তের সেতুতে আটকে আছে বৃত্তাকার নৌপথের সাফল্য

রাজধানীর যানজট ও জনজট নিরসন এবং পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার ২০০০ সালে ঢাকার চারপাশে (সদরঘাট-গাবতলী-আশুলিয়া-কাঁচপুর) বৃত্তাকার নৌপথ তৈরির প্রকল্প হাতে নেয়। কিন্তু নানা কারণে প্রায় শত কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্প এখনও শতভাগ বাস্তবায়ন হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে প্রধান অন্তরায় ১৩টি অনুচ্চ সেতু। এ কারণে ১১০ কিলোমিটার নৌপথের মধ্যে সদরঘাট থেকে গাবতলী পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটারে যাত্রীবাহী ওয়াটার বাস সার্ভিস চালু করা হলেও বাকি ৯৪ কিলোমিটার এখনও অব্যবহূত রয়েছে। অনুচ্চ ১৩টি সেতু অপসারণ বা উচ্চতা বৃদ্ধি করে পুনর্নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরকে ১৬টি, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরকে ১৩টি এবং বাংলাদেশ রেলওয়েকে ১টি চিঠি দেয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো অগ্রগতি হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেতু অপসারণ বাদে ড্রেজিং ও অন্যান্য কাজের ১০০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। সদরঘাট থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার এবং আশুলিয়া থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটার নৌপথ সচল করা হয়েছে। বাকি ৪০ কিলোমিটার পথের নাব্যতা রয়েছে। এখন শুধু ১৩ সেতুর উচ্চতা বৃদ্ধি বা অপসারণ না করার কারণে প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হচ্ছে না। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন রাজধানীর সড়কপথে যানজট ও জনজট কমবে, অন্যদিকে স্বল্প সময়ে ও কমমূল্যে পণ্য পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সেতু অপসারণে অনিশ্চয়তা ঃ অনুচ্চ সেতু অপসারণ বা উচ্চতা বৃদ্ধির ব্যাপারে ২০১০ সালের ৫ আগস্ট নৌমন্ত্রী ও টাস্কফোর্স সভাপতি শাজাহান খান প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ প্রতিবেদন তৈরির জন্য চার মন্ত্রণালয়ের (নৌপরিবহন, পানিসম্পদ, যোগাযোগ, স্থানীয় সরকার) সচিবদের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু এখনও সে প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি বলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। সূত্র জানায়, অতিসমপ্রতি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে নদীর নাব্যতা সংরক্ষণ বিষয়ক টাস্কফোর্সের এক সভা থেকে ওই চার সচিবকে এক মাসের মধ্যে ১৩ সেতু অপসারণ বা উঁচুকরণ বিষয়ক প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। সামগ্রিক বিষয়ে ইত্তেফাকের এই প্রতিনিধি টেলিফোনে কথা বলেন নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের সঙ্গে। মন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকারের সময়েই বৃত্তাকার নৌপথ চালু করা হবে। পণ্য পরিবহনের পাশাপাশি যাত্রী পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে এই নৌপথ। যাত্রী পরিবহনের জন্য ৪টি নতুন ওয়াটার বাস চালু করা হয়েছে। আরো ৪টি তৈরির কাজ চলছে। সেতুর বিষয়ে প্রতিবেদন দেয়ার বিষয়টি তিনি কমিটির কাছে জানতে চাইবেন বলে জানান। বৃত্তাকার নৌপথের সেতু অপসারণ কমিটির আহ্বায়ক ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. আলাউদ্দিন জানান, টাস্কফোর্সের নির্দেশনার পরে শুধু টেকনিক্যাল কমিটির একটি প্রতিবেদন জমা পড়েছে। এখন পর্যন্ত চার মন্ত্রণালয়ের সচিব পর্যায়ের কোনো প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। বিআইডব্লিউটিএ ঢাকা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও বৃত্তাকার নৌপথ বাস্তবায়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক রকিবুল ইসলাম তালুকদার জানান, বৃত্তাকার নৌপথের (প্রথম পর্বের) কাজ শুরু হয় ২০০০ সালে। ২০০৪ সালে প্রথম দফা কাজ শেষ হয়। এতে ব্যয় হয়েছিল ৩৭ কোটি টাকা। দ্বিতীয় পর্বের কাজ ২০০৫ সালে শুরু হয়। যা ২০১২ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও সম্ভব হয়নি। মেয়াদ আরো এক বছর বাড়ানো হয়। এতে মোট ব্যয় হয় ৫৪ কোটি টাকা। তিনি জানান, নৌপথকে কার্যকর করতে ঢাকা সদরঘাট থেকে কাঁচপুর সেতু পর্যন্ত ১৪টি ল্যান্ডিং স্টেশন বসানো হয়েছে। একটি সূত্র জানায়, ১১০ কিলোমিটার নৌপথ মূলত কার্গো ভ্যাসেল পরিবহনের জন্য চালু করা হয়েছে। তবে এ অঞ্চলের জনসাধারণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে যাত্রীবাহী নৌযান চালুর চেষ্টা করছে সরকার। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) সূত্র জানায়, তাদের তত্ত্বাবধানে ঢাকা শিপইয়ার্ড ৪টি নতুন ওয়াটার বাস তৈরি করেছে। এতে ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। প্রতিটির আসন সংখ্যা ৮১। আরো ৪টি ওয়াটার বাস তৈরির কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। আগামী বছরের শেষে ওয়াটার বাসগুলো পাওয়া যাবে। তিন দফা ওয়াটার বাস চালু এ পর্যন্ত তিন বার বৃত্তাকার নৌপথের অংশ বিশেষে ওয়াটার বাস সার্ভিস চালু হয়েছে। বৃত্তাকার নৌপথের প্রথম পর্ব (২৯ কিলোমিটার) চালুর পর ২০০৪ সালে প্রথম বার উদ্বোধন করা হয়েছিল ওয়াটার ট্যাক্সি নামে একটি যাত্রীবাহী নৌযান। কিন্তু এক মাস পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। পরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এটলাস লিমিটেডের ‘এটলাস সান’ চালু করা হলে পরবর্তী সময়ে সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে ২০১০ সালের ২৮ আগস্ট আবার চালু করে ওয়াটার বাস (এমএল বুড়িগঙ্গা ও এমএল তুরাগ)। দ্বিতীয় দফার এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলা হয়েছিল ভারত থেকে পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে ১০টি ওয়াটার বাস আনা হবে। এ সময় ভারতের একজন প্রতিনিধি নিয়ে উপস্থিত ছিলেন নিটল গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল মাতলুব আহমেদ। কিন্তু কিছুদিন চলার পর এসব ওয়াটার বাস সার্ভিস বন্ধ হয়ে যায়। সর্বশেষ গত ৫ জুলাই নৌ মন্ত্রী শাজাহান খান সড়কপথে রাজধানীর যানজট হ্রাস করতে গাবতলীতে সর্বশেষ ওয়াটার বাস সার্ভিস আবার উদ্বোধন করেন। পুরানো দুটি ওয়াটার বাস ‘এম এল বুড়িগঙ্গা’ ও ‘এম এল তুরাগ’ এর সঙ্গে তখন যুক্ত হয় নতুন চারটি ওয়াটার বাস। পুরানো দুটির প্রতিটিতে আসন সংখ্যা ৩৫টি। নতুন চারটির প্রতিটিতে আসন ৮১টি। সদরঘাট থেকে গাবতলী পর্যন্ত প্রতি যাত্রীর ভাড়া ৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সদরঘাট থেকে যাত্রা করে খোলামোড়া, সোয়ারীঘাট, বসিলা ও রায়েরবাজারে যাত্রী ওঠানামা করানো হয়। এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনের ভাড়া ১৫ টাকা। বিআইডব্লি¬উটিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম জানান, প্রতিদিন সকাল সাতটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত চলে ওয়াটার বাসগুলো। বিআইডব্লি¬উটিসির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান জানান, প্রায় দুই মাস পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ওয়াটার বাস ছয়টি নামানো হয়েছে। এবার যাত্রী আকর্ষণে ভর্তুকি দিয়ে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।