নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে দুই নেত্রী নিজ অবস্থানে অনড়

জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন বাংলাদেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল শুক্রবার টেলিফোনে পৃথকভাবে আলাপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে। সকাল সাড়ে ১১টায় বান কিন মুন কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে। ঘন্টা ছয়েক পর তিনি খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথা বলেন। দু’জনের সঙ্গে আধা ঘন্টা করে কথা বলেন জাতিসংঘ মহাসচিব। বান কি মুনের সঙ্গে ফোনালাপে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনেই অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব।’ অপরদিকে খালেদা জিয়া বলেন, ‘অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নির্দলীয় সরকারের কোনো বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনও জরুরি। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। বিএনপি যেকোনো ধরনের সংলাপ ও আলোচনায় প্রস্তুত রয়েছে।’ বর্তমানে ছয় দিনের সফরে নিজ দেশ দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থান করছেন জাতিসংঘ মহাসচিব। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপকালে বাংলাদেশে গণতন্ত্র শক্তিশালী করা, জাতিসংঘ ঘোষিত সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনে সরকারের সাফল্য, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদ দমনে সরকারের সাফল্যের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। আধা ঘণ্টার টেলিফোন আলাপে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বান কি মুনকে অবহিত করেন। সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে যোগদানের জন্য শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণও জানান বান কি মুন। নির্বাচন ইস্যুতে আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধীদলের প্রতি আগামী সংসদ অধিবেশনে যোগদান এবং আসন্ন নির্বাচন ও নির্বাচনকালীন সরকার বিষয়ে তাদের প্রস্তাব উত্থাপনের আহবান জানান। তিনি বলেন, ‘বিরোধীদলের যে কোনো প্রস্তাবকে আমরা স্বাগত জানাবো যদি তা জাতীয় সংসদের আসন্ন শেষ অধিবেশনে দেয়া হয়। আমরা সব সময়ই আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে যে কোনো সমস্যার সমাধানে বিশ্বাসী।’ বিকালে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী ইত্তেফাককে শেখ হাসিনার সঙ্গে জাতিসংঘ মহাসচিবের টেলিফোন আলাপ সম্পর্কে জানান। তিনি বলেন, টেলিফোনে কথা বলার সময় প্রধানমন্ত্রী বান কি মুনকে আগামী সাধারণ নির্বাচন ও চলতি রাজনৈতিক পরিস্থিতি অবহিত করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জাতিসংঘ মহাসচিবকে জানিয়েছেন যে, তিনি ইতিপূর্বে বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে সমস্যা সমাধানে সংলাপে বসার প্রস্তাব দিয়েছেন। ওই প্রস্তাবের কোনো জবাব না দিয়ে তিনি (খালেদা জিয়া) সরকারকে ৪৮ ঘন্টার আল্টিমেটাম দেন এবং পরবর্তীতে বিরোধীদল সরকারের পতনের লক্ষ্যে সহিংসতা, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যকর কার্যকলাপের মাধ্যমে দেশের শান্তি ও রাজনৈতিক পরিবেশ বিনষ্ট করে। প্রধানমন্ত্রী বান কি মুনকে জানান, তাঁর সরকার শান্তি চায় এবং অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর দেখতে চায়। আগামী সাধারণ নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ী যথা সময়ে অনুষ্ঠিত হবে এবং জনগণ কোনো বাধা-বিপত্তি ছাড়াই তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিরোধীদল নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে সংসদে একটি মুলতবি প্রস্তাব এনেছিল এবং সরকারি দল এই মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে সংসদে আলোচনা করতে সম্মতি দিয়েছিল। কিন্তু বিরোধীদল সমস্যার সমাধান চায় না বলে তিন ঘণ্টার মধ্যেই তাদের মুলতবি প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। সরকারি দল আলোচনা, সংলাপ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশের মাধ্যমে রাজনৈতিক ইস্যুর সমাধান চায় বলেই জাতীয় সংসদে ইস্যুটি নিয়ে আলোচনা করতে চেয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনী সন্নিবেশিত করা হয়েছে। সর্বোচ্চ আদালত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করেছে এবং যেকোন অনির্বাচিত সরকার সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। আদালত বলেছে, কেবল নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই দেশ চালাবেন। শেখ হাসিনা বলেন, সুশীল সমাজ এবং গণমাধ্যম প্রতিনিধিসহ সকল অংশীদারের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর সংসদীয় বিশেষ কমিটি সংবিধানের এই সংশোধনী আনে। এই বিশেষ কমিটি আইন প্রণেতাবৃন্দ ছাড়াও সকল মহলের সঙ্গে আলোচনা করেছে এবং সংসদের ইতিহাসে অতীতে এতো দীর্ঘ সময় ধরে কখনো আলোচনা করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিব এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং এমডিজি’র লক্ষ্যসমূহ অর্জনে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব সাফল্যের প্রশংসা করেন। বিশ্বে শেখ হাসিনার মতো নেতার প্রয়োজন রয়েছে উল্লে¬খ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেয়ায় আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন আশা প্রকাশ করেছেন যে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতন্ত্র, অর্থনীতি এবং জঙ্গিবাদ বিরোধী কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশের অগ্রগতি অব্যাহত থাকবে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে বান কি মুনের আমন্ত্রণ গ্রহণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘ অধিবেশনে তার যোগদান নির্ভর করবে জাতীয় সংসদের অধিবেশন পরিস্থিতির ওপর। কেননা এ সময় বাংলাদেশে জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলবে। প্রধানমন্ত্রী সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরে আসার জন্য জাতিসংঘ মহাসচিবকে আমন্ত্রণ জানান। বান কি মুন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যের হত্যাকাণ্ড এবং ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আওয়ামী লীগের ২৪ নেতা-কর্মীর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা স্মরণ করে শেখ হাসিনার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন। খালেদা জিয়ার সঙ্গে ফোনালাপ এদিকে বান কি মুনের টেলিফোন সংলাপের কথা সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন,জাতিসংঘের মহাসচিবকে বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, সংকট সমাধানে সংলাপ কিংবা আলোচনার বিকল্প নেই। বিএনপি যেকোনো ধরনের সংলাপ ও আলোচনায় প্রস্তুত রয়েছে। বেগম খালেদা জিয়া জাতিসংঘের মহাসচিবকে জানিয়ে দিয়েছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। জাতিসংঘের মহাসচিব বিরোধী দলীয় নেতাকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশে তারা সবার কাছে গ্রহণযোগ ও সব দলের অংশ গ্রহণে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দেখতে চায়। এজন্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি জাতিসংঘ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। জবাবে বিরোধী দলীয় নেতা জাতিসংঘের মহাসচিবকে বলেন, ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নির্দলীয় সরকারের কোনো বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনও জরুরি।’ মির্জা ফখরুল জানান, জাতিসংঘ মহাসচিব বিরোধী দলীয় নেতাকে বাংলাদেশে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তার উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। বান কি মুন বলেছেন, আগামী নির্বাচন যাতে সব দলের অংশ গ্রহণে অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে হয়, সেজন্য আমি উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা বেশিদূর এগোয়নি বলে তিনি তার উদ্বেগের কথাও বিরোধী দলীয় নেতার কাছে প্রকাশ করেন। খালেদা জিয়া বান কি মুনকে বলেন, বাংলাদেশের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ, সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক দল বিশ্বাস করে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচনকালীন সময়ে নির্দলীয় সরকারের কোনো বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে শক্তিশালী স্বাধীন নির্বাচন কমিশনও জরুরি। মির্জা ফখরুলের ব্রিফিংকালে অন্যান্যের মধ্যে বিরোধী দলীয় নেতার একান্ত সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ, বিশেষ সহকারী অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, বিরোধী দলীয় নেতার সহকারী একান্ত সচিব সুরাতুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।