এক যুগ ধরে খসড়াতেই ভূমি ব্যবহার নীতিমালা

এক যুগেরও বেশি সময় ধরে কেবলমাত্র ‘খসড়া’র মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতিমালা। ভূমির অপব্যবহার রোধ তথা কৃষি জমি সুরক্ষার উদ্দেশে ২০০১ সালে প্রণয়ন করা হয়েছিল এই খসড়া। এরপর দীর্ঘদিনেও এটি সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করেনি। সে কারণে ভূমির যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধে আইনানুগ কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এই সুযোগে দেশজুড়ে আবাদি জমি ধ্বংস হচ্ছে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে। বিশেষ করে রাজধানীর নিকটবর্তী বিভিন্ন অঞ্চলে মাঠের পর মাঠ জুড়ে সবুজ কৃষিভূমির ওপর বাস্তবায়ন করা হচ্ছে নানা নামের হাউজিং প্রকল্প। আর অবস্থানগতভাবে এসব এলাকা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আওতার বাইরে হওয়ায় বিদ্যমান আইনে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাও গ্রহণ করা যাচ্ছে না। ভূমি মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ইত্তেফাক প্রতিনিধিকে বলেন, ভূমি ব্যবহারের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রীয় নীতিমালা না থাকায় দেশের প্রায় সর্বত্রই ভূমির অপব্যবহার দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। ইচ্ছেমতো যত্রতত্র কৃষি জমি ধ্বংস করে আবাসিক প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং মার্কেট, বসতবাড়ি কিংবা বাণিজ্যিক ইমারত নির্মাণ করা হচ্ছে। জনবহুল এই দেশে এমন অনিয়ন্ত্রিতভাবে কৃষি জমি ধ্বংস হতে থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই কৃষি উত্পাদনে ধস নামতে পারে- এমন আশঙ্কার ভিত্তিতে সরকার ২০০১ সালে ‘জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতিমালা’ নামে একটি খসড়া প্রণয়ন করে। কিন্তু ক্যাটাগরী ভিত্তিতে ভূমির জোনিং সম্পন্ন না হওয়ার কারণে সে সময় নীতিমালাটি অনুমোদন করা হয়নি। এরপর সরকার একটি পাইলট প্রকল্পের আওতায় দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ২১টি জেলায় ভূমির জোনিং কার্যক্রম হাতে নেয়। এই কার্যক্রমের অংশ হিসাবে উপকূলের ভূমিকে কৃষি বা আবাদি জমি, আবাসন ভূমি, বনাঞ্চল, জলমহাল, পুকুর, চা বাগান, চরাঞ্চল ও উপকূলীয় অকৃষি ভূমি ইত্যাদি মোট ১১টি ক্যাটাগরীতে বিভক্ত করা হয়। প্রায় ৮ বছর সময় নিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর দেশের বাকি অঞ্চলগুলোতেও (তিন পার্বত্য জেলা বাদে) একই ধরনের জোনিং কর্মসূচি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু উপকূলীয় ২১ জেলায় জোনিং প্রকল্পের আওতায় প্রণীত মৌজাম্যাপের মুদ্রিত কপি প্রকাশ না হওয়ার কারণে জাতীয় ভিত্তিক জোনিং কর্মসূচির বাস্তবায়ন এখনও শুরু করা যায়নি। এদিকে দীর্ঘ এক যুগ পর ২০১১ সালের গোড়ার দিকে আবারও জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতিমালার খসড়া নিয়ে নতুনভাবে নড়াচড়া শুরু করে ভূমি মন্ত্রণালয়। আগের খসড়াটি কিছুটা পরিবর্তন ও সংশোধন করে ‘কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন ২০০১’ নাম দিয়ে নতুন করে ওই বছরের ১৫ মে এটি জাতীয় ভূমি ব্যবহার বাস্তবায়ন সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় উত্থাপন করা হয়। প্রস্তাবিত এই আইনের খসড়ায় আইনটি অমান্যকারী বা ভঙ্গকারির বিরুদ্ধে দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়। এছাড়াও খসড়াটিতে দুই ও তিন ফসলী জমিতে স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি না দেয়া, শিল্প কারখানা ও সরকারি প্রতিষ্ঠান স্থাপনের কাজে অপেক্ষাকৃত কম ভূমি ব্যবহারের মাধ্যমে ইমারতের ঊর্ধ্বমুখী সমপ্রসারণ, ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে কৃষি জমি নষ্ট না করার বিষয়টিকে গুরুত্ব প্রদানের কথা বলা রয়েছে। কিন্তু আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা বলে সেদিন মন্ত্রিসভা কমিটি খসড়াটি ফেরত পাঠায়। এরপর পেরিয়ে গেছে দুই বছরেরও বেশি সময়। কিন্তু আজ পর্যন্তও আর আলোর মুখ দেখেনি প্রস্তাবিত এই নীতিমালা বা আইন। এই সুযোগে দেশজুড়ে কৃষি জমি ধ্বংসের তত্পরতা বেড়েই চলেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ভূমির পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য অবিলম্বে প্রয়োজনীয় আইন বা নীতিমালা তৈরি এবং সেটার যথোপযুক্ত বাস্তবায়ন করা না হলে দুই দশকের মধ্যেই দেশে খাদ্য উত্পাদন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইত্তেফাক প্রতিনিধিকে বলেন, খসড়াটি একবার জাতীয় ভূমি ব্যবহার বাস্তবায়ন কমিটির সভায় উত্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা বলে এটি ফেরত পাঠানো হয়। কিন্তু কি ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে, তা কমিটির বৈঠকে বলা হয়নি। এ কারণে বিষয়টি নিয়ে আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। তিনি বলেন, সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া এ ধরনের আইন প্রণয়ন সম্ভব হবে না।