নদী ভাঙ্গনে সর্বস্ব খুইয়ে শহরমুখী হচ্ছে মানুষ

ক্রমান্বয়ে আগ্রাসী হয়ে উঠছে নদ-নদী। প্রতিদিন নদী পাড়ে নতুন করে দেখা দিচ্ছে ফাটল। পর মুহূর্তে তা সশব্দে ভেঙ্গে পড়ছে। গিলে খাচ্ছে আবাদী জমি, স্থাপনা, ঘর-বাড়ি ও মানুষের স্বপ্ন। স্বপ্ন খুইয়ে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে টিকে থাকতে পরিবার-পরিজন নিয়ে ভাঙন কবলিত এলাকার মানুষ হচ্ছে শহরমুখী। আমাদের শরীয়তপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জেলার নড়িয়া উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়নে পদ্মার ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত সাত দিনে তীর সংরক্ষণ বাঁধ, পাকা সড়ক, লঞ্চঘাট, মসজিদসহ চার শতাধিক বাড়িঘর, ফসলি জমি নদী ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে নড়িয়া হাসপাতাল, দুইটি পাকা সেতু ও তিন শতাধিক বসতবাড়ি। প্রবল ভাঙনের কাছে নিজেদের অসহায় মনে করছে পানি উন্নয়ন বোর্ডও। গত তিন দিনের ভাঙনে বিলিন হয়েছে শরীয়তপুর-চণ্ডিপুর সড়কের দুই কিলোমিটার পাকা রাস্তা। মাত্র ছয় সপ্তাহ আগে শেষ হওয়া জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের অর্থায়নে সম্পন্ন করা পদ্মা নদীর তীর সংরক্ষণ বাঁধের আটটি প্যাকেজের চারটি প্যাকেজ সম্পূর্ণরূপে নদীর স্রোতে বিলীন হয়ে গেছে। এই কাজে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৬ কোটি টাকা। প্রতিদিন শত শত মানুষ সরিয়ে নিচ্ছে তাদের বসতঘর। কেটে ফেলছে গাছপালা। শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল খালেক জানান, এমন প্রবল স্রোত ও ভয়াবহ ভাঙনের কাছে যতটুকু সহায়তা আছে তা ক্ষুধার্ত বাঘের মুখে এক টুকরো মাংসের মতো। এতে কোনো উপকার হবে না। ভাঙ্গছে দুধকুমার গঙ্গাধর ব্রহ্মপুত্র নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, নাগেশ্বরীতে ভাঙ্গছে দুধকুমার, গঙ্গাধর, ব্রহ্মপুত্র। আতঙ্কে ঘুম নেই নদী তীরবর্তী মানুষের। সর্বস্ব হারিয়ে ভাঙ্গনের শিকার মানুষ হচ্ছে শহরমুখী। ভাঙ্গনের কারণে বিভিন্ন সরকারি, বে-সরকারি, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা দ্রুত সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। কখনও কখনও সরিয়ে ফেলার আগেই তা বিলীন হচ্ছে নদীগর্ভে। গত এক সপ্তাহে ভাঙনে নুনখাওয়া ইউনিয়নের চরকাপনা, ব্যাপারীর চর, ফকিরগঞ্জ, কাটগীরি, কালিকাপুর, নুনখাওয়া বাজার, নারায়ণপুরের অধিকাংশ এলাকা, বল্লভের খাসের মাদারগঞ্জ বাজার, বামনডাঙ্গার পানাতিটারী, পাঁচমাথা, মিনা বাজার, তেলিয়ানী, লুচনি, নতুন বাজার, মুড়িয়া ঘাট, বেরুবাড়ীর খেলারভিটা, চর রহমানের কুটি, রায়গঞ্জের দামালগ্রাম, ওয়াপদা বাজার, কালীগঞ্জ ইউনিয়নের কালীগঞ্জ বাজার এলাকার প্রায় দুই শতাধিক ঘর-বাড়ী নদী গর্ভে চলে গেছে। হুমকির মুখে রয়েছে মাদারগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়, কচাকাটা থানা ও বিজিবি ক্যাম্প। নদী ভাঙ্গনে ঝুঁকিতে ভোলা শহর ভোলা (দক্ষিণ) প্রতিনিধি জানান, দ্বীপ জেলা ভোলায় ব্যাপক নদী ভাঙনে ভিটে মাটি হারাচ্ছে শতশত পরিবার। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে ফসলী জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার, মসজিদসহ বাড়ি-ঘর মেঘনা ও তেতুলিয়ার গর্ভে চলে যাচ্ছে। ভোলার পাউবো নির্বাহী প্রকৌশলী জানিয়েছেন, চলতি বর্ষা মৌসুমেই অন্ততঃ ৫শ’ হেক্টর জমি মেঘনা গর্ভে চলে গেছে। গত মহাসেন থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ সমপূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪৫ কিলোমিটার। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৭২ কিলোমিটার। বর্তমানে ভোলা শহর থেকে মেঘনা নদীর দূরত্ব মাত্র দুই কিলোমিটার । এর মধ্যে শহর রক্ষা বাঁধের তুলাতুলির এক কিলোমিটার এলাকায় ব্লক থাকলেও বাঁধের ধনিয়া, কাচিয়া, ইলিশা ও শিবপুর ইউনিয়ন এলাকায় ভাঙ্গন চলছে। যে কোন মুহূর্তে শহর রক্ষাবাঁধ ভেঙ্গে ভোলা শহর প্লাবিত হতে পারে। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, বর্তমানে ১৪০ কোটি টাকা ব্যায়ে চরফ্যাশন রক্ষা প্রকল্প এবং ১০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ভোলা শহর রক্ষা প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায়ের কাজ চলছে। ক্লাইমেট ফান্ডের আওতায় ১৫ কোটি টাকা ব্যায়ে কুকরি মুকরি চর রক্ষা প্রকল্পের কাজও চলমান। অন্যদিকে ১৩৪ কোটি টাকা ব্যায়ে শাহবাজপুর গ্যাস ফিল্ড রক্ষা প্রকল্পের কাজ শুরুর প্রক্রিয়া চলছে। ভোলার সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, ভোলার নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধে সরকার আরও ব্যবস্থা নিবে । হাতিয়ার সুখচর ইউনিয়ন প্লাবিত হাতিয়া সংবাদদাতা জানান, গতকাল শুক্রবার দুপুরে হাতিয়া উপজেলার সুখচর ইউনিয়নে বিধ্বস্ত বেড়িবাঁধ দিয়ে প্রবল জোয়ারের পানিতে সুখচর ইউনিয়নের আটটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে ওই এলাকার প্রায় ১০ হাজার লোক পানি বন্দি হয়ে পড়েছেন। পানি বন্দি লোকদের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২৫ মেট্রিক টন চাল ও শুকনো খাবারের জন্য ৫০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়েছে। বরিশাল অফিস জানায়, জোয়ারের প্রভাবে বরিশালের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কীর্তনখোলা, আড়িয়াল খা, সুগন্ধা, সন্ধ্যা, কালাবদর, তেতুলিয়া ও মেঘনা নদীর পানি অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে নগরীর পলাশপুর, মোহম্মদপুর, রসুলপুর, চর আবদানী, বরফকল, চাঁনমারী ও বেলতলা এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এ সব এলাকার বস্তিতে বসবাসকারী মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছে। নগরীর সংলগ্ন সদর উপজেলার চরমোনাই, চরকাউয়া, চন্দ চরবাড়িয়া, শায়েস্তাবাদ ও টুঙ্গিবাড়িয়া এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ডুবে গেছে রোপা আমন ক্ষেত। কয়েক’শ পুকুরের মাছ বের হয়ে গেছে। চরমোনাই ইউনিয়নের বুখাইনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রবীন শিক্ষক আব্দুল কাদের হাওলাদার ইত্তেফাককে জানান, গত চারদিন ধরে বৃষ্টিপাত ও পূর্ণিমার জোয়ারে কারনে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় রোপা আমনের ব্যাপক ক্ষতির আশংকা দেখা দিয়েছে। একই কথা জানিয়েছেন বাবুগঞ্জের হুমায়ন কবির। কেশবপুর (যশোর) সংবাদদাতা জানানন, কেশবপুরে গত কয়েকদিনের অতিবর্ষণ ও বদ্ধ পানিতে উপজেলার তিন গ্রাম পানিতে প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ৬শ পরিবার। পানিতে ফসলসহ মাছের ঘেরের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।