পণ্যটি নিয়ে সিন্ডিকেট ব্যবসা হতে পারে। পিঁয়াজের দাম স্বাভাবিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার জন্য সরকারের তদারক ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। আমাদের দেশে গতবছর (২০১২) এক লাখ ৮০ হাজার হেক্টরে পিঁয়াজ চাষ হয়েছিল। পিঁয়াজ উত্পাদনের পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ ৯৯ হাজার টন। তার আগের বছর (২০১১) এক লাখ ৮০ হাজার হেক্টরে পিঁয়াজ চাষ হয়। উত্পাদনের পরিমাণ ছিল ১৬ লাখ ২০ হাজার টন। চলতি বছর এক লাখ ৮১ হাজার হেক্টরে পিঁয়াজের চাষ হয়। আর পিঁয়াজ উত্পাদন হয় ১৯ লাখ ১৪ হাজার টন। নতুন মুড়িকাটি পিঁয়াজ উঠতে এখনও ৪ মাস বাকি। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি দেশে উত্পাদিত পিঁয়াজ ফুরিয়ে যাবার কথা নয়।
গতবছর নতুন উঠার পর দেশি পিঁয়াজের প্রতি মণের (৪০ কেজি ) দাম ছিল সাড়ে ৬শ’ টাকা থেকে ৮শ’ টাকা পর্যন্ত। এরপর বেড়ে ১১শ’ টাকা থেকে ১২শ’ টাকার মধ্যে ছিল। শেষ মুহূর্তে ১৪শ’ টাকা হয়েছিল। পরে ফের দাম পড়ে যায়। চলতি বছর নতুন পিঁয়াজ উঠার পর সাড়ে ৭শ’ টাকা থেকে ৮শ’ টাকা মণ বিক্রি হয়। অর্থাত্ প্রতি কেজির দাম ছিল ১৮ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে ২০ টাকা। মে মাস থেকে পিঁয়াজের দাম চড়তে শুরু করে। তারপর ধাপে ধাপে চড়ে চলেছে। রমজান মাসের শুরুতে দেশি পিঁয়াজ খুচরা ৩০-৩৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। ঈদের আগে দাম চড়ে ৪০-৪২ টাকা হয়। ঈদের পর পাইকারি ও খুচরা বাজারে ক্রমাগত দাম-বেড়ে চলেছে। দেশের সকল জেলাতে কম বেশি পিঁয়াজ চাষ হয়ে থাকে। তন্মধ্যে ফরিদপুর, রাজবাড়ি, মাদারিপুর, শরিয়তপুর, রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর, পাবনা, বগুড়া, মাগুরা, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়া জেলাতে বেশি পরিমাণে চাষ হয়ে থাকে। ফরিদপুর ও তাহেরপরি জাতের দেশি পিঁয়াজের ঝাঁঝ ও স্বাদ ভাল। ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলা দেশের মধ্যে পিঁয়াজ চাষের জন্য বিখ্যাত। এ উপজেলাতে বছরে ৫০/৫৫ হাজার টন পিঁয়াজ উত্পাদন হয়ে থাকে। চাষিরা জানায়, এ বছর ঝিনাইদহ, মাগুরা, রাজবাড়ি ও ফরিদপুর জেলাতে পিঁয়াজের ফলন কম হয়েছে। যার প্রভার দেশের মোট উত্পাদনের উপর পড়েছে। শৈলকুপার পিঁয়াজ ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম জানান, এ বছর পিঁয়াজের উত্পাদন কম হয়েছে। তিনি বলেন, অন্যান্য বছর শৈলকুপা বাজার থেকে শনি ও মঙ্গালবার ২০/২৫ ট্রাক পিঁয়াজ দেশের বিভিন্ন স্থানে চালান যেত। এ বছর তার অর্ধেক পিঁয়াজ বাজারে উঠেছে। বড় চাষির ঘরে এখনও পিঁয়াজ মজুত আছে। তাছাড়াও এ উপজেলাতে ব্যবসায়ীদের গুদামে ২৫ হাজার মণের বেশি পিঁয়াজ মজুত আছে। কোরবানীর ঈদের আগে তারা এ পিঁয়াজ বাজারে ছাড়বে। ফরিদপুর, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলে মহাজন ও চাষির ঘরেও পিঁয়াজ মজুত আছে বলে তিনি জানান। পাবনার সাথিয়া উপজেলার বনোগ্রাম ও চিনাপাড়া মোকামের পিঁয়াজ ব্যবসায়ী নরেশ কুমার জানান, এবার পিঁয়াজের ফলন ভালই হয়েছে। নতুন উঠার পর প্রতি মণ (৪০ কেজি) সাড়ে ৭শ’ টাকা থেকে ৮শ’ টাকা দরে বিক্রি হয়। সোমবার বনোগ্রাম হাটে প্রতি মণ ২৫শ’ ৪০ টাকা থেকে ২৬শ’ ৪০ টাকা দরে বিক্রি হয়। তিনি বলেন, এখনও ব্যবসায়ী ও চাষির ঘরে পিঁয়াজ মজুত আছে।
দেশে পিঁয়াজ মজুত রাখার মত হিমাগার নেই। চাষি ও ব্যবসায়ীরা টিনের ঘরে বাঁশের চরাটের উপর পিঁয়াজ রাখে। বগুড়ার মশলা গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ড. ভাগ্য রানী বণিক জানান, প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ পিঁয়াজ পচে নষ্ট হয়। তিনি জানান, মোট উত্পাদিত পিঁয়াজের শতকরা ২০ ভাগ পচে যায়। এ হিসাবে ৩ লাখ ৮০ হাজার টন পিঁয়াজ এ বছর নষ্ট হবে। দেশে পিঁয়াজের চাহিদা নিয়ে মত ভিন্নতা আছে। ভাগ্য রানী বণিক জানান, দেশে বার্ষিক পিঁয়াজের চাহিদা ২০ লাখ টন। তাহলে পিঁয়াজের সামান্য পরিমাণ ঘাটতি হওয়ার কথা। আবার কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের মনিটরিং শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, বার্ষিক চাহিদা ২৭ লাখ টন। এ হিসাবে বার্ষিক ঘাটতি ৮ লাখ টন। গ্রীষ্মকালীন পিঁয়াজের চাষের প্রসার ঘটলে দেশে পিঁয়াজের ঘাটতি কমে আসবে। গত সোমবার ভোমরা বন্দর দিয়ে পিঁয়াজের আমদানি নতুন করে শুরু হয়েছে। এদিন ৫৯ ট্রাক পিঁয়াজ এ বন্দর দিয়ে আমদানি হয়। প্রতি কেজি পাইকারি ৬০ টাকা দরে বিক্রি হয় বলে ব্যবসায়ী এবাদুল ইসলাম জানান। এর আগে প্রতি কেজির দাম ছিল ৭০ টাকা। এ সব পিঁয়াজ নাসিক, পাটনা ও দক্ষিণ ভারত থেকে এসেছে বলে তিনি জানান।